ইন্দুবালার দাদুকে পিতৃস্বত্ব রাখতে দেশ ভাগ হওয়ার পরেও যেমন এপারে থেকে যেতে হয়েছিল ঠিত তেমনি তাঁর দাদুর দাদুও বাবার কথা ফেলতে পারেননি। কলকাতার পাট চুকিয়ে খুলনার কলাপোতায় যখন তিনি থাকতে শুরু করলেন তখন বর্ষাকাল। চারিদিকে উপছাপা হয়ে আছে নদীগুলো। খাল গুলো। বিলগুলো। বাড়ির মধ্যে চারিদিকে থই থই করছে জল। কোনটা পুকুর আর কোনটা উঠোন তা ঠাহর করা বেশ মুশকিল হচ্ছে। হামেশাই শোনা যাচ্ছে গ্রামে সাপের কামড়ে মৃত্যুর খবর। এদিকে যাকে বিয়ে করে এনেছেন বিশ্বম্ভর সে এক্কেবারে শহুরে মেয়ে। খাস নবদ্বীপের। সেই মেয়ে এই অজ গাঁয়ের চারিদিকে জল, সাপে কাটা এইসব দেখে প্রথম দিনই তো পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছে। তার বাবা যে তার সাথে এই অবিচার করবেন কোনোদিন সে ভাবতে পারেনি। ভালো পাত্রের কি আকাল পড়েছিল জ্যোৎস্নাময়ীর জন্যে? কত কত সম্বন্ধ এসেছিল বর্ধমান, রাজশাহী, হাতিমপুর থেকে। ময়মনসিংহের এক জমিদারও এসেছিলেন। বাবা বুড়ো মানুষের সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন না বলে সেই সম্বন্ধও নাকচ হলো। শেষকালে মেয়েকে গৌরীদান করবেন নাকি? যারা আসে তারা নাকচ হয়। এদিকে সম্মা রাগে শুধু ফুলে ফুলে ওঠে। তারই বয়সী এক মেয়ে বাড়িতে থাকবে ঘাড়ের ওপর? তাও কি কখনও সহ্য করা যায়? এখন চুপ করে আছে, পরে এই মেয়ে যে ফোঁস করবে না তা কে বলতে পারে? জ্যোৎস্নাময়ী থাকতো দোতলায় তার মায়ের দিকে। আর নতুন মা তার দাস-দাসী নিয়ে এক তলায়। ওপর নীচ করায় বাবার অসুবিধে হতো। হাঁপের টান ধরতো। হাঁপাতে হাঁপাতে জ্যোৎস্নাময়ীর বাবা তার মেয়ের বয়সী নতুন বউকে বোঝাতেন “ওই তো বয়েস মেয়েটার। ওকে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিই কী করে? আর দিলেও সুপাত্রের হাতে দিতে হবে তো?” বুড়ো স্বামীর এই দ্বিচারিতা যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল নতুন মাকে। মুখঝামটা দিতো যখন তখন। “মেয়েকে বিয়ে দেবেন না দোজবুড়োর সাথে অথচ নিজে বিয়ে করে এনেছেন মেয়ের বয়সী একটাকে। তা আমাকে মানুষ হিসেবে ঠাওরান? নাকি জন্তু জানোয়ার জ্ঞান করেন? রাতের সোহাগ দেখলে তো আর বাঁচতেও ইচ্ছে করে না।” চিল চিৎকারে কাক বসে না বাড়িতে। হাঁপানির টান বাড়ে জ্যোৎস্নাময়ীর বাবার। বুকে কর্পূর তেল মালিশ করে দেয় দাসী। ওপর থেকে সবই লক্ষ্য রাখে জ্যোৎস্নাময়ী। কিন্তু রাটি কাটে না সে মুখে। এক দিকে চুপ করে থাকে নিজের মতো করে। তার মা বড় শান্ত ছিল। লক্ষ্মী প্রতিমা যেন। বাড়িতে জোরে কথা বলতে পারতো না কেউ। আর অপমান বা হিংসে করা ছিল ভাবনারও অতীত। বাড়ির দরজায় এসে কেউ খালি হাতে ফিরছে কল্পনাই করতে পারতো না। সাধু