যখন বাড়ি থেকে বেরোনো এক্কেবারে বন্ধ হয়ে গেল। তখন ইন্দুবালার বারবার মনে হতো গ্রামে সবার বাড়িতে থাকলেও তাদের বাড়িতে কেন কোনো পুকুর বা ডোবা নেই? তাহলে সে তো চুপটি করে জলের পাশে একটু বসে থাকতে পারতো। এত সব কাণ্ডের পরেও মনিরুলকে ঠিক লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাতো জোনাকির আলো। কারবালার যুদ্ধমুখর প্রান্তরটা কি মনিরুল তাদের পুকুর পাড়েই নামিয়ে আনতো না তখন? সাজু কি তাদের পুকুর পাড়ে এসে রূপাইয়ের খোঁজ নিতো না? অভিমান আর কষ্ট জমে উঠতো দু চোখ উজিয়ে। যদিও বাড়িতে পুকুর কেন ছিল না সেটা নিয়ে একটা গল্প সে ছোট্ট থেকে শুনে আসছে।
কিন্তু সেই গল্পে প্রবেশ করার আগে এই মুহূর্তে ইন্দুবালা কী করছেন সেটা জেনে নেওয়াটা আখ্যানের ক্ষেত্রে জরুরি। বর্ষা এবার শুধু দেরিতে নয় আষাঢ় পার করেও দেখা দিচ্ছে না। ভ্যাপসা গরমে সবার নাজেহাল দশা। সত্তর পার করা ইন্দুবালার অবস্থা আরও কষ্টের। দোতলার বারন্দায় ঠাণ্ডা মেঝের ওপরে চুপটি করে শুয়েছিলেন তিনি। অনেকক্ষণ হলো কারেন্ট নেই। হাত পাখাটাকে অভ্যাসবশত আস্তে আস্তে নাড়ছিলেন নিজের শরীরের ওপরে। তালপাতার স্নিগ্ধ হাওয়া ভালো লাগছিল তাঁর। কিছুক্ষণ আগে শেষ খদ্দের ভাত খেয়ে চলে গেছে। যা বাকি ছিল হাঁড়ি চেঁচে পুছে খাওয়ানো হয়েছে বাজারের ভিখারিদের। এমনকি কালু, ভুলু, নেলু বাজারের যে হরেক নামের বিড়াল এবং কুকুর আছে তাদেরও পাতের উচ্ছিষ্টাংশ এক জায়গায় জড়ো করে ধনঞ্জয়ের খাওয়ানো হয়ে গেছে। লছমী নিজে হাতে শুরু করেছিল এইসব। সেই প্রথা আজও দিব্য বহাল আছে। সবই ঠিক ছিল। এর সাথে যদি বাড়ির সঙ্গে একটা পুকুর থাকতো। তাহলে ঠাণ্ডা মিঠে জলের হাওয়া পাওয়া যেত এই ছেনু মিত্তির লেনেও। বেচারা ধনঞ্জয়কে তখন কর্পোরেশানের ছিরছিরে জল পড়া কলে ওই অতক্ষণ ধরে বাসন মাজতে হতো না। পুকুর ঘাটে গিয়ে মেজে ঘষে ঝকঝকে করে আনতে পারতো বাসনগুলো। পারলে দুটো ডুব দিয়ে আসতো না হয় তার সাথে। আজ অনেক ভোরে প্রচণ্ড গরমে ঘুম ভাঙার পরেই কেমন যেন বোসদের পুকুরটার কথা মনে পড়ছে তাঁর। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষকে। এমনকি শাশুড়ি যে পালা পার্বণে গঙ্গার স্নানে নিয়ে যেতেন তাও। সক্কাল হতে না হতে আজ নিজে থেকেই কেমন যেন ডুব দিয়ে স্নান করার বাসনা মনের মধ্যে জাগছিল ইন্দুবালার। কত দিন গভীর গহন জলে ডুব দেননি তিনি। এই সময় তো কপোতাক্ষের একূল-ওকূল ভাসে। গভীর রাতে জলের আওয়াজ যেন দোর পর্যন্ত এসে কলকল করে কত কথা শুনিয়ে যায়। বোসদের পুকুরের জল আরও ঘন সবুজ রঙ নিয়ে ভারী হয়ে ওঠে। পাশের ঝোঁপ থেকে অনবরত ডেকে চলে ঝিল্লি। ভিজে গায়ে বাড়ি