বিশ্বম্ভরের বাবা মারা গেলেন বিয়ের কিছু কালের মধ্যে। ছেলে শ্রাদ্ধ শান্তি করলো বউকে ছাড়াই। জেদ করে থাকলো জ্যোৎস্নাময়ী নবদ্বীপে। একটা চিঠি পাঠালেই তাকে যেতে হবে নাকি? স্বামী হয়েছে তাহলে কীসের জন্য? নিজে এসে নিয়ে যেতে পারে না? জ্যোৎস্নময়ী বাড়িতেই তার না দেখা শ্বশুরের জন্য অশৌচ পালন করলো। ঘাটের দিন নখ কাটলো বাড়ির মধ্যে পাঁচিল ঘেরা পুকুর পাড়ে বসে। পুরোহিত এসে জল দেওয়ালো শ্বশুরকে। ব্রাহ্মণ খেলো। নিয়মভঙ্গের দিন অশৌচ কাটাতে জলঙ্গীতে গেলো বাড়ির পালকি জ্যোৎস্নাময়ীকে স্নান করাতে। বর্ষার জলঙ্গী তখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পালকি শুন্ধু জ্যোৎস্নময়ীকে জলে চোবানো হলো। এমন শীতল জলে এর আগে কোনোদিন সে স্নান করেনি। আর এইভাবে পালকির ঘেরাটোপের মধ্যেও না। তার যেন মনে হলো জলঙ্গীর জলরাশির প্রবল চাপে এক অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে পালকিটা। চোখ খোলার চেষ্টা করলো জ্যোৎস্নাময়ী। আর ঠিক তখনই যেন সে দেখতে পেল বিশ্বম্ভরের শান্ত মুখটা। শিরশির করে উঠলো গা জ্যোৎস্নাময়ীর। এমন শিরশির করেছিল সেই ভোর রাতেও। যখন দুটো শক্ত হাত তাকে পরম মমতায়, ভালোবাসায় জড়িয়ে শুয়েছিল পুতুল ঘরে। একটা দেহের ওম যেন আরও একটা দেহ স্পর্শ করছিল। ঘাড়ের কাছে ঘন নিশ্বাসের হলকা লাগছিল যেন জ্যোৎস্নাময়ীর। এইসব সাত পাঁচ ভাবছেন যখন তিনি ঠিক সেই সময়ে সারা গা বেয়ে যেন কীসব উঠতে থাকে। চিড়বিড় করতে থাকে তারা গোটা গা জুড়ে। মনে হয় কারা যেন আঙুল বোলাচ্ছে তার গায়ে। প্রচণ্ড ভয়ে পালকির ভেতরের অন্ধকারে জলের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে যেন তার। চিৎকার করে ওঠে জ্যোৎস্নাময়ী। পালকির বেহারারা বুঝতে পারে পুণ্যস্নান হয়েছে বটে মেয়ের। তারা আবার ডাক ছাড়তে ছাড়তে ঘাট পেরোয়, মাঠ পেরোয়। আর এদিকে দিনের আলোতে জ্যোৎস্নাময়ী দেখে তার পালকির মেঝেতে, কাপড়ের কোঁচড়ে, শাড়ির আঁচলে জাপটে জড়িয়ে আছে চিংড়ি মাছের ঝাঁক। কোনোটা নড়ছে। কোনোটা অল্প জলেই পালকির কাঠের মেঝেতে খাবি খাচ্ছে। ভয়টা কেটে যাচ্ছে জ্যোৎস্নাময়ীর। তাহলে এরাই এতক্ষণ গায়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। চিড়বিড় করছিল? কী যেন এক অনাবিল আনন্দে মন ভরে উঠছে তার। কুড়িয়ে বাড়িয়ে আঁচল ভর্তি করছে সে। একটাও চিংড়িও যেন নষ্ট না হয়।
বাড়ি ফিরে দাসীর হাতে আঁচল ভরা চিংড়ি দিয়ে জ্যোৎস্নাময়ী হুকুম দেয়, “দোতলায় মায়ের আমিষের রান্নাঘরটার দোর খোল। পরিষ্কার কর। আমি রান্না করবো”। দাসী যেন আকাশ থেকে পড়ে। বলে কী মেয়েটা! আজ শ্বশুরের তেল ছোঁওয়ানি। বাইরে থেকে বামুনরা এসে বসে আছে। মেয়ে পায়ে তেল চুঁইয়ে গেছে জলঙ্গীতে ডুব দিতে। ফিরে এসে পাতে তুলে দেবে ইলিশ মাছ ভাপা। গরম ভাত। মাছের ডিমের বড়া। এই যে এত রান্না করলো ঠাকুর। বিরক্ত হয় জ্যোৎস্নাময়ী। “উনুনটা নিকো দেখি। আমি চট করে কাপড়টা ছেড়ে আসি”। দাসীর মুখে আর কথা সরে না। যে