সন্ত থেকে গরীব দুঃখী ভিখারি সবাইকে নিজে থেকে বসিয়ে খাওয়াতেন। দান ধ্যানে তিনি ছিলেন দরাজ হস্ত। বাড়িতে সারাক্ষণ একটা সুশ্রী ভাব বিরাজ করতো। এমন মা দুদিনের জ্বরে সেই যে চোখ বুজলেন আর খুললেন না। জ্যোৎস্নাময়ীকে এক্কেবারে একা করে দিয়ে চলে গেলেন। শোকাতুর বাবা খুব ধুমধাম করে মায়ের শ্রাদ্ধ শান্তি মিটিয়ে এবার বিয়ে করে আনলেন এমন একটা মেয়েকে যার চিৎকারে বাড়িতে কাক পক্ষী পর্যন্ত বসে না। সৎ মা আর মেয়ের মুখ দেখাদেখিও হয় না। জ্যোৎস্নাময়ী এমন ছোটো মনের মানুষদের সাথে মুখোমুখি ঝগড়া দূরে থাক কথা পর্যন্ত বলেন না। তাঁর হয়ে চিৎকার করে দাসী। সৎ মা এবং মেয়ের এই বাক বিতণ্ডার খবর নবদ্বীপ অঞ্চলের কেউ জানে না তেমন নয়। “মেরেছ কলসীর কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না” গাইতে এসে বোষ্টমী পর্যন্ত দু পক্ষের মুখের ভাষা শুনে মূৰ্ছা যায়। বাবারই তখন অবস্থা হয় সঙ্গীন। এই অশান্তির আগুন কীভাবে তিনি নেভাবেন, তার হদিশ যেন আর পান না। এই ভাবেই শাঁখের করাতের মতো যখন দিন কাটছিলো তাঁর ঠিক সেই সময়ে শহরে কলেরার জন্য ভলেন্টিয়ার হয়ে এলো একদল যুবক কলকাতা থেকে। তারা গান্ধিজীর স্বদেশী ভাবনায় অনুপ্রাণিত। বিবেকানন্দের সেবা তাদের বুকে। রবীন্দ্রগানের কলি তাদের লজ। একদল উঠতি যুবকদের মধ্যে যে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার তাকে হঠাৎই খুব পছন্দ হয়ে গেল জ্যোৎস্নাময়ীর বাবার। বেশ গোল গোল চোখ। চওড়া ছাতি। বুকের পাটা আছে বলেই না কলেরা রোগী দেখতে আসে। তিন কুলে একমাত্র খুলনায় পিতা ছাড়া আর কেউ নেই। ঝাড়া ঝাঁপটা হাত পা। কথায় বার্তায় নম্র, শান্ত, সদালাপী। সর্বোপরি কর্মঠ। এমন একটা ছেলেকেই যেন মনে মনে খুঁজছিলেন তিনি। দেরি করলেন না জ্যোৎস্নাময়ীর বাবা। কথা চললো তাড়াতাড়ি খুলনা আর নবদ্বীপের মধ্যে। পাকা কথা হয়ে গেলে আশ্বাস দিলেন বাবা মেয়েকে। “ভয় পাস না মা। এই জামাই আমার সোনার জামাই হবে দেখে নিস। কলকাতায় কত বড় একটা মেসে থাকে। কালীঘাটের মায়ের মন্দির তো পায়ে হাঁটা। দেখবি তোকে নিয়ে গিয়ে কেমন ট্রাম লাইনের পাশের বাড়িতে রাখে”।
জ্যোৎস্নাময়ী কোনোদিন ট্রাম দেখেনি। শুনেছে দুটো লিকলিকে লাইনের ওপর দিয়ে সেই ট্রাম কলকাতা শহরে চক্কর মারে। সাহেব সুবোরা সেই ট্রামে ওঠে। যে যার জায়গায় চলে যায়। ঠুং ঠুং করে কাঁচের চুড়ির মতো আওয়াজ হয় ট্রামে। জ্যোৎস্নাময়ী তো সেই ট্রাম লাইনের পাশের বাড়িতে থাকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল। এদিকে তার বিয়ে হয়ে গেল বেশ ঘটা করে বোশেখের কোনো এক শুভ দিনে। ফুলশয্যার খাটে শুতে এসে জানতে পারল বিশ্বম্ভরের পরিকল্পনা। বিয়ে