যদিও সে জাগ্রত, যদিও নরবসার গন্ধে এ স্থান পার্থিব, যদিও.বেদনা অনুভব এখনও তাহাকে নিঃশ্বাস লইতে সাহায্য করিতেছিল, তবু ইতিপূৰ্বের সৃষ্টিছাড়া ডাক তাহাকে কণ্টকিত করিয়াছিল। অনন্তর আপনার সম্পর্কে তাহার অসম্ভব সন্দেহ উপস্থিত হইল। তাহার অস্তিত্ব কেহ কি জানে! না সত্যই সে ঘুম! ঘোর বিপৎকালে মেঘঘটা যামিনীর তীক্ষ্ণ মুহুর্মুহুঃ বজ্রপাতে, অথবা ভূমিকম্পে আপনার কুশলবার্তা অর্থাৎ আমি আছি, এ বার্তা গ্রামান্তরে শঙ্খধ্বনি করত সে কখনই পৌঁছাইয়া দেয় নাই।
‘আমি কি ঘুম!’
‘আর জন্মে আমার নাম কি ঘুম ছিল?’ বৈজুনাথ, যাহার কোনদিন ভয় ছিল না অথবা যে কোনদিন ব্রাসিত নয়, সে ইদানীং যারপরনাই ভীত, শঙ্কিত, ত্রস্ত পাণ্ডুর। এ মহাশ্মশান, যেখানে সে একাকী, নির্ভীক কালযাপন করে, এখানকার রাত্র তাহার নিকট স্বাভাবিক যন্ত্র মাত্র। গঙ্গার জড়-মধ্যরাত্রের বায়ু সঞ্চালনে এ স্থানসমূহ যখন বিশ্রী তখন তাহার, বৈজুনাথের, বন্ধুগণ–ক্রীড়াসহচরগণ আইসে। বীভৎস, চৈত্যবৃক্ষ সম ভয়ঙ্কর প্রেত সকল মিলিয়া নৃত্য আরম্ভ করে, বিপুল আনন্দে দিগ্বিদিক অধৈৰ্য্য; কিছু দূরের নিদ্রা, কিছু অজানিত বিশ্রাম অন্তরালে বীজদৃপ্ত ভাবনাকে–মার্জার যেমন মূষিককে–ব্যতিব্যস্ত করে সেইরূপ বিঘ্ন সাধন করিয়া থাকে। এ খেলায় অবৈধ প্রণয়ের গর্ভপাত-হেতু ভ্রণপিণ্ড যাহা প্রেত-পরিণত সেও আপন পিণ্ডময় শরীর আন্দোলিত করত মহানন্দ প্রকাশে অস্থির; অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মৃত রমণীর প্রেত অধিক রসময়ী; ক্রমাগত ইহারা, ভয়ঙ্করদর্শন প্রেত-সকল, এবং বৈজুনাথ ঘুরিয়া ঘুরিয়া খেলা করে; খেলার শেষে তাহারা ক্রমান্বয়ে বলে, “তেষ্টা তেষ্টা।”
বৈজুনাথ বালকসুলভ চাপল্যে তাহার অঙ্গুলিদ্বারা গঙ্গাকে নির্দ্দেশ করে।
কখনই সে ভয় পায় নাই।
সে প্রশ্ন করিল, “আমি, আমি কি ভূত! না না না…নিশ্চয় প্রেত…না আমি চণ্ডাল? হয়ত আমি চিতা! এখন পুনরায় তাহার কণ্ঠে প্রসন্নতা বর্তমান। কেননা গঙ্গার স্রোত তাহার সহিত কথা কহিয়াছে।
.
এখন অপরাহু সন্ধ্যাগত।
যশোবতী কেশবিন্যাস কালে কিছু কিছু অনাবৃত হইয়া পড়িবার ভয়ে সকল দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। তবুও প্রসাধনরত এই ডালিমের বাস্তবতাকে আর একজন অলক্ষ্য হইতে দেখিতেছিল। স্বামী সীতারাম অধুনা যেন কেমন অনড়, ফলে যশোবতীর নিজের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়াছিল; পুত্রদ্বয়ের কথা তাঁহার স্মরণ হইল, অবশ্য তাহাদের যে কি হইল তাহা ভাবিবার পর্যন্ত তাঁহার উৎসাহ। ছিল না। তথাপি তিনি বেণী রচনা করিতে করিতে চকিত পদে খানিক দূর অতিক্রম করিয়া থমকাইয়া দাঁড়াইলেন, আপনার স্বাধীনতাকে অচিরাৎ সাক্ষাৎ করিয়া গম্ভীর, যতদূর এখান হইতে দেখা যায় ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, টিয়ার ঝাঁকে তাহা যেন আত্যন্তিক প্রসারী, এই স্বাধীন মনোভাব দিয়া আপন বেণী বন্ধন কাৰ্যে মনঃসংযোগ করিলেন।
পদচারণে ব্যাপৃতা, এ শ্মশানে নির্ভয়ে আপন গোপনতাকে সন্ধ্যা সমাগমের জন্য প্রস্তুত করা একমাত্র তাঁহার দ্বারাই সম্ভব; তৎকালে নিশ্চয়ই পুষ্পবৃষ্টি হইয়া থাকিবে, তৎকালে ধ্রুবসত্য যে, গোলাপ তাঁহার অনুগামিনী হইয়া থাকিবে। তিনি আবার ফিরিয়া আসিলেন।
সীতারাম প্রশ্ন করিলেন, “কি?” অর্থাৎ কোথায়?
