ইন্দুবালার শরীর বেয়ে পেঁচিয়ে উঠছে আরও একটা শরীর। বিষধর ফণা তুলে গ্রাস করছে যেন সে। মাস্টার রতনলাল মল্লিক বিছানার ওপরে তার পোয়াতি বউটাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে তখন। বন্ধ হয়ে আসছে ইন্দুবালার শ্বাস প্রশ্বাস। পেটের ভেতরে দংশিত হয়ে বাচ্চাটা যেন কেঁদে উঠছে বারে বারে। ভাই চিলেকোঠার ঘর থেকে গড়গড় পড়ে চলেছে ছোট্ট চটি বইখানা।
“ঘুমের মধ্যে শুনতে পেলাম
শঙ্খ চূড়ের কান্না
‘এ আনন্দ অসহ্য বোন;
দিসনে লো আর, আর না।‘
জেগে উঠলাম; দেখতে পেলাম
আর না দেবার সুখে
কেয়া ফুলটি ঘুমিয়ে আছে
বিষধরের বুকে।”
গলা বুজে আসছে ইন্দুবালার। কান্নায়। ঘেন্নায়। ভোররাতে উঠে ঠাণ্ডা জল মাথায় ঢালেন তিনি। একবার নয় বারবার। তারও অনেক দিন পরে ভাই যখন আর নেই, স্বামী যখন নেই, চারিদিক শূন্য খাঁ খাঁ; অনেক রাতে দরজা ধাক্কিয়ে খেতে এসেছিল কজন। তাদেরই কেউ হয়তো ভুলবশত ফেলে রেখে গিয়েছিল একটা কবিতার বই। পড়ে ফেলেছিলেন ইন্দুবালা কবির নামটা। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তখন কলকাতায় বোমা। রাস্তায় ঘাটে মৃতদেহের সারি। ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েগুলো গঙ্গায় ভাসছে লাশ হয়ে। পরের দিন অনেক রাতে ছেলেটা আবার এসেছিল এক পেট খিদে নিয়ে। হ্যাঁ সেদিনটাও ছিল রথের দিন। মনে আছে ইন্দুবালা পাঁপড় ভেজেছিলেন। হিঙের গন্ধ মাখানো খিচুড়ি হয়েছিল। আর ছিল চুসির পায়েস। প্রথম দিন ইন্দুবালার সাথে অলোকের কোনো কথা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় দিন অনেক কথা হলো। বইয়ের প্রচ্ছদের ওপরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে সে একবার নিয়ে আসবে বলেছিল। “ওই শীর্ণকায় উজ্জীবিত কবি আপনাকে দেখলে যে কী বলবেন কমরেড ইন্দুবালা, ভেবেই আমি শিহরিত হচ্ছি…। উনি সবাইকে বলেছেন কবিতা লেখো। ঢেকে ফেল শহরের প্রাচীরগুলো কবিতায়..বিপ্লবে।” অলোক ফিরে আসেনি। কবিও না। কিন্তু বইটা রয়ে গেছে এখনও তাঁর কাছে। মাঝে মাঝে বইটা খুললে অলোক ভেসে আসে। তাকে অনেক দিন না দেখলে কষ্ট পান। ইন্দুবালা।
.
