বৃদ্ধ স্বাভাবিক ভাবে শুইয়া আছেন।
দুঃখিনী বন্ধুহীনা যশোবতী উন্মত্তের ন্যায় সমস্ত দিগদর্শন করিলেন, কেহ নাই। সর্পদেহী– আপকাল দেখিয়া তিনি শঙ্কিতা, জরায়ুস্থিত আসনে তাঁহার সর্ব শরীর বক্র হয়। কিয়ৎক্ষণ পরে নির্জীব কণ্ঠে বারংবার কহিলেন, “ওগো কথা বল, কথা বল…” এবং স্বামীর কর্ণের নিকটে মুখ লইয়া তারস্বরে বলিলেন, “কথা বল”। এই ব্যাকুলতা শূন্যতায় প্রতিধ্বনিত হইল, তাঁহার শিহরণ উপস্থিত, মুখ তুলিয়া প্রতিধ্বনির দিকে তাকাইবার চেষ্টা করিয়া চন্দ্রালোক দেখিলেন, যে চন্দ্রালোক জলে স্থলে– এখানে সেখানে।
“বউ…”
নাগরাজ বাসুকির দ্বারা নববধূর দেহটি আন্দোলিত হইল। বিস্ময়ে যশোবতীর মুখ খুলিয়া গেল, পলকেই মুখনিঃসৃত লালা আসিয়া পড়িল। তিনি তৎপরতার সহিত তাহা অপসারিত করিয়া বলিলেন, “এই যে আমি, খুব লেগেছিল হ্যাঁ গো” এবং সেইকালে সৰ্ব্বদিক অবলোকন করিয়া ‘আমি’ প্রতিধ্বনি বাক্যটিকে লক্ষ্য করিয়াছিলেন। পরে অতীব মধুর কণ্ঠে কহিলেন, “খুব লেগেছিল।”
“না না” বলিয়া বৃদ্ধ অতি ধীরে তদীয় পত্নীর হস্ত স্পর্শ করিলেন।
.
যশোবতী অতি সন্তর্পণে স্বামীর অভিপ্রায় মত পুনৰ্ব্বার কণ্ঠ আলিঙ্গন করত আনন্দ বর্ধন করিয়াছিলেন। উপত্যকার শান্ত হ্রদের ব্রাহ্ম মুহূর্তে সন্তরণরত শ্বেত মরাল আপনার দীর্ঘ, ব্য, সর্পিল গ্রীবা বাঁকাইয়া এই সপ্তবন্ধনের নিঃশ্বাসকে তির্যকভাবে দেখিয়াছিল। বৃদ্ধের ভাঙা ভাঙা কুঞ্চিত ওষ্ঠে নিশ্চিত হাসি ছিল। রাত্রনিহিত, তৃপ্তির অনন্য মরীচিকা, সুন্দর জোছনায় হেমন্তের শিশিরসিক্ত শেফালিকার মধ্যস্থতায় ব্যক্ত, উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল।
“আমি খুব ভয় পেয়েছিলুম”–নববধূ কহিলেন। এমন যে তাঁহার গাত্রবাস স্পন্দিত হইয়া উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে।
“ভয়!” এ বাক্য উক্তির সহিত তাঁহার, বৃদ্ধের, মুখগহ্বর দেখা যায়, মাড়ি অস্পষ্ট, উল্লিখিত ফলে, তাহা নিজেই ভীতির কারণ হইল।
এ কথা শ্রবণে যশোবতী সমস্ত প্রকৃতি আলোড়ন করিলেন, আপনার সুবৃহৎ চক্ষুদ্বারা দিক সকল দেখিয়া কহিলেন, “ভয় কি গো?” এবং পুনরপি বাস্তবজগৎ নিরীক্ষণ করত বলিলেন, “এই দেখ” বলিয়া কাংস্যবিনিন্দিত কণ্ঠে “ইংহি ইক ইক” বলিয়া রক্ত মন্থনকারী এক অদ্ভুত ধ্বনি তুলিলেন। এই হৃদয়-উদ্বেল-পটু শব্দে একমাত্র রাহুই সাড়া দেয়-জলপানরত ভয়ঙ্কর জীবসকল প্রাণভয়ে স্থির। চাঞ্চল্য দারুভূত। তিনি যেন হাসিয়াছিলেন।
একমাত্র বৃদ্ধ তাঁহার এ হেন দুর্ধর্ষ ডাকে নিশ্চিন্ত হইয়া জাগিয়া উঠিলেন। কিছুই তখনও চক্ষু মেলিতে সাহস করে নাই।