ফিরতে স্যাঁৎ স্যাঁৎ করে ওঠে গা। ইন্দুবালার হঠাৎ আজ কেমন যেন ইচ্ছে হলো অমন বৃষ্টিভেজা ঝোপে ঢাকা মাটির রাস্তা দিয়ে স্নান করে ফিরতে। কিন্তু সে পথ কোথায় পাবেন তিনি ছেনু মিত্তির লেনে? আজ অনেক সকালে ঘুম ভেঙে তাই নীচে চলে এসেছিলেন। সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে নেমেছিলেন। যেন ঘাটে নামছেন। সঙ্গে রয়েছে জল ভরে নেওয়ার ঘড়া।
“ধনঞ্জয়…ও ধনঞ্জয়…।” কোনো সাড়া পান না তিনি। মাথার ওপর দিয়ে চাদর চাপা দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে সে সিঁড়ির নীচের ঘরে। আবার ডাকেন দরজার কাছটায় এসে। “ধনা, ও ধনা ওঠ না বাবা। আমাকে একটু গঙ্গা স্নান করিয়ে এনে দে।” ভোরের আধো ঘুমে ধনঞ্জয় চোখ কচলায়। ধড়মড় করে উঠে বসে। কানে ঠিক শুনছে কিনা বুঝতে পারে না। বুড়ি বলে কিনা গঙ্গায় যাবে? “বলি তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে মা? রোজ রাতে ঘিষঘিষে গা গরম থাকে তোমার। ডাক্তারের ওষুধ খাচ্ছে। তার ওপর তোমাকে নিয়ে গঙ্গা স্নানে গিয়ে আমার নিজের গঙ্গাপ্রাপ্তি হোক তাই না? তোমার ছেলেরা এসে আমাকে দুরমুশ করুক। হবে নাই।”
ধনঞ্জয় বেশ গুছিয়ে কথা বলতে শিখেছে। যত বয়স বাড়ছে, চুল যত পাকা হচ্ছে তত মুখের বুলি ফুটছে। রেগে যান ইন্দুবালা। “ছেলেদের ভয় দেখাস তুই কোন সাহসে? তাদের আমি খাই না পরি? যেতে হবে না তোকে। আমি নিজেই যাবো।” বুড়ি এগোতে গেলে ধনঞ্জয় চিৎকার করে। “যাও না, যাও। ও বাড়ির চক্কোত্তির বউয়ের মতো শেষকালে হাত-পা ভেঙে পড়ে থাকো। গুয়ে মুতে একাক্কার হও গে। সুস্থ আছে কপালে সইবে কেন?” থমকে যান ইন্দুবালা। সত্যি তো এই বয়সে একা যেতে গিয়ে একটা কাণ্ড বাধলে? ধিক ধিক করে মরা তার জীবনে সইবে না। তবু রাগ যায় না। নিজে দমে গেলেও ধনাকে ছাড়েন না তিনি। “তোকে আজ কোনো কাজ করতে হবে না ধনা। আমি নিজেই সব কিছু করবো। গায়ের কাছে একদম ঘুরঘুর করবি না। এই আমি বলে দিলাম”। ধনঞ্জয় বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শোয়। আপাতত নিশ্চিন্ত সে। বুড়ির গঙ্গা স্নান আটকাতে পেরেছে। বড় ফাড়াকেটেছে একটা। এইখানে নাকি গঙ্গার ঘাট? রিক্সা করে যাও। আবার হাঁটো। তারপর আবার রিক্সা। শুধু কি তাই? গঙ্গায় নামার আগে মায়ের একপ্রস্থ প্রণাম। “তোমর গায়ে পা দিচ্ছি মা, অপরাধ নিও না।” আবার ওঠার সময় আর এক প্রস্থ প্রণাম। তারপর ঘাটে কাপড় ছাড়ার জায়গা নেই। বুড়ি জেদ করে সেই ভিজে কাপড়ে আসবে। শুধু তাই নয় বাড়ি ফিরে আবার স্নান করবে। কিছু যদি একটা হয় তখন সামলাবে কে? এইসব বিড়বিড় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে আবার ধনঞ্জয়।