তাড়াতাড়ি শিল নোড়া পেড়ে ফেলে ধনঞ্জয়। এই বেলা চাল না বেটে রাখলে বুড়ি নিজেই বাটতে শুরু করে দেবে। এই গুচ্ছের লোকের জন্য মালপোয়া বানানো কি মুখের কথা? এরই মধ্যে জলহস্তির ছানাগুলো ঘুরে গেছে। মানে সামনের হোস্টেলের ওই ছেলে মেয়েগুলো। ঠাকুমা দেওয়ালে কী লিখছে দেখতে এসেছে হুড়মুড়িয়ে। “কী গো সব পালটে দিচ্ছো নাকি? শুক্তো ভাত এই সব কিন্তু কিছু খাবো না আজকে”। ছোটো করে ছেলেদের মতো চুল ছাঁটা মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে। ধনঞ্জয়ের মনে হয় ঠাস করে গালে একটা ঠাটিয়ে থাপ্পড় দেয়। শুধু পাকা পাকা কথা। সেদিন আবার গলির মোড়টাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল মেয়েটা। দেখেছে ধনঞ্জয়। ইন্দুবালাকে বলতে এলে নিজেই ধাতানি খেয়েছিল বেশি। “কেন তুমি বিড়ি ফোঁকো না? তাও তো ওরা মনের সুখে দুটো টান দিতে পারে। আমরা কী পেয়েছি জীবনে?” ধনঞ্জয় কথা বাড়ায়নি আর। মাঝে মাঝে চিনতে পারে না ইন্দুবালাকে সে। মা যে কখন কী বলে বোঝা মুশকিল। এদের নিয়ে একটা কথা বলার জো নেই মায়ের কাছে। নিজের মনে গজগজ করে ধনঞ্জয়। বাবুই পাখির বাসার মতো চুল যে ছেলেটার সেটা আরও ধ্যাষ্টা। “কী গো? কী কী চেঞ্জ করছো দেখি?” এগিয়ে আসে সে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ইন্দুবালার কাছে। “তাই বলে কাঁঠাল ক্ষীরটা চেঞ্জ করো না প্লিজ। ওটার যে গল্পটা বলেছিলে সেটা কিন্তু আমি কালকে ফেসবুকে শেয়ার করেছি। ওখান থেকে অনেকে আসবে বলেছে খেতে”। মোটা ছেলেটা এরপর এগিয়ে আসে। খেয়ে খেয়ে একেবারে ঘাড়ে গর্দানে হয়ে গেছে। তাও থামার নাম নেই। “তোরা বড় ছটফট করিস। আগে দেখ না কী লেখে ঠাকুমা। ডিসটার্ব করিস না”। একরাশ ছেলে মেয়ে জড়ো হয় ইন্দুবালার আশেপাশে। সত্তর পেরোনো এক বুড়ি সাত সকালে ভাতের হোটেলের বোর্ডে চক দিয়ে লিখতে থাকে। খিচুড়ি, পাঁপড়ভাজা, আনারসের চাটনি, কাঁঠাল ক্ষীর তার নীচে বড় করে লেখা হয় মালপোয়া। ভিড়টা একসাথে হঠাৎ আনন্দে চিৎকার করে ওঠে “ইয়া…”। জড়িয়ে ধরে ইন্দুবালাকে ওরা সবাই। কেউ তার মধ্যেই ফেসবুক লাইভ শুরু করে দেয়। “কাল যে আপনাদের কাঁঠাল ক্ষীরের গল্পটা বলেছিলাম আজ তার সাথে ইনক্লড হয়েছে মালপোয়া…”। গজগজ করতে করতে জোরে জোরে চাল বাটে ধনঞ্জয়। কারণ সে জানে এরপর স্নান সেরে এসে রান্নার ধুম পড়বে বুড়ির। একটা নেশার মধ্যে থাকবে সেই দুপুর পর্যন্ত। যতক্ষণ না শেষ রান্নাটুকু হয়, যতক্ষণ না শেষ মানুষটা খেয়ে চলে যায় হোটেল থেকে।
.
