ওদিকে ইন্দুবালা বাসি কাপড় ছেড়ে ঠিক করেন বাজারে যাবেন। একবার যখন বাইরে বেরোনোর বাই উঠেছে সেটা কাটানো মুশকিল। তার চেয়ে বাজারে গেলে মনটা শান্ত হবে। নিজে হাতে জিনিসপত্র দেখে কেনাকাটা করা যাবে। দুটো লোকের সাথে কথা বললে ভালো লাগবে। সদর খুলতেই মনে পড়ে যায় অনেক দিন পরে তিনি আজ নিজে বাজারে যাচ্ছেন। বেশ কিছু দিন হলো ধনঞ্জয় এইসব করে। হাঁটুর ব্যথায় খুব একটা নড়তে পারেন না ইন্দুবালা। কিন্তু এই তো কয়েক বছর আগেও নিজে হাতে বেছে বেছে। সবজি কিনতেন। মশলা দেখে, বেছে দরদাম করে নিয়ে আসতেন। সেগুলো পেশাই করে বাড়ি দিয়ে যাওয়ার লোক ছিল। লছমী যতদিন ছিল, মাছের ব্যাপারে ইন্দুবালাকে ভাবতেই হতো না। কিন্তু লছমী যাওয়ার পর থেকে মাছ দেখে শুনে বেছে নিতে হতো। কোথাকার কোন মাছ। কোন পুকুর, দিঘি, বিল সব ইন্দুবালার জানা চাই। না হলে রাঁধবেন কী করে? জল অনুযায়ী মাছের স্বাদ আলাদা হয় সবাই জানে সেটা। কিন্তু রান্না, সেটাও তো আলাদা হয়! শুধু কি তাই? কোথাকার বেগুন। কোথাকার লঙ্কা? কোথাকার ঢেঁড়শ জানা না থাকলে তাঁর রান্নায় মন বসে না। কুটনো কুটতে বসলে কড়াইতে ফোড়ন দিয়ে সেই ক্ষেতটাকেই যদি চোখের সামনে না দেখতে পান তাহলে রান্নায় মজা আসে না। স্বাদটাও। এইভাবেই একটু একটু করে ইন্দুবালার সাথে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল মেমারির কুমড়ো, বেলডাঙ্গার কাঁচা লঙ্কা, পুরশুড়ার আলু, বাঁকিপুরের মুসুরি, রিহান্দের রুই, লাল গোলার আড়, বাসন্তীর গলদার। বাজার করা তাঁর কাছে এক স্বপ্নের মতো। বাজার যদি ঠিক করে হয় রান্নায় তাহলে তরিজুত আসে। আর একবার হাত দিয়ে দেখে নেন ব্লাউজের ফাঁকে টাকার ব্যাগটা ঠিক নিয়েছেন কিনা।
অনেক সকালে মেসের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিংশুক হীনযান ও মহাযানের তার্কিক পয়েন্টগুলো মিলিয়ে দেখছিল। ইতিহাস বইতে বৌদ্ধ শ্ৰমণদের মতো ‘ঊষাকালীন মেঘমালা’ দেখার জন্য সে বেশ কয়েকদিন চেষ্টা করেছে। কিন্তু মোবাইলে অ্যালার্ম বেজে গেছে তার মতো করে আর কিংশুক নিজে পাশ ফিরে শুয়ে অকাতরে ঘুমিয়ে ভাত খাওয়ার সময়ে উঠেছে। আজ কী কুক্ষণে যে এতটা গরম পড়েছে আর ঘুম ভেঙেছে সে বুঝতে পারছিল না। যাই হোক, উঠেই যখন পড়েছে তখন সে ইতিহাসের চ্যাপ্টার গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলো। সামনেই বি এ ফাইনাল। নালন্দা থেকে হস্তিনাপুর হয়ে তিব্বতে যাওয়ার আগে সে দেখলো ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের দরজা খুলে স্বয়ং ইন্দুবালা বেরিয়ে পড়লেন। হীনযান-মহাযান মধ্যপথে রইলো। কিংশুক চিৎকার করলো, “ও দিদা? এতো সকালে কোথায় যাচ্ছো?” ইন্দুবালা হাতের ব্যাগখানা উঁচু করে দেখালেন। কিংশুক হুড়মুড় করে নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে জামার বোতাম আটকাতে আটকাতে। “চলো আমিও যাবো”। ইন্দুবালা অবাক হয়ে তাকান কিংশুকের দিকে। “তুই যাবি কেন? ভোররাত থেকে তো দেখলাম পড়াশুনো করছিস। ঘরের আলো জ্বলছিল যে”। কিংশুক বলে “ধুর পড়ছিলাম কোথায়? বেজায় গরমে ঘুম আসে নাকি? তার চেয়ে বরং এটাই ভালো হলো তোমার সাথে বাজার করতে যাবো। দাও দেখি ব্যাগ দুটো”। ইন্দুবালার হাত থেকে কিংশুক ব্যাগ দুটো প্রায় ছিনিয়ে নেয়। ছেলেটাকে ভালো লাগে
ইন্দুবালার। সময় নেই অসময় নেই মেসের বারান্দা থেকে দিদা বলে হাঁক দেয়। ওদের ঘরটা ইন্দুবালার ঘরের ঠিক সামনে। রাস্তার উলটো দিকে। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম না এলে ইন্দুবালা সেলাই ফোঁড়াই করেন। কিংশুক চিৎকার করে ওপারের জানলা দিয়ে। “এবার তো ঘুমোও। তোমার চোখ খারাপ হলে আমাদের উপোস করে থাকতে হবে। ধনাদার যা রান্নার হাত। গলা দিয়ে নামবে না যে”। নীচ থেকে ধনঞ্জয় কাঁইমাই করে ওদের শাপশাপান্তর করে। তার যত অভিযোগ ইন্দুবালাকে। তার জন্যেই নাকি ওই গাল টিপলে দুধ বেরোনো ছেলেগুলো তাকে হতচ্ছেদা করে। “আরও মাথায় তোলো তুমি ওদের মা। ঝেটিয়ে সব বিদেয় করবো দেখো। হা-হাভাতের দল সব”। যদিও খেতে না এলে ধনঞ্জয়ই ওদের ডেকে নিয়ে আসে। আদর করে বসিয়ে খাওয়ায়। শরীর খারাপ হলে সাতবার গিয়ে খবর নেয়। ছেলেরাও ভালোবাসে তাকে খুব। তার জর্দাটা, বিড়িটা হয়ে যায় ওই ছেলেগুলোর কল্যাণেই। তবে ছোটোখাটো খিটিমিটি লেগেই থাকে। না হলে ভালোবাসা জমবে কী করে?