মেয়ে খায় না দায় না বাড়ির কারো সাথে কথাটি ঠিক করে বলে না সেই মেয়ে উনুন নিকানোর কথা বলছে কেন? আঁচল ভর্তি চিংড়ি মাছও বা কোথায় পেলো? দাসী সময় নষ্ট করে না। রান্নাঘর পরিষ্কার করে। উনুন ধরিয়ে বসে থাকে। জ্যোৎস্নাময়ী নতুন একটা তাঁতের শাড়ি ভেঙে, আলতা পরে, কপালে সিঁদুর দিয়ে রান্না ঘরে ঢোকে। দাসীর মনে হয় যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা এসে ঢুকলেন রান্নাঘরে। তার যেন গড় হয়ে পেন্নাম করতে ইচ্ছে হলো।
এই রান্নাঘর ব্যবহার হয় না মোটেই। জ্যোৎস্নাময়ীর মায়ের রান্নাঘর। মা মারা যাবার পর এই রান্নাঘরের পাট উঠছে বাড়িতে নতুন মা আসার পর থেকে। তাও সেটা অনেক দিন তো হলোই। তাই জিনিসপত্র বাড়ন্ত। এই অবেলায় কোথায় বা আর কিছু খুঁজতে যাবে সে? চট করে তাকিয়ে নেয় চারপাশটা। কী আছে আর কী নেই এর হিসেবটা পরিষ্কার হয়ে যায় নিজের কাছে। দাসী সেই কচি চিংড়িগুলোতে ততক্ষণে মাখিয়ে রেখেছে নুন, হলুদ। জ্যোৎস্নাময়ী লোহার কড়াই উনুনের আঁচে বসায়। অল্প তেলে চিংড়িগুলোকে ছেড়ে দেয়। একটু নেড়ে চেড়ে কাঁচা লঙ্কা আর কালো জিরের ফোড়ন দিয়ে জল ঢালে। জলঙ্গীর কচি চিংড়ির গা থেকে বেরোতে থাকে মিষ্টি জলের রস। গোটা বাড়ি কালো জিরের ফোড়ন, কাঁচা লঙ্কা আর হলুদের সুবাসে ভরে যায়। জ্যোৎস্নাময়ীর বাবা ব্রাহ্মণ বিদায় দিয়ে সবে ছোটোপক্ষের রান্নাঘরের পিঁড়েতে বসতে যাচ্ছিলেন দুপুরের আহার সারতে। কিন্তু তা আর হলো না। পঞ্চ দেবতাকে স্মরণ করে প্রথম গ্রাস মুখে তোলার আগেই উঠে এলেন দোতলায় অনেক দিনের বন্ধ রান্নাঘরের সামনে। জ্যোৎস্নাময়ী আন্দাজ করেছিল এমনটাই হবে। আসন পেতে জলের গ্লাস নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সেদিন তার বাবা, মায়ের রান্নাঘরে কতদিন পরে খেতে বসলো। মনে পড়লো বড় বউয়ের কথা। তার হাতে
চিংড়ির হলুদ গালা ঝোলের সুবাস। হাপুস হুপুস করে বাবা ভাত খায়। ঝোলের কাঁচা লঙ্কা ডলে। চোখ দিয়ে জল পড়ে তার। সেটা বড় বউয়ের স্মৃতিতে নাকি অনেক দিন পরে পুরোনো রান্না খাওয়ার আনন্দে বোঝা যায় না ঠিক। খাওয়া শেষ হলে পান এগিয়ে দেয় জ্যোৎস্নাময়ী। বাবা মেয়েকে আশীর্বাদ করেন। “কী চাস মা? একবার মুখ ফুটে বল”। সারা বাড়ি কানাকানি হয়। এই বুঝি মেয়ে তার নিজের নামে সব সম্পত্তি চেয়ে নিল। খাওয়া ছেড়ে অন্দরের দোরে এসে দাঁড়িয়ে থাকে ছোটো মা ভয়ে ভয়ে। জ্যোৎস্নাময়ী অস্কুটে তার বাবাকে বলে, “একবার চিঠি লিখুন কলাপোতায়। তিনি যেন আমাকে এসে নিয়ে যান”। কথাগুলো বলেই জ্যোৎস্নাময়ী লজ্জায় রাঙা হয়ে যায় ঝোলের চিংড়িগুলোর মতোই। মেয়ে বাড়ি লিখিয়ে নিলো না। জমি জমা সম্পত্তি কিছুটা না। এমনকি শখের পুতুলগুলোও না। শুধু গরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে গেলো মায়ের রান্নাঘর। ডেয়য়া, ঢাকনা, খুন্তি। আর সেই আমিষের বড় লোহার কড়াইটা। বিশ্বম্ভর বাধা দেয়নি। সে জানতো নতুন সংসার করতে তার সবটাই লাগবে। কোনো কিছুই ফেলা যাবে না।
