“বল” বৃদ্ধ কহিলেন। এ বাক্যের ভিত্তিতে এই ইচ্ছা ছিল যে কাল পরাস্ত হউক।
যশোবতী সেই ভাবেই মাথা নাড়িয়া প্রকাশ করিলেন, সঙ্গীত তাঁহার আয়ত্তে নাই। অনন্তর মহা আগ্রহে বলিলেন, “তুমি বল না।”
“না তুমি…”;
বৃদ্ধ অপেক্ষা করিলেন, তাহার পর অভিমানে মুখ ঘুরাইয়া লইলেন। যশোবতী অভিমানী স্বামীকে তুষ্ট করিবার জন্য, কোন মতে ‘বেহাগে’ গাহিতে লাগিলেন।
“তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা,
অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয়ঃ সদা হরি”…
সদ্য যৌবনপ্রাপ্তির সুললিত মধুস্বর লীলা ভক্তির ঔদার্যে বাত্ময় হইয়া উঠিল। হাজার হাজার বৎসর, তাহার সেতু, তাহার হৰ্ম্মরাজি, জলযান, তাহার যুদ্ধ বিগ্রহ, তাহার প্রমোদক নন, রভস, ছুন্নৎ, হারেম, একটি আদরণীয় নবপ্রসূত মেষ শাবকের চপলতায়, রম্য ছায়ায় অবাক হইল। এমত সময় একটি বিরক্ত স্বর মৃত্যুমুখী নিঃশ্বাসের গড় গড় ধ্বনি তাঁহাকে বাধা দিল, বৃদ্ধ তিক্ত স্বরে কহিলেন, “হরিধ্বনি দাও না তার থেকে”…।
পতিপ্রাণা যশোবতী অপ্রস্তুত হইয়া থামিলেন, এখন তাঁহার শিরায় রক্ত প্রবাহ নিখাদকে কেন্দ্র করিয়া মন্থর গতিতে আবর্তিত হইতেছিল, তিনি সৃষ্টি ও স্থিতির মধ্যবর্ত্তী কোন স্বর যুক্ত করত ভাবিলেন, কি গাহিবেন! অবশেষে ধরিলেন–
“যাই যাই যাই যাই লো আমায় বাঁশীতে কে ডেকেছে,
পড়ে থাক ভেসে যাক কলস আমার–যমুনায়,
আমায়–বাঁশীতে কে ডেকেছে…”
যশোবতীর করতল মৃদু মৃদু বৃদ্ধের হস্তে আপনার গীতের তাল রক্ষা করিতে ব্যস্ত। গানের অন্তরীক্ষে যে সৌখীনতা তাহা নিয়ত জোনাকির পশ্চাদ্ধাবন করিল। সীতারামের শিরা উপশিরা, ঝড় সমাগমে স্বলিত কবরীর কেশরাশির ন্যায় ইতস্ততঃ প্রক্ষিপ্ত, উড়ন্ত, বাউরী, আসক্ত, বলবান, কোটি সর্পের মত–সম্মুখে বিদ্যমান মুখমণ্ডল তথা দেহটিকে কখনও বাঁধিতে কখনও বা কশাঘাতে সুস্ফীত করত–দীর্ঘায়ত করত মধুপান করিতে চাহিতেছে।
ঐ গীত ভেদ করিয়া হরিধ্বনির অট্টরোল উঠিল। পুনরায় জলদগম্ভীর শ্লেষাত্মক ত্রুর নিষ্ঠুর কর্কশ কণ্ঠে ‘হরিধ্বনি’ শ্রুত হইল। বৃক্ষস্থিত পক্ষীসকল ব্রাসিত, কাহারও বা স্বীয় অসাবধানতা বশত, বক্ষ রক্ষিত ডিম্ব সকল, পরস্পর আঘাতে শব্দ করিয়া উঠিল।
যশোবতী গীত না থামাইয়াই এই ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনিয়াছিলেন এবং তদবস্থায় ভেড়ীপথের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করত দেখিলেন, ইহা শব যাত্রীদের হরিধ্বনি নহে, মাত্র একজন লোকই স্কন্ধে একটি বাঁক লইয়া অল্প দুলিতেছে। দেখিলেন, এই কায়ার পদনিম্ন হইতে মৃত্তিকা খসিয়া গেল, সে কোনমতে আপনাকে সামলাইয়া কিছুক্ষণ পরে বাঁক লইয়া একভাবে নামিয়া গেল। কায়াটিকে আর দেখা গেল না। কেন কি জানি, তাঁহার মনে হইল, পুনৰ্ব্বার বিকট হরিধ্বনি হইবে। তিনি গীত থামাইয়া স্বামীর কানে তুলা ভরিয়া দিবার কালে দেখিলেন, সীতারাম অদ্ভুত আরামে নিশ্চিহ্ন। তাঁহার দেহ যশোবতীর সুখকর প্রীতিবৰ্ধক স্পর্শ দ্বারা আমোদিত, প্রহৃষ্ট করিতে প্রয়াস পাইলেন।
যশোবতী অন্যমনা হইয়া ভেড়ী পথের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন। সেখানে কেহ নাই। কেবলমাত্র পূৰ্ব্বকার ঘটনার স্থানটি দর্শনে নববধূ শিহরিয়া উঠিলেন, একদা যাঁহার স্বরভেদ প্রলয়কালীন অবস্থার সূচনা করিয়াছিল, তাঁহার এ বৈলক্ষণ সমুৎপন্ন! এই ক্ষুদ্র ছাউনির আশ্রয় যতটুকু আশ্বাস নির্ভর, তাহা তাঁহার দেহে সঞ্চারিত করিয়াছিল! এখনকার ছায়াই তাঁহার নির্ভরতা!