“আজ কী বাজার করবে দিদা?”
“কেন? হোটেলের বোর্ড দেখিসনি?”
“দেখেছি তো। ভাত, সোনা মুগের ডাল, মোচার ঘন্ট, মাছ…। ওই দেখো…কোন মাছ লেখখানি কিন্তু”।
ইন্দুবালার সামনে দিয়ে তখন মাথায় ঝুড়ি ভর্তি কলমি শাক নিয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছে। একটা বউ। ইন্দুবালা থমকে দাঁড়ান। “ও বউ শুনছো..”। বউটা ঘুরে তাকায়। “কলমী শাক কোথায় পেলে? তোমার বাড়ির? বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছো?” বউটা হাসে। “মেয়ের বাড়ি গেছিলাম মা…। আমার তো আর পুকুর নেই…। ওর শাউড়ির বড় একটা পুকুর ছেল। তা সেই পুকুরের…”। ইন্দুবালা বলেন, “ছিল কেন বলছো? এখন আর নেই?” বউটার মাথা থেকে কিংশুক শাকের ঝুড়িটা নামাতে সাহায্য করে। হাঁপ ছাড়ে বউটা। “ডোবা হয়ে গেছে মা। এবার হয়তো ফ্যালাট উঠবে। তা মেয়ে বললো নিয়ে যাও। যে কদিন আছে”। ইন্দুবালা কলমী শাকের আঁটি তোলেন। সবুজ কচি মাথাগুলো সবাই যেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নাকের কাছে নিয়ে এসে শোঁকেন। জলের তাজা আঁশটে বুনো গন্ধ এখনও মিশে আছে ওদের ডালপালায়। কিংশুক জানতে চায় “এইভাবে বুঝি শাক চেনে? গন্ধ শুঁকে?” হাসে বউটা। “না গো না। মা আমার পুকুর চিনছে গো..”। ইন্দুবালার সামনে ভেসে ওঠে বর্ষার জলে থইথই উঠোন। ভাই বোন মিলে নাচানাচি। “আমাদের কেন পুকুর নেই ঠাম্মা?” ততক্ষণে ঠাম্মার কলমি শাক বাছা শেষ। “নিষেধ ছিল যে বংশে। পুকুর রাখা চলবে না”। “কেন নিষেধ ছিল কেন?” ইন্দুবালার প্রশ্নে ঠাম্মা জবাব দেন না। ইন্দুবালা ততক্ষণে শাকের আঁটি বেছে বেছে তোলেন ঝুড়ি থেকে। কিংশুকের পছন্দ হয় না ব্যাপারটা। শাক, লতা পাতা সে দু চক্ষে দেখতে পারে না। ওসব খাওয়ার জন্য তো গরু ছাগলরা আছেই। মানুষ কী জন্যে খেতে যাবে চারিদিকে এতো মাছ, মাংস, ডিম থাকতে। একটু বিরক্ত হয়েই বলে ওঠে সে “আজ কিন্তু কলমি শাক মেনুতে নেই দিদা।” ইন্দুবালা বিড়বিড় করেন, “নেই তো কী? হতে কতক্ষণ? দেখছিস না বাড়ির সামনে কেমন একটা আস্ত গোটা পুকুর ঝুড়ির মধ্যে করে চলে এসেছে।” কিংশুক জবাব দিতে পারে না দিদার কথায়। এই মহিলা যাই রান্না করে তাই যেন মুখে লেগে থাকে সারা জীবনের মতো। মনে মনে ঠিক করে নেয় কিংশুক কলমি শাকটা আজ না হয় সে একবার ট্রাই করে দেখবে। ইন্দুবালা প্রায় সব শাক কিনে নিয়ে খালি ঝুড়ি ফেরত দেন বউটাকে। বলে দেন “ওবেলা বাড়ি ফেরার পথে একবার ঘুরে যেও বউ। আমার বাজারে একটু সময় লাগবে”। বউটা মাথা নাড়ে। আর তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া ইন্দুবালাকে ধরতে প্রায় ম্যারাথন দৌড় দেয় কিংশুক।