করে সে আপাতত বউকে রেখে যাচ্ছে বাপের বাড়ি। এই কদিন জ্যোৎস্নাময়ী একটু মানিয়ে গুছিয়ে এখানে থাকুক। কারণ মাত্র কয়েকদিনের জন্য কলকাতায় যাওয়া মানে বিস্তর খরচ। একেই নতুন বউ তার ওপরে বাড়ি ভাড়া করা, সংসার নতুন করে পাতানো খুবই ঝামেলার হবে। আর তো এক মাসের মধ্যে কলকাতার পাট চুকিয়ে বিশ্বম্ভর চলে যাবে খুলনা। সেখানে তার বাবা মৃত্যু শয্যায়। ছেলেকে পাশে পেলে তিনি খুশি হবেন। ছেলের বউয়ের সেবা পাবেন। এগুলোর সাথে বাড়ির জমি জায়গাও দেখা শোনা করা যাবে। আর ডাক্তারি প্র্যাকটিসটা ঠিক ভাবে চালালে তো আর কথাই নেই, পিল পিল করে লোকজন লাইন দিয়ে দাঁড়াবে দরজার সামনে। যদিও কোনো দিন তেমন রোগীর ভিড় হয়নি বিশ্বম্ভরের। তবে স্বদেশী করা এক ডাক্তারকে চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি আশেপাশের গাঁয়ের মানুষদের। যতটা না আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ডাক্তারি করতেন বিশ্বম্ভর, তার থেকে বেশি সাহায্য হতো গরিবগুর্বো মানুষগুলোর। কিন্তু সেসব তো আরও পরের কথা। আপাতত তার সামনে যে নতুন বউটি বসে আছে। একবারের অনুরোধেই খুলে ফেলেছে মাথার ঘোমটা। সেই মেয়েটা কী ভাবছে বোঝার চেষ্টা করছে। বিশ্বম্ভর। যদিও সে দেখতে পাচ্ছে এই মুহূর্তে মেয়েটির টানা দুটো চোখ ভরে উঠেছে জলে। আর ভরবে নাই বা কেন? খুলনা জায়গাটা কেমন তার আগে ঠিক ধারণা ছিল না জ্যোৎস্নাময়ীর। ততদিনে তো সে একটা পাকাঁপোক্ত স্বপ্ন দেখে রেখেছে ট্রাম লাইনের পাশে বাসার। খোলা ছাদে রান্নাঘর। একটু দূরে কালীঘাটের মায়ের মন্দির। প্রতি অমাবস্যায় মায়ের মুখ দর্শন। পালা পাব্বনে গঙ্গায় স্নান। রথের মেলা। চড়কে জেলে পাড়ার সঙ। মাথায় আগুন জ্বলতে থাকে জ্যোৎস্নাময়ীর। কাজেই ফুলশয্যায় স্বামীর গায়ের ঘেমো গন্ধের সাথে খাটের রজনীগন্ধা কেমন যেন গুলিয়ে ওঠে। মাঝরাতে দোর খুলে মেয়ে গিয়ে শোয় তার পুতুল খেলার ঘরে। নিজের মা থাকলে এমনটি কক্ষনও করতো না। দিতো অমন ছেলের মুখে নুড়ো জ্বেলে। বিয়ের আগে এক কথা। বিয়ের পরে অন্য? মা মরা মেয়ে বলে তার কোনো দাম নেই গো? কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল জ্যোৎস্নাময়ী। ভোর রাতে গা শিরশির করে উঠলে দেখেছিল ওই অত বড় পুরুষমানুষটা তাকে জড়িয়ে ধরে নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে পুতুল ঘরে। কখন উঠে এসেছে খাট থেকে জানেও না সে। ভোরের আলো এসে পড়েছে বিশ্বম্ভরের মুখে। কী সুন্দর লাগছে! জ্যোৎস্নাময়ীর খুব ইচ্ছে করছিল লোকটাকে ভালোবাসতে। হালকা আলোয় ঠোঁটের ওপর, চোখের পাতায় চুমু খেতে। জ্যোৎস্নাময়ী পারেনি। তখনও মনের মধ্যে কলকাতায় না থাকতে পারার শোক উথাল পাথাল করছিল।
