“এই এত কলমী শাক কী হবে দিদা?” সকালের চড়া রোদে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে কিংশুক। “কলমী ভাজা। কলমী শুক্ত। কলমী চাটনী?” ফিরে তাকান ইন্দুবালা। “একদম শাক তরি-তরকারি না খেয়ে তোদের বুদ্ধির এই অবস্থা হয়েছে। আর শরীরগুলো তো লিকলিকে ঢ্যাঙা গাছ। করে দেবোখন রান্না। একটু কাসুন্দি দিয়ে খাস। দুবারের বেশি চেয়ে খেতে হবে তখন”। ইন্দুবালা এগিয়ে যান তড়বড় করে মাছের বাজারটার দিকে। “এই যে ঘনা… ওই চিংড়ি গুলো কি তোর বিক্রি হয়ে গেছে?” ঘনা অনেক দিন পরে দেখলো ইন্দুবালাকে। “সেকি গো মা তুমি আজ বাজারে? ধনাদার কী হলো আজ?” ইন্দুবালা চিংড়িগুলো হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বলেন “কিচ্ছু হয়নি তার। কী আবার হবে? কেন আমি এসেছি ভালো লাগছে না তোর?” ঘনা চা আনতে পাঠায়। “নিয়ে যাও মা সবটা। ভেড়ির নয়কো”। ইন্দুবালা চেনে। কোনটা ভেড়ির চিংড়ি। আর কোনটা নদীর। সক্কাল বেলা একটা বড় গামছা নিয়ে ভাই বোনে চুপি চুপি চলে যেতেন কপোতাক্ষের ঘাটে। ততক্ষণে জড়ো হয়েছে গ্রামের অন্যসব ছেলে মেয়েরাও। ওদিকে আকাশ আসছে কালো হয়ে। ফুঁসে ফুঁসে উঠছে সেই কবেকার দাঁড়াও পথিকবরের নদ। গামছা জলে ফেললেই উঠছে ঝাঁকের চিংড়িগুলো। হাতে করে একটা জ্যান্ত চিংড়ি তুলে মুখের সামনে ধরেন কিংশুকের। “কেমন এখনও নড়ছে দেখেছিস?” কিংশুক ভয়ে দুপা পিছিয়ে আসে। এমনিতে সে বড় পেটুক। খাবার পেলে আর কিছু চায় না। কিন্তু এইসব শাক সবজি মাছ সে বরাবর দেখে এসেছে মরা। জ্যান্ত জিনিস যে এমন হতে পারে সেই অভিজ্ঞতা তার এই ছাত্র জীবনের বাইরে। “এই ছোটো চিংড়ি দিয়ে বুঝি মালাইকারি হবে?” ইন্দুবালা বলেন, “তোর মুণ্ডু। কেমন হলুদ গালা ঝোল করে দেবো দেখিস”। কিংশুক মাথা নাড়ে। “ঠিক হচ্ছে না কিন্তু দিদা। বোর্ডে এইসবের কথা লেখা ছিল না মোটেই”। ইন্দুবালা বলেন, “কেন মাছের কথা লেখা ছিল। এই তো হয়ে গেল। চিংড়ি মাছ নিলাম”। কিংশুক মাথা চুলকোয়। “চিংড়ি আবার মাছ কোথায়? বইতে লেখা আছে ওগুলো জলের পোকা”। অনেক দিন পরে যেন ইন্দুবালা একটু হা হা করে হাসেন। বাজারের লোজন পাশে জড়ো হয়। “কী হয়েছে মা হাসো কেন?” ইন্দুবালা মাথা নাড়েন। “কিচ্ছু না। তোমরা তাড়াতাড়ি খেতে এসো সবাই”। ফেরার পথে একবার ইন্দুবালা দাঁড়িয়েছিলেন কাশী মুদির দোকানে কালো জিরে কিনতে। বোর্ডটা কিংশুককে দিয়ে মুছিয়ে লেখালেন ভাত, কলমী শাক, চিংড়িমাছের হলুদ গালা ঝোল, বেগুনের টক। অনেক দিন পর বাজার করে এসে প্রসন্ন চিত্তে স্নান করতে গেলেন ইন্দুবালা কর্পোরেশানের তোলা জলে। গায়ে জল পড়তেই পুকুরের ভাবনাটা আবার মাথায় চাগাড় দিতে শুরু করলো। বাড়ির পেছনের বাগানটার সাথে এই বাড়িতেও যদি একটা পুকুর থাকতো? কী ভালো হতো, তাই না? এই একটা