দরজা খোলার শব্দ পেলেন ইন্দুবালা। ধনঞ্জয় ঘর ঝাঁট দিতে এসেছে। নীচের রান্নাঘরে উনুনের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে। “বাজার কিন্তু কিচ্ছুটি করা নেই মা। কী রান্না হবে?” ধনঞ্জয় জানতে চায়। ইন্দুবালা চুপ করে থাকেন। “কী গো বলল কিছু? শরীর খারাপ নাকি তোমার?” ইন্দুবালা তখন উনুনের ধোঁয়া দেখছেন। জানলার বাইরে সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরে উঠছে। বাজারের লোকেরা এসে বলেছিল, “নিমতলার ইলেকট্রিক চুল্লীতে কাজ চলছে মা। বডি কাঠে পোড়াতে হবে।” তখনও শ্মশানে স্বামীর খাট ছুঁয়ে বসে আছেন ইন্দুবালা। দূরে লছমী ছেলে-মেয়েদের সামলাচ্ছে। “তোমরা যা ভালো বোঝো করো।” এইটুকুই বলতে পেরেছিলেন তিনি। মাস্টার রতনলাল মল্লিকের দেহ যখন চিতায় তোলা হলো তখনও ইন্দুবালা আঁচ করতে পারেননি কাঠে পোড়ানোর বীভৎসতা। মনের মানুষ ছিলেন না কোনোদিনই মাস্টার। কিন্তু যে মানুষটা চারপাশে ঘুরে বেড়াতো, এদিক ওদিক থেকে যন্ত্রণা দিতে; সময় নেই অসময় নেই ঘাড়ের ওপর চেপে বসতো; জোর করে সরিয়ে দিত শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, সেই মানুষটা আগুন পাওয়ার সাথে সাথে কেমন যেন চড়বড় করে উঠতে শুরু করলো তেলে পড়া মাছের মতো। শরীর ছুঁড়ে বেড়িয়ে আসতে থাকলো জল। যেন সারা জীবনের হুইস্কি, সোডা এক্ষুনি এই জ্বলন্ত সর্বগ্রাসী চিতাকে নিভিয়ে দেবে। লছমী এসে মুখ ঝামটা দিয়েছিল। “কী করছিস কি এখানে দাঁড়িয়ে তুই? আমাদের কি এসব দেখতে আছে? চল মেয়েটাকে দুধ খাওয়াবি চল। বড় কাঁদছে যে।” শ্মশানের মধ্যে বসে মেয়েকে দুধ খাওয়ালেন। স্বামীর চিতাভস্ম ভাসালেন গঙ্গায়। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে এসে নিজেই ভাঙলেন শাঁখা পলা সব কিছু। জোরে জোরে ইটের বাড়ি মেরে। সাবান দিয়ে মাথা ঘষে তুলে ফেললেন সিঁদুর। সাদা থান পরে নিজেকে যখন দেখলেন আয়নায় আর সামলাতে পারলেন না। হাউ হাউ করে চিৎকার করে কাঁদলেন ইন্দুবালা। সে শোক মাস্টার রতনলাল মল্লিকের জন্য নয়। মনিরুলের জন্য নয়। নিজের মুখটায় তিনি অবিকল ঠাম্মাকে দেখতে পেলেন।
ইন্দুবালা পাশ ফিরে শুয়ে ধনঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “উনুন ধরিয়েছিস কেন? গ্যাস কি ফুরিয়েছে?” ধনঞ্জয় হাতের ঝাঁটাখানা মেঝেতে রেখে বলে “ওই দেখো। আজকের দিনটা কি ভুলে গেলে মা তুমি?” ইন্দুবালা হাতড়াতে থাকেন মনের মধ্যে। “আজকে আবার কী?” ধনঞ্জয় মাথায় হাত দিয়ে বলে “সত্যি এবার তোমার বয়েস হয়েছে মা। আজ যে রথ। কুমোরটুলিতে দুর্গার কাঠামোয় মাটি পড়বে। ইস্কনের লম্বা রথ বেরোবে। কত সাহেব সুবো নাচানাচি করবে। হোটেলের বোর্ডে তো গতকাল লিখে রেখেছো…।” উঠে পড়েন ইন্দুবালা এবার তাড়াতাড়ি করে। “কী লিখেছি রে?” ধনঞ্জয় উত্তর দেয়, “খিচুড়ি, পাঁপড় ভাজা, আনারসের চাটনি আর কাঁঠালের ক্ষীর”। বিড়বিড় করে জানতে চান ইন্দুবালা, “আর মালপোয়া? লিখিনি সেটা?” ধনঞ্জয় রে রে করে ওঠে। “না না ওইসব একদম কিছু লেখা ছিল না। হাঙ্গামা বাধিও না মা। চিনির দাম বড় বেড়েছে। আটা বাড়ন্ত। ময়দা বাড়ন্ত। গোল মরিচ আনা নেই।” ইন্দুবালা জানতে চান “আর মৌরি?” ধনঞ্জয়ের জবাবে জানা যায় সেটাও বাড়ন্ত। তাহলে সব কিছু এখনি আনতে হবে ফর্দ করে। ইন্দুবালা পাশ থেকে চশমা নেন। পেন খাতা নিয়ে বসে পড়েন ফর্দ করতে। আর একটু হলে কী মারাত্মক ভুলটাই না করতেন তিনি! মালপোয়া হবে না রথে তাও কি হয়? খাটনির বহরটার কথা একবার চিন্তা করে চিরকালের অভ্যেস মতো ধনঞ্জয় আবার কাকে যেন একটা গাল পাড়ে। সেই অদৃশ্য মানুষটাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে ইন্দুবালার। যে ধনঞ্জয়ের গাল শুনেও মুখে রাটি কাটে না।
