পতি ব্যাকুলা যশোবতী বস্ত্রপ্রান্ত দ্বারা স্বামীর ওষ্ঠভাগ, যাহা জলসিক্ত, সযতনে মুছাইলেন, কেননা ইদানীং তাঁহার আপনকার দেহবর্ণের স্বর্ণ-পীত এবং দূর অম্বরের নীল, আর এক অনন্য সবুজতার সৃষ্টি করিয়াছে–তিনি আড়নয়নে এ-শোভা দেখিয়া সম্মোহিত রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিলেন। এই গূঢ় উপলব্ধিতে আপনার দেহের ভিতরে কাহারা…যেন বা আলিঙ্গন করিতে লাগিল।
“চাঁদ”…
যশোবতী ‘চাঁদ’ বুঝিয়া লইয়া স্বামীর প্রতি স্মিতহাস্য করত চাহিলেন।
“চাঁদ”…
যশোবতী এক্ষণে তাঁহার বাক্য, বোধ করি, অনুধাবন করিতে পারিয়া চাঁদোয়া টানাইবার জন্য ব্যগ্র হইলেন। সীতারাম অত্যধিকভাবে প্রতিবাদ করত করিলেন, “না না…।”
যশোবতী ইহাতে স্বামীর কানের তূলা বিশেষ সন্তর্পণে বাহির করিয়া কল্পনাতীত স্নেহস্বরে বলিলেন, “হিম পড়বে যে…” একথা বলিতে বলিতে হঠাৎ তাঁহার বাল্যের স্মৃতি জাগিল। একদা ঝড় বৃষ্টির মধ্যে ত্রস্ত দুধের লাউ গাছ দেখিয়া মনে বড় দুঃখ হইয়াছিল।
সীতারাম আকাশ দেখিয়া, হিম স্মরণে, সম্মত হইলেন।
চাঁদোয়া খাটান হইল। সীতারাম এই মুহূর্তটুকুর জন্য যেন বা সকল শক্তি সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছিলেন; তিনি যে অথৰ্ব্ব একথা ভুলিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। নববধুর প্রতি তাকাইয়া বলিলেন, “আকাশ…বড় ভয়…”
উদগ্রীব হইয়া তাঁহার কথা শুনিয়া, যশোবতী সগর্বে বলিলেন, “কেনে গো, আমি আছি” আবার স্পষ্ট করিয়া বলিলেন, “ভয় কি, ভগবান আছেন।”
তাঁহার কথা যেন বা বৃদ্ধের মনঃপূত হইল না, অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া নববধূর হস্তটি স্পর্শ করিয়া বুলাইতে চাহিলেন, পরে কোনমতে আপনার গণ্ডদেশে লইয়া চাপিয়া ধরিয়াছিলেন। যশোবতী অনুভব করিলেন, বৃদ্ধ কাঁদিতেছেন।
বার্ধক্যের অশ্রু যশোবতাঁকে বহু জন্মের পুঞ্জীভূত সঙ্গ, বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য, অন্তরঙ্গতা, মিত্রতা, মিত্রতার মধ্যে যেমন গঙ্গাজল, গঙ্গাজলের মধ্যে যেমন আপনি, আপনার মধ্যে যেমন অক্ষর, তাহা এক নিমেষেই দান করিল। এখন তিনি যেন তাঁহার স্বামী হইতেও আতুর, একদা মনে হইল সীতারাম শিশুবৎ, ইহাকে সাদরে কোলে লওয়া যাইতে পারে, পরক্ষণেই কৰ্ত্তব্যজ্ঞান ফিরিয়া পাইয়া তাঁহার চক্ষুদ্বয় মুছাইয়া বলিলেন, “কাঁদো কেনে গো…”
“আমি…বাঁচব…”
সীতারামের উক্ত ‘আমি’ কথাটা যশোবতাঁকে অভিমানী করিল, যেখানে তিনি, যশোবতী, বন-মায়া, তিনি বলিতে চাহিলেন, ‘আমি’ বল না, শুধু বল বাঁচব কিন্তু তবু আপনার বিরক্তি দাঁতে কাটিলেন।
“আমায় ত ভগবান এনেছেন তোমায় বাঁচাবার জন্য গো।”
“বউ ভয় মায়া” বলিয়া অঙ্গুলি দ্বারা যশোবতীর প্রতি ইঙ্গিত করিলেন।
“মায়া…”