ব্যাপার শাশুড়িকে বলার পর মুখ ঝামটা খেতে হয়নি। বাড়ির সেই সময়কার আত্মীয়রা মশকরা করতে এলে শাশুড়ি মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন, “ঠিকই তো বলেছে বউ পুকুর থাকলে কত সুবিধে হতো বল দেখি। নিজের জল বলেও তো কিছু একটা থাকতো। তা ও বউ তোমাদের গ্রামের বাড়িতে কি পুকুর আছে?” উত্তর দিতে পারতেন না ইন্দুবালা। তিনি জানেন নেই বললেই তার শাশুড়ি মস্করা করতে ছাড়বেন না। আর মিথ্যে কথাও এই বুড়ো মানুষটাকে বলা যায় না। সন্ধ্যে দেবার অছিলায় উঠে পড়তেন তিনি। কথা আর এগিয়ে যাওয়ার পথ পেতো না।
জ্যোৎস্নাময়ীর কোনো ছবি ইন্দুবালা দেখেননি। একমাত্র ফ্রেমে বাঁধানো উঁইয়ে কাটা আলতা রাঙানো পায়ের দুটো ছাপ ছাড়া। ঠাম্মা সেখানেই চন্দন দিতো। সন্ধ্যে দেখাতো। তার শাশুড়ি শিখিয়ে দিয়েছিল নাকি এইসব। আর মাঝে মাঝে সেই লোহার কড়াই সিন্দুক থেকে বেরোলে গল্প হতো জ্যোৎস্নাময়ীর। “কই রে ইন্দু, নিয়ে আয় হলুদের কৌটোটা”। ঠাম্মা হাঁক পাড়ে। বেলা যে অনেক হলো। ভাইকে পাঠায় পাশে ভবেশদের বাড়িতে কাঁচা লঙ্কা আনতে। ইন্দুবালারা গামছা দিয়ে যে চিংড়ি ধরেছে সেগুলো দিয়ে আজ ঠাম্মা রান্না করছে চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল। “কিন্তু এই গল্পের সাথে বাড়িতে পুকুর না থাকার কী সম্পর্ক?” প্রশ্ন করেন ইন্দুবালা। “দাও দেখি আমি একটু নাড়ি ঝোলটাকে”। ইন্দুবালা ঠাম্মার হাত থেকে খুন্তিটা নিয়ে নাড়তে থাকে এদিক থেকে ওদিকে। চিংড়িগুলো সেই হলুদ ছোপা ঝোলে কেমন যেন ডুব সাঁতার দিতে দিতে ভেসে ওঠে। ওই দেখো না সন্ধ্যারা কী সুন্দর বাড়ির পুকুরেই জারিয়ে রাখে মশারির জালে চিংড়িগুলো। মনিরুল তো আরও বুদ্ধি করে পাটকাঠি দিয়ে সরজাল করে। অল্প অল্প করে পুকুরের মধ্যেই জমায় মাছগুলো। তারপর একদিন চিংড়ি খাওয়ার মোচ্ছব হয়। আর তুমি কিনা মাটির হাঁড়িতে জারিয়ে রাখতে বলো চিংড়িগুলোকে। ওইটুকু হাঁড়িতে আর কতটুকুই বা ধরে?”
একদম ভালো লাগে না ইন্দুবালার। বোসদের মতো যদি তাদেরও একটা পুকুর থাকতো। নয়তো বুনুদের মতো অন্তত একটা ডোবা। কী মজাই হতো তাহলে! টগবগ করে ফুটতে থাকা ঝোলে আরও দুটো লংকা দিয়ে ঢাকনা দেয় ঠাম্মা। পুকুর নেই বলে তার নাতনির বড় দুঃখ। তারও যে ছিল না তেমনটা তো নয়। পুকুর হলো গেরস্থের লক্ষ্মী। মাছটা শাকটা জলটা তা থেকে যেমন পাওয়া যায় ঠিক তেমনি কাজে লাগে চাপড়া ষষ্ঠীতে কাঁঠালপাতায় সিন্নি ভাসাতে। ইতু পুজোয় ঘট বিসর্জন দিতে। বাস্তু পুজোয় জল পুজো করতে। বিয়েতে জল সইতে একটা নিজের পুকুর থাকবে না তাও কী হয়? কিন্তু ওই যে অদৃষ্ট। “যাও তোমার কাছে আর কোনো গল্প শুনবো না”। চিৎকার করে ইন্দুবালা। তার ভাইও ঠাম্মার আঁচল ধরে বলে, “দিদি কাঁদছে ঠাম্মা। বলো না পুকুরের গল্পটা”।