অনেক রাতে কলেজ স্ট্রিট পাড়া ঘুরে বাড়ি ফিরে আসে ভাই। হাতে তার একখানি চটি বই। তিন পাহাড়ের স্বপ্ন। “বেড়াতে যাওয়ার বই বুঝি?” ইন্দুবালা জানতে চান। ভাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে দিদির দিকে। “ধুর বেড়াতে যাওয়ার বই কেন হবে? খুলে দেখলেই বুঝতে পারবি”। এগিয়ে দেয় বইটা। ইন্দুবালা অবাক হন। “কবিতা পড়িস নাকি তুই আজকাল”? ঘাড় নাড়ে ভাই। “পড়ি তো। তুই আর মনিরুলদা যেমন পড়তিস”। কথা বাড়াতে চান না ইন্দুবালা। এরপর কথা বললে আরও অনেক কথা উঠবে। সেই কথা মনের মধ্যে হাওয়ার সাথে উথাল পাথাল হলে রাতে ঘুম হবে না। এই ভরো ভরো অবস্থায় মাস্টার রতনলাল মল্লিক তখন ঘুম না আসা বউকে আঁকড়ে ধরতে চাইবেন। দম বন্ধ হয়ে আসবে ইন্দুবালার। মাটিতে এখন তাই বিছানা। শরীরটাকে কোনোরকমে আড়াল করার চেষ্টা। “ওপরের ঘরে একা শুতে তোর ভয় করবে না তো?” অবাক হয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকায় ভাই। একদম মনিরুল যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ সরিয়ে নেন ইন্দুবালা। “ভয় করবে কেন? আমি তো এখন বাড়িতে একাই শুই মাঝের ঘরটায়। ঠাম্মার ঘরটা তো বন্ধই থাকে।” ইন্দুবালা জানতে চান, “ভয় করে না তোর?” ভাই বলে “ধুস…। ভয় করবে কেন? আমি কি এখনও ছোটো আছি নাকি?” ইন্দুবালা আদর করে ভাইয়ের নাক টিপে দেন। “থাক তোর আর বড় হয়ে কাজ নেই। দিদির সাথে কেমন আবার নাক ফুলিয়ে ফুলিয়ে কথা বলে।” ইন্দুবালার যখন বিয়ে হয় তখন ভাই তাঁর কাছে শুতে। জড়িয়ে আঁকড়ে ধরে। কতটুকুনি ছিল তখন। মাঝে মাঝে ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যেত ঠাণ্ডায় শীত করতে বলে। উঠে দেখতেন গোটা খাট ভিজিয়ে ফেলেছে ভাই হিসি করে। সেগুলো সব আবার কাঁচতে হতো। শুকোতে হতো। ঠাম্মা মাকে বলতো, “দেখেছে বউমা আমার ইন্দু কেমন সব কিছু শিখে যাচ্ছে চটপট করে। একটা বাচ্চা মানুষ করা কি চাড়িখানি কথা দিদিভাই। মা যখন হবি বুঝবি”। ইন্দুবালা সেটা বুঝেছিলেন খুব কষ্ট করে। নিজেকে তার জন্যে তৈরী করেছিলেন আগাগোড়া। মা, ঠাম্মা শিখিয়েছিল সব হাতে ধরে। তাই এতো অভাবের সংসারেও মানিয়ে নিতে অসুবিধে হয়নি ইন্দুবালার। নতুন বউয়ের গলা পর্যন্ত শুনতে পেত না কেউ। ভাই আসায় কত দিন পরে যে এত কথা বলছেন ইন্দুবালা। মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠছেন তাই। “আর একদিন থেকে যা না…” মাথা নাড়ে ভাই। “নারে, এবার হবে না দিদি। কয়েক দিন পরেই পরীক্ষা। না গেলে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। আবার বাবার শরীরটাও..”। থেমে যায় ভাই। ইন্দুবালা জানেন তাঁর বাবার শরীর ভালো না। মাঝে মাঝে জ্বর হয়। কাশি হয়। মা লিখেছে কাশির সাথে রক্ত ওঠে। ভাই ঘুমিয়ে পড়ে। ইন্দুবালা টেনে নেন পাশে রাখা চটি বইখানা। কবে থেকে কবিতা পড়তে শুরু করলো তাঁর ভাই? ‘তিন পাহাড়ের স্বপ্ন’ বইটার লেখক কে যেন এক বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এর কথাই বা সে জানলো কী করে? কলেজস্ট্রিটে গিয়ে একা একা কাদের সাথে যেন সে দেখা করেছে। মায়ের চিঠিতে জানতে পেরেছে ভাই আস্তে আস্তে জড়িয়ে পড়ছে নানা রাজনৈতিক কার্যকলাপে। ছোটো ছোটো দলে তারা নাকি ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ে, জঙ্গলে। ভেবেছিলেন ভাইয়ের কাছে জানতে চাইবেন সব। কিন্তু সময় পেলেন আর কোথায়? বইটাকে হাতে পেয়ে গন্ধ শুঁকলেন ইন্দুবালা। নতুন বইয়ের গন্ধ। এই বাড়িতে আসার পর থেকে কোনো বইয়ের মুখ তিনি দেখেননি। এতবড় বাড়িতে কেবলমাত্র পাঁজি, লক্ষ্মীর পাঁচালি, নারায়ণের অষ্টোত্তর শত নাম আর গীতা ছাড়া কোনো বই নেই। কবিতার বই তো দূর অস্ত। বইটাকে একটু উলটে পালটে দেখতে ইচ্ছে করলো ইন্দুবালার। আর ঠিক তখনই ডাক পড়লো তাঁর। মাস্টার রতনলাল মল্লিক অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় অপেক্ষা করছেন যে।