গঙ্গার শীতল বায়ুচাঞ্চল্যে জোনাকি-ঝাঁক তরঙ্গায়িত কভুবা ছত্রভঙ্গ, কোথাও কেহ নাই; লোক চরাচর স্তব্ধ। অলৌকিক দাম্পত্যজীবন যাহা তেজোময় দুস্পধর্ষ, আমাদের ক্রন্দন, আমাদের প্রতিবিম্ব, শ্মশানভূমিতে ইদানীং অশরীরী।
যশোবতী তপ্ত-উষ্ণ নিঃশ্বাস-বায়ুর মধ্য হইতে প্রশ্ন করিলেন, “হ্যাঁ গো তোমার কত কষ্ট হয়েছে, না গো…”
“না…না…ভাল…”
নববধূ স্বামীকে সচেতন মায়াময় করিবার মানসে শ্রীযুক্ত কণ্ঠে কহিলেন, “তোমার যদি কিছু হত, আমি গঙ্গায় ঝাঁপ দিতুম…”
বৃদ্ধ অবাক হইয়া তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিলেন। তিনি যেমন বা ধারাবর্ষণ-ক্ষান্ত ধরিত্রী দর্শন করিলেন। অনর্গল বৃষ্টি হেতু সমস্ত প্রান্তর জলময়, তথাপি প্রাণকুল ব্যস্ত।
“এ জীবন গেল, কি হয়েছে? আবার জন্মাব আবার ঘর পাতব”–এ কথায় এই লোকক্ষয়কারী শ্মশানভূমি যেন পক্ষীশাবকের ন্যায় কাতর হইয়া উঠিল। কেননা তাঁহার, ভাগ্যবতী যশোবতীর, অঞ্চলে তুরুপের ইহলোক, তাহার বীজ এবং বাঁচিবার ইচ্ছা-চিন্তা সকলই বাঁধা ছিল।
“আমার…সঙ্গে?”
শিশুর মত মাথা দোলাইয়া যশোবতী কহিলেন, “হিঁ গো, তুমি ছাড়া আর কে…! জান, আর জন্মে নিশ্চয় তোমায় কষ্ট দিয়েছিলুম, তাই এত দেরী হল আসতে। জান আমি ভূত হয়ে ঘুরছিলাম! তুমি যখন মাঠে মাঠে খেলেছ, ফড়িং ধরেছ, তখন কত হাততালি দিয়েছি, আমি সব দেখেছি…” এ কথায় যশোবতীর গভীর সংস্কার ছিল না। বিশ্বাস ছিল। সীতারাম যুবকের মত স্ত্রীর উরুতে চাপড় দিলেন, শাশ্বত সত্য কম্পিত; রমণীর জরায়ু মহানন্দে মহুয়া-বেসামাল নৃত্য করিতে লাগিল, আর যে কাহারা– মর্ত্যবাসী সম্ভবত, ঘোররবে অট্টহাস্য সহকারে মাদল বাজাইতে উন্মাদ। সমগ্র চক্ষুষ্মন, সমগ্র পরমায়ু আশ্বস্ত, একারণ যে তাহারা এক মনোহর দিব্য দৃশ্য দেখে–যে, এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড একটি মহতী জরায়ু, যেখানে বাঁশরীগীত প্রতিধ্বনিত এবং আপাতত বলিলেন, “আবার হবে”।
বৃদ্ধ সীতারামের সরল বাক্যে যশোবতী অল্পমাত্রায় স্থানীয় হিমবায়ু অনুভব করিলেন। তন্নিবন্ধন শুধুমাত্র বুঝিয়াছিলেন তাঁহার ইদানীং আদিত্যবর্ণ দেহ নানাবিধ অলঙ্কারভূষিতা, এবং এমন কি যাহা ধূলা, তাহাই তাঁহার স্নেহাস্পদ, কেননা ধূলাই তাঁহার প্রথম সন্তান; তিনি রমণী।
প্রৌঢ়শিলাসম সীতারাম এখন স্পন্দিত, প্রথমত যশোবতীর প্রাণ উচাটনকারী ঘোর রবে, দ্বিতীয়ত আপনার দেহে ক্ষণমাত্রস্থায়ী বিদ্যুৎ দর্শনে, স্বভাবে অধিষ্ঠিত হইয়া কহিলেন, “বউ গান বল।”
এ কথায় যশোবতী হাস্য সম্বরণ করিতে অপটু, মুখে বস্ত্রখণ্ড প্রদান করিলেন, দেহ-সকালের উড্ডীয়মান পারাবত যুথ যেমত সহসা ছত্রভঙ্গ হয়, তেমনি–ছত্রভঙ্গ হইল।
