পুনশ্চ: পশ্চিম আমেরিকার লস এঞ্জেলস থেকে ১৫০ মাইল দূরে যশুয়া বৃক্ষ ন্যাশানাল পার্ক। মরু অঞ্চল। সব নেড়া পাহাড় আর মধ্যম উচ্চতার যশুয়া বৃক্ষ। নিঝুম জনবিরল অঞ্চল। সেখানে একটি উপত্যকার নাম “লস্ট হর্স ভ্যালি” আর রাস্তার নাম লস্ট হর্স রোড। ভানুর ঘোড়া প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে কি সেই মরু অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছিল হিরোসিমা পার হয়ে? প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারেই তো ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলস আর যশুয়া বৃক্ষের মরু-পাহাড়ের অঞ্চল।
বিবেক আছে বিবেক নেই
বিবেক নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষের বড়ই মাথা ব্যথা। বিবেক যদি লকারে ঢুকিয়ে চাবির পাশ ওয়ার্ড ভুলে যান বা চাবিটি গঙ্গা গোদাবরী নর্মদার জলে ফেলে দেন তবেই না আপনি আপনার জীবনে সব পাবেন। ধন ও মান। ক্ষমতা। বহুজনের সম্ভ্রম। আপনি দুধে ভেজাল দেন, ভেজাল ওষুধের ফ্যাক্টরি খুলে বসেছেন, ভাগাড়ের মাংসর কারবারে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন, ব্যাঙ্কের কাছ থেকে কোটি টাকা লোন নিয়ে পগার পার হয়ে বিবেকের বাণী দিচ্ছেন, সবের মূল সেই চাবিটি যা কি না গঙ্গা গোদাবরীর জলে আপনি ফেলেছেন কি ফেলেননি। জীবনে সবই হবে বিবেক বর্জিত হয়ে থাকলে। আর যদি অপরটি হয়, বিবেক নিয়ে দিন রাত ভাবেন, দুধের লাইন থেকে, সমস্তদিন যা যা যেভাবে করা উচিত, তা না করে পারেন না। ভিতর থেকে সায় পান না লাইন ভেঙে আগে নিজের কাজটি করে ফেলার, কেরানি হয়ে টেবিলের নিচ থেকে হাত বাড়িয়ে টাকা নিয়ে অকাজের কাজটি আগে করে দেওয়া কিংবা বড় সায়েব হয়ে ফাইল জমিয়ে রেখে চাপ রাখা, কিছু বেনিফিট আসুক, তারপরে তো ফাইল নড়বে। আমি এক বিবেকবাবুর কথা বলি, একেবারে জীবনের অভিজ্ঞতা। ভেজাল নেই। অবাঙালি বড় সায়েব তরুণ, বছর চল্লিশ। প্রাণময়। তাঁর অধীনে যিনি ছোট সায়েব তিনি পুরাতন। ছোট সায়েব লেখেন। বই আছে কিছু। নাম আছে যে অবাঙালি বড় সায়েব জানেন। বড় সায়েবের পরিবার এই কলকাতা শহরের একশো বছরের পুরনো পরিবার। তাঁদের পরিবারের ব্যবসা আছে। তিনি ব্যবসায় না জুতে সিভিল সার্ভিস দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছেন। বলেন পাবলিক সার্ভিসে বহুত আনন্দ আছে, ব্যবসায় তা নেই। আনন্দ কেমন, না পাবলিকের মুখের হাসি দেখতে তাঁর ভালো লাগে। ভয় আর আশঙ্কা নিয়ে যে পাবলিক আসে, তার কথাটি মন দিয়ে শুনা গেলে অর্ধেক ভয় কেটে যায়। আর কাজটি যদি হয়ে যায়, সে যে কেমন আলো ফুটে ওঠে মুখের উপর তা তিনি এক্সপ্লেন করতে পারবেন না। তিনি বলেন ‘দত্ত সায়েব আপনি লিখেন, আপনি তা লিখতে পারেন’।
হ্যাঁ, বড় সায়েবের কাছে অনেক রকম অনুরোধ আসে, এই কাজটি করে দিন, ওই কাজটি করে দিন। আইন বড় বালাই। আইনকে আবার তিনি যত ভয় করেন, তাঁর অধীনস্ত ছোট সায়েব তার চেয়ে বেশি ভয় করেন। চাকরি আছে বছর দেড়। সারাজীবন উদ্বিগ্ন