যশোবতী এমত প্রশ্নে ঈষৎ অবাক। তাহার পর কহিলেন, “ছেলেরা” এবং স্বামীর কানের তূলা সরাইয়া কহিলেন, “আঁধার হল…ছেলেরা ত কেউ…”
“মরুক…আমি আছি…”
বৃদ্ধের ঘোষণাউক্ত ‘আমি’ বাক্য সৌষ্ঠবে যে ক্ষুদ্র তন্মাত্ৰা বৰ্ত্তমান, তদনুরূপ ক্ষুদ্র একটি ক্ষণস্থায়ী নির্ভরতা যশোবতীর মনে সঞ্চারিত হইয়াছিল। তিনি নোলকটি একটি অঙ্গুলিদ্বারা ঈষৎ আন্দোলিত করিতে করিতে অন্যমনস্কা হইলেন এবং এককালেই শুনিয়াছিলেন “কাজল”।
বৃদ্ধের চোখে দিবার নিমিত্ত একটি কাজললতা ছিল, তাহা খুলিয়া, যশোবতী সস্নেহে তাঁহাকে কাজল পরাইতে লাগিলেন। এখন, নিশ্চয়ই মনে হইল এ কাজল–এ অন্ধকার, শিখাতে দাহ্য হয় নাই, আলো পার হইয়া আসিয়াছে। পথশ্রমে উহা কাতর বা ম্লান কভু নহে।
কাজলচৰ্চ্চা কালে তিনি বার বার স্বামীর মুখাবলোকন করিয়াছিলেন, এ কারণে যে, তাঁহার সকল সময় মনে হইতেছিল, সীতারাম এখনও হস্তের আঘাত-প্রসূত ব্যথায় মর্মাহত, এখনও তাঁহার অশ্রুসিক্ত নিঃশ্বাস ক্রমে ক্রমে পড়ে, এবং এইহেতু এই প্রথম যশোবতীর চিন্তাসূত্র গৃহী হইল। ইতঃপূৰ্ব্বে শুধু সংস্কার ছিল। এক্ষণে বুঝিলেন সম্মুখে যাহা, তাহা গঙ্গা, তাহার প্রতিটি জলবিন্দুতে মেঘ এবং সে মেঘের পিছনে প্রশান্ত, সুন্দর, শান্ত, অক্ষয়, পিতা নীলিমাসুতরাং বৃদ্ধের জন্য ব্যাকুলতায় পদদ্বয় নাচিয়া উঠিল, তিনি যেমন স্বামীর জন্য বিশ যোজন পথ অক্লেশে দৌড়াইতে দৌড়াইতে আসিতেছেন–রক্ত, মাংস, গোঙানি, জিহ্বা–তাঁহার এ পথে মায়া সৃষ্টি করিতে পারে নাই। তিনি সিদ্ধা।
সীতারামের চক্ষুর্ঘয়ে বিদ্যুৎ খেলিতে আরম্ভ করিয়াছিল, কোথা হইতে জোয়ালঠেলা ক্ষমতা সঞ্চয় করিয়া তিনি নিজেকে প্রকাশ করিতে চাহিলেন, সন্তরণ অভিজ্ঞ পুরুষ যেমত সহজেই জলের তলদেশ হইতে উল্কা গতিতে উপরের দিকে আসে সেইরূপ তিনি উঠিয়া আসিলেন, বারম্বার ওষ্ঠদ্বয় কম্পিত হইল, কিন্তু বাক্যস্ফূৰ্ত্তি হয় নাই। করুণভাবে আপনার স্ত্রীর প্রতি চাহিয়া, প্রাণান্ত করিয়া কণ্ঠে শুদ্ধ স্বর আনিতে চাহিলেন, চক্ষে জল আসিল।