“বউ…” ইহার পর বৃদ্ধ অসম্ভব শক্তি সঞ্চয় করিয়া কহিলেন, “মাটি মাটি, ভিজে ভিজে…”
যশোবতী ইহার অর্থ সঠিক করিতে না পারিয়া ভাবিলেন স্বামী বোধ করি কোন ঔষধ চাহিতেছেন। ইতিমধ্যে বৃদ্ধ কিছু বলিবার আপ্রাণ চেষ্টায় পরিশ্রান্ত। যশোবতী অত্যন্ত ব্যগ্র তৎপরতার সহিত মস্তকের নিকটে রক্ষিত ছোট হাঁড়ি খুঁজিতে গিয়া তুলসী গাছটি হেলিয়া স্বামীর কাঁধে পড়িল, যশোবতী এক হাতে তুলিয়া ধরিলেন।
“গাছ…”
যশোবতী, তুলসী চারাটি তাঁহার কাছে লইয়া যাইতেই গাছটি নিকটে পাইয়া বৃদ্ধ যেন উচ্ছ্বসিত; তিনি কী অনুযোগ করিয়াছিলেন তাহা আর স্মরণ ছিল না। গাছটি যেমন প্রস্ফুটিত চম্পকদাম, বৃদ্ধের আগ্রহ-আতিশয্যে যশোবতী ইহাকে বৃদ্ধের হস্তস্পর্শ করিবার সাহায্য করিলেন।
বৃদ্ধ সীতারাম এক্ষণে তাঁহার হস্ত দ্বারা যশোবতীর সাহায্যে গাছটির নিম্নে কি যেন খুঁজিতে খুঁজিতে–অন্ধকারে এতদিন পরে সব্বার্থসাধক কিছু অন্বেষণে একাগ্র, হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “শিকড়” কোন ক্রমে নিজের নাসিকার নিকটে আনিলেন। কণা কণা মৃত্তিকা পড়িল। মুখগহ্বরে প্রবেশ করিল, তিনি আস্বাদ গ্রহণ করিয়াই “মাটি” বলিয়াই অসম্ভব জোরে স্ত্রীর ঊরুদেশে আহ্লাদে এক চাপড় মারিলেন। তুলসী গাছটির নিম্নের মৃত্তিকাকে এই আশ্চর্যভাবে আস্বাদন করিতে দেখিয়া নববধূর মনে হইল যেন স্বামী তাঁহারই, যশোবতীর, প্রথম সন্তানের আস্বাদ গ্রহণ করিতে উৎফুল্ল।
বৃদ্ধের মস্তক উত্তেজনায় অনেকখানি ছাড়িয়া উঠিয়া আবার যথাস্থানে ফিরিল। “আঃ আঃ বউ…” কোন ইন্দ্রিয় যেন চরিতার্থ হইয়াছে। যদিও যশোবতী স্বামীর এরূপ ব্যবহারকে উন্মত্ততার লক্ষণ বলিবার মত সময় পান নাই, তথাপি ইহা যথার্থ যে, তিনি কিঞ্চিত্র বিচলিত হইয়াছিলেন। সকল সময়ই তাঁহার মনে হইতেছিল, বাবলাকাঠ নির্ম্মিত হালের ফলা যেমত বৎসরে একদা লক্ষ মাণিক্যের বিভা ফিরিয়া পায়, তদ্রূপ, বৃদ্ধ যেমন বা শক্তি ফিরিয়া পাইয়া বলীয়ান হইয়া উঠিয়াছেন। ইহাতে, তাঁহার ইচ্ছা হইল, তিনি যেন স্বামীর ছায়ার মত হইবার সৌভাগ্য লাভ করেন, তাঁহার ইচ্ছা হইল ইহার আড়ালে যেন তাঁহার স্থান হয়।
