হইচই পড়ে গেছে গোটা অঞ্চল জুড়ে। ছেনু মিত্তির লেনে ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে একেই ভিড় লেগে থাকে। আজ যেন আরও বেশি ভিড়। হাফবেলা অফিস করে কালেক্টার অফিসের কেরানিকুল চলে এসেছে খেতে। হোস্টেলের ছেলে-মেয়েগুলো হাজির হয়েছে। তার সাথে নিয়মিত বাজারের খদ্দেররাও আছে। আর আছে কিছু ফ্লাইং কাস্টমার। এর সাথে জুড়েছে রাজ্যের ফেসবুক ফ্রেণ্ডা। চারিদিকে শুধু কচিকাঁচাঁদের কলকলানি। মাথা খারাপ হবার অবস্থা ধনঞ্জয়ের। হোটেলটাও হয়েছে আজ দেখার মতো। যে যেখানে পেরেছে বসে গেছে। আর ধনঞ্জয়ের হয়েছে মুশকিল সে কোনো দিক থেকে কোনোভাবেই কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আজ যেন সব কিছুতেই তার প্রবেশ নিষেধ। ছেলে মেয়েগুলো নিজেরাই হাতে হাতে কাজ করে নিচ্ছে। কেউ জল দিচ্ছে। কেউ ক্যাশ সামলাচ্ছে। কেউ থালা পাতছে। কেউ পরিবেশন করছে। আর রান্নাঘরের দিকে তো যাওয়াই যাচ্ছে না। সেখানে আরও ভিড়। প্রায় সবাই ঝুঁকে পড়েছে তাদের মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে। সেই ছোট্ট স্ক্রিনে ফুলে ফুলে উঠেছে লাল হয়ে যাওয়া মালপোয়াগুলো। বড় ছাঁকনিতে তা সোজা চলে যাচ্ছে চিনির হালকা রসে। মৌরির গন্ধ, গোল মরিচের স্বাদ ছড়িয়ে পড়ছে মেঘলা শহরের আকাশে বাতাসে। আর এসবের মধ্যে প্রশান্তি মাখা মুখ নিয়ে মালপোয়া ভেজে চলেছেন ইন্দুবালা। না এই মুহূর্তে কোনো মৃত্যুর স্মৃতি তাঁর আশেপাশে নেই। নেই খুলনা..কলাপোতা…ছেনু মিত্তির লেন। শুধু যে মানুষটি আজ উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি একজন শিল্পী। যিনি নতুন সৃষ্টির উন্মাদনায় মেতে উঠেছেন। তাঁর বুড়ো ডালপালাগুলো চারিদিক থেকে যেন শুষে নিচ্ছে তারুণ্যের আস্বাদ। যে স্বাদে রয়ে গেছে নতুন করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।
৬. চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল
৬. চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল
কলাপোতা গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কপোতাক্ষ নদ। এছাড়া চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য খাল বিল পুকুর। সবুজ জংলা ঝোঁপের পাশে সন্ধ্যামণি ফুল। হেলেঞ্চার লতা। উঠোনের কোণ ঘেঁষে কাঠচাঁপা। পঞ্চমুখী জবা। সদরের মুখটায় শিউলি। সাদা আঁচলের মতো পড়ে থাকে ফুলগুলো। উঠোনের মাঝখানে বড় তুলসী মঞ্চ। অষ্টপ্রহরের সময় ঘুরে ঘুরে কীর্তন হয় সেখানে। বাড়ির পেছনে আছে নারকেল গাছ বেয়ে ওঠা চুইঝাল। রান্নায় এতটুকু ঝালের দরকার হলে মা টুক করে গিয়ে ছোট্ট ডাঁটি পেড়ে নিয়ে আসে। একটু ঘেঁচে ফেলে দেয় ঝোলের মধ্যে। নারকেল গাছটা সোজা রেখে এগিয়ে গেলে পুঁইয়ের মাচা। তার ডগাগুলো বর্ষার জল পেয়ে যেন আকাশের দিকে মুখ করে আছে আরও বৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায়। পুঁই মাচাকে বাঁদিকে রেখে কয়েক পা হাঁটলেই কলকাতা থেকে আনা দাদুর ডালিম গাছ। তার পাশেই ঠাম্মার নিজের হাতে আদর করে বসানো গন্ধরাজ লেবু। কালনার আতা। যেন ছবির মতো আঁকা। এইরকম সাজানো গোছানো বাড়ি এই গ্রামের অনেকেরই আছে। সচ্ছল গেরস্থ হিন্দু বাড়ির ঘর দোর সাজানো এক রকমের। আবার মধ্যবিত্ত মুসলিম বাড়ির অন্দরের সাজ ভিন্ন ধরনের। হিন্দুবাড়ির চারিদিকের এমন খোলামেলা পরিবেশটা কিছুটা হলেও ঢাকা পড়তো মুসলিম বাড়িতে। ইন্দুবালার যে খুব একটা গ্রামের সেইসব বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হতো তেমনটা নয়। কিন্তু হাতে গোনা একজন দুজনের বাড়িতে নানা অছিলায় সে গিয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও থেকেছে। ভালোলাগা কাছের মানুষদের হুট করে গিয়ে চমকে দিলে কেমন যেন একটা আনন্দ হয়। সেইরকম যে কতবার ইন্দুবালা মনিরুলের বাড়িতে গিয়ে তাকে চমকে দিয়েছে তার সংখ্যা গুনতে বসলে এই বয়সে ইন্দুবালার লজ্জা পাওয়ার কথা। দুজনের সেই নিঃশব্দ ভালোবাসার মধ্যে আর কারও না থাকুক প্রকৃতির তো সায় ছিল। না হলে কেন ইন্দুবালার এখনও মনে থাকবে মনিরুলের বাড়ির পেছনের বড় পুকুরটাকে। তার পেছনের বড় বাঁশ ঝাড়টা। তারপর আদিগন্ত ধানক্ষেত। ওখানে সন্ধ্যা নেমে আসতো। জোনাকিগুলো ঘুরে ঘুরে আলো ফোঁটাতো। যারা কোনোদিন দুজনে দুজনের সঙ্গে থাকলে না, সংসার করলো না, তাদের ভালোবাসার গল্প বয়ে বেড়ালো কত যুগ।
মনিরুলদের পুকুরপাড়ে জমাট অন্ধকারে জোনাকি দেখতে ভালোবাসতো ইন্দুবালা। সে সাধ অবশ্য বেশিদিন টেকেনি তার কপালে। ধিঙ্গি মেয়ে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে, চোখ টাটাতো সবার। অচিরেই বন্ধ হলো সবকিছু। সমাজের চোখে যা যা নিষিদ্ধ, অক্ষরে অক্ষরে মানতে বাধ্য করা হলো মেয়েকে। রাতের আঁধার দেখা বন্ধ হয়ে গেল। তার মধ্যে থেকে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা জোনাকির আলোগুলোও দূরে চলে গেল। এই বয়সে মেয়েরা সংসারের জন্য একটু একটু করে তৈরী হতে থাকে। ঘরের কাজ কম্ম শেখে। স্বামীকে কীভাবে যত্ন নিতে হবে, কোনটার পরে কীসের উপাচার তা ভালোভাবে বুঝে নেয়। আর এই মেয়ে কিনা এক মুসলমান ছেলের সাথে রাতের আঁধারে পুকুর পাড়ে জোনাকি দেখবে? দাওয়ায় বসে বই পড়ার ধুম হবে? কানাকানি থেকে জানাজানি হয় গ্রামে। মুখ টেপাটিপি, হাসিও। কথাগুলো ইন্দুবালার বাড়ির লোকের কানে বেঁধে সঁচের মতো। সেই নিয়ে হুলুস্থুল কম হয় না বাড়িতে। মেয়ের জেদ পুকুর পাড়ে গিয়ে সে বসবেই। কেন বাড়ির কাজ কি সে করে না? নাকি বাবা, মা, ঠাম্মার কথা শোনে না? গ্রামের লোক যা বলবে তাই শুনতে হবে? প্রথম দিকে কঠোর শাসন চলতো। তারপর দেখা গেল মেয়ে মোটেই সুবিধের নয়। এই শাসনে আরও বেঁকে বসছে সে। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে শরীরের অবস্থা কাহিল হবার যোগাড়। ঠাম্মার পরামর্শে মা আশেপাশের হিন্দু বাড়িতে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। যাদের বাড়িতে বড় পুকুর কিংবা ছোট্ট ডোবা কাটানো আছে। সেখানেও অন্ধকার গাঢ় হয়ে জমাট বাঁধে। জোনাকিরা মিটমিটে আলো জ্বালায়। কিন্তু সেইসব বাড়িতে তো আর মনিরুল ছিল না। তার বাঁশি ছিল না। জসীমউদ্দীনের ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ বা মীর মশাররফের ‘বিষাদ সিন্ধু’ কেউ দুলে দুলে পড়তো না। সবে কৈশোরকে পিছনে ফেলে যেতে থাকা কোনো সন্ধ্যে সজল দুটো চোখ তুলে জানতে চাইতো না, “বাড়ি যাবি না ইন্দু?” ইন্দুবালার বাড়ি যেতে এতটুকু ইচ্ছে না করলেও যেতে হতোই। হিন্দু পাড়ায় সন্ধ্যের শাঁখ বেজেছে। আর মুসলিম পাড়ায় তখন মাগরিবের নামাজ। ইন্দুবালার মন পড়ে থাকতো ওই পুকুরটার পাড়েই। অন্ধকারে জ্বলে ওঠা বিন্দু বিন্দু জোনাকির আলোয় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা মনিরুলের চোখের মাঝে। কেউ কেউ বলেছিল ঝাড়ফুঁক করো মেয়েকে। অমন ভাবে পুকুর পাড়ে কেউ বসে থাকে ভর সন্ধ্যেবেলা? তবুও ইন্দুবালা জেদ করে বেশ কিছুদিন একাই বসতেন। বাঁশ ঝাড়ে হাওয়া লেগে ঝিরঝিরে আওয়াজ হতো। দূরে বিশালাক্ষ্মী তলার মাঠ থেকে শেয়াল ডেকে উঠতো। ইন্দুবালার সেই প্রথম মনে হয়েছিল এই পৃথিবীতে তিনি বড্ড একা। চারপাশে কেউ নেই। হাত বাড়ালে অন্ধকারটুকু ছাড়া। সেই অন্ধকারে ইন্দুবালা প্রথম জ্ঞান হারালেন। তারপর থেকে বাড়ির বাইরে পা রাখা এক্কেবারে বন্ধ হলো। ঠাম্মা সত্যপীরের কাছে মানত করলেন। মেয়েকে সুযোগ্য পাত্রের হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত মা পালন করলেন ব্রত। বাবা মরিয়া হয়ে চিঠি লিখলেন কলকাতায়।