“আমার জন্য?” এইটুকু মাত্র প্রশ্ন করিতে যশোবতী কোনক্রমে সক্ষম হইয়াছিলেন।
তাঁহার আজন্ম সযত্নে রক্ষিত অভিমান, দেহের মধ্যে পলকেই কুম্ভকের সৃষ্টি করিল, প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস এবং তদনন্তর নেত্রে অশ্রু দেখা দিল, এখন বিগলিত হয়; তবু এ সত্য অনস্বীকার্য যে, অষ্টলক্ষণ সমুদয় প্রভাবসম্পন্ন, ফলত ললাটে স্বেদবিন্দু ও অন্তরের পুলক আকল্প-নবীন একভাবের সূচনা-নয়নে উন্মীলন আকাঙ্ক্ষায়, কৃষ্ণ মেঘোদয়ে ময়ূরসমান; এবং ধীরা, নবোঢ়া, লাজুক, শীলা, বিহুলা, বিড়ম্বিত, মুহ্যমান–বিষাদময়ী যশোবতী প্রগম্ভ হইলেন, আপনকার দেহ হইতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হইল; তিনি মুহুর্মুহুঃ বলিতে লাগিলেন, “সত্যিই…সত্যিই মায়া হয়” বলিতে বলিতে আপনার ভগ্নস্বরে আপনি সম্মোহিত হইয়া, জরাজীর্ণ কালাহত স্বামীর কণ্ঠ ঝটিতি আবেষ্টন করত রমণী জীবনের, প্রকৃতি জীবনের, প্রথম, মধ্য এবং শেষ এবং শ্রেষ্ঠ আশ্রয় গ্রহণ করিলেন।
তাঁহার, যশোবতীর জীবন সার্থক হইয়াছিল।
অদ্যের এই বেলাতটের পড়ো-নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য্যের বাস্তব-বিদ্যমানতার জন্য, এই আদিষ্ট ভূমি– ভূতগ্রামের জন্য, তিনি নিজেই বর প্রার্থনা করিয়াছিলেন; এবং বালকস্বভাব ভোলানাথ, যিনি সৰ্ব্বমঙ্গলময়, যিনি চিৎস্বরূপ, যাঁহার বিভূতির অন্তর্গত দৃশ্যাদৃশ্য সৃষ্টি, যিনি অদ্বিতীয় পুরুষ, ষড়ৈশ্বৰ্য্যময়ী শ্যামার চরণাশ্রিত প্রৌঢ়শিলাবৎ অনড়; ইদানীং যিনি শঙ্কর, যাঁহার বাম জঙঘাপরি নবারুণ প্রকট-চম্পকদীপ্ত-বিদ্যুৎপর্ণা আসীনা, অর্থাৎ পাৰ্ব্বতী, অধরে মধুরার ‘মিথুন-হাস্য’ এবং উদাসীকে প্রেক্ষণব্যস্ত–সেই পাৰ্বতীপ্রিয় শঙ্কর, যিনি অবিচারিত চিত্তে মানুষকে চারিফল দান করেন, তিনি নিশ্চয়ই, যশোবতীর প্রার্থনায়, বলিয়াছিলেন–”তাহাই হউক”। এবং তিনি, যশোবতী, বৃদ্ধকে জড়াইয়া ধরিলেন।
উদ্ভিন্ন বনজযৌবনার মৃণালসদৃশ ভুজবন্ধনে বৃদ্ধ’ পরিত্রাহি ডাক ছাড়িলেন, আকুল সমুদ্রের প্রায়-নিমজ্জমান ব্যক্তির ন্যায় মুখব্যাদান করিলেন। আকাশ অন্ধকার হয়। যশোবতী ভীতা হইয়া তাঁহার হাতখানি অপসারণ করিতে গিয়া পুনরপি কণ্ঠ আবেষ্টন করিয়াছিলেন। বৃদ্ধের কণ্ঠরোধ হইবার উপক্রম হইল। নববধূর হাতখানি সরিয়া গেল, তিনি শশব্যস্তে ব্যগ্রতার সহিত, “কি হয়েছে গো অমন করছ। কেনে…লেগেছে?” অত্যন্ত সরল কণ্ঠে বলিলেন।
অনন্তর, বিশুদ্ধ বায়ু লইবার মানসে সীতারামের মস্তক সঞ্চালিত হয়, তাঁহার প্রাণ বুঝি যায়; ইদানীং যে প্রাণ তাঁহার সহজ বন্ধন মাত্র। যশোবতীর শরীর আড়ভাবে ন্যস্ত ছিল। তিনি উপস্থিতবুদ্ধিরহিত, কেবলমাত্র আকৰ্ণবিস্তৃত নয়ন যুগল তড়িৎ ভঙ্গিমা চকিত, কোনমতে আলুথালু বেশে উঠিয়া বৃদ্ধের প্রতি মনোনিবেশ করিলেন।