নতুন সাইকেল কিনেছে মনিরুল। সেটা দেখাতে এসেছিল। ইন্দু জানে এটা একটা অছিলা। আসলে তারা আজ যাবে মোক্তার পাড়ায় রথের মেলায়। মাকে কী করে বলবে সে? সাইকেল শেখাটা খুব সহজ মিথ্যের রাস্তা। ছেলে মেয়ে দুটো বাড়ছে যেন তালগাছের মতো। মায়ের মন সায় দিতে চায় না। বাবাও যে পছন্দ করে তেমনটা নয়। কিন্তু কেন কে জানে সেদিন বাবা রাজি হয়ে যায়। “যাবি তো, যা না। সামনের বারে আর একটু বড় ক্লাসে উঠলে ইন্দুকেও কিনে দেবো সাইকেল। তখন দুজনে একসাথে স্কুলে যাবি চালিয়ে”। সে সৌভাগ্য হয়নি ইন্দুবালার। তার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তাঁর। স্বর্ণলতার আত্মহত্যা চোখ খুলে দিয়েছিল অনেক মায়ের। তারা কিছুতেই আগুন আর ঘি পাশাপাশি রাখতে চায়নি। বরং আগুনেই মেয়েকে বিসর্জন দিয়েছিল অনেকে। জ্বলে পুড়ে শেষ হয়েছিল মেয়েগুলো। কজন ইন্দুবালা হতে পেরেছিল? যাদের নিয়ে লেখা হয়েছিল খবরের কাগজে? ফেসবুকে? যাদের ঘিরে রেখেছিল অনেক অচেনা মানুষ নিজের মতো করে। সাইকেলের সামনের রডে বসতে লজ্জা করেছিল ইন্দুর। তবুও বসেছিল সে। হাওয়ার মতো উড়ছিল মনিরুলের সাইকেল কপোতাক্ষের তীর ধরে। হাতে হাত ঠেকে যাচ্ছিল দুজনের। শ্বাসে প্রশ্বাসে চরম উত্তেজনা। ওরা কাছ থেকে পাচ্ছিল দুজনের ওম। চোখ বন্ধ করেছিল ইন্দু। সে যেন কাঠের নাগরদোল্লা, ঘোড়ার দোল্লা, বুড়ির চুল, ঝাল ঘুগনি, পাঁপড় ভাজা, এইসব ছাপিয়ে মৌরির গন্ধ পাচ্ছিলো মনিরুলের গা থেকে। যে মৌরির গন্ধ পেয়েছে সে তার ঠাম্মার মালপোয়ায়। ভোলা ময়রার দোকানে। কিংবা তারও অনেক পরে রিভলবার নিয়ে খেতে আসা অলোকের কবিতার বইতে। স্নান সেরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ান ইন্দুবালা। কতদিন পর আজ তিনি মালপোয়া ভাজবেন! তাঁর চোখে মুখেও কি ফুটে উঠছে না এক প্রশান্তি? এটা কি মৃত্যুর বার্তাবহ? মনিরুলের মৃত মুখ তিনি দেখেননি। কিন্তু আন্দাজ করতে পারেন। শুনেছিলেন কলকাতা থেকে গোপনে ফেরত যেতে হয়েছিল তাকে। নিজের মা ছিলেন অসুস্থ। মাকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়েছিল মনিরুল। পথে ধরা পড়ে সে পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে। শেষ পর্যন্ত নাকি লড়েছিল মনিরুল বীরের মতো। একটা ছোট্ট দেশি রিভলবার দিয়ে সে জয় করে নিতে চাইছিল স্বাধীনতার সবটুকু স্বপ্ন। ঝাঁঝরা হয়েছিল তার দেহ গুলির মালায়। আরও দিন তিনেক পরে তাকে পাওয়া গিয়েছিল কপোতাক্ষের চরে। পাশে পড়েছিল তার ব্যাগখানা। তার মধ্যে ছিল হাতের নক্সা ভোলা স্বাধীন বাংলাদেশের একটা জাতীয় পতাকা। যা মনিরুলকে দিয়েছিলেন ইন্দুবালা শেষবার দেখা করার সময়। আর মনিরুল কী দিয়েছিল তাঁকে? আলমারি খোলেন ইন্দুবালা। কাঠের ছোট্ট বাক্স থেকে বের করেন বাঁশিটা। কপোতাক্ষের মাটি মেখেছিল মনিরুল সারা দেহে। স্থির দৃষ্টিতে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল তার নিষ্প্রাণ দেহটা। ঠিক ওখান থেকেই পুব আকাশের জ্বলন্ত সূর্যটা উঠবে। যার আলো ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে দিকে। যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে আজ মনিরুল মৃত। আর ইন্দুবালা? কী স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি? সে কথা কেউ কোনো দিন জানতে চায়নি তাঁর কাছে। আজও না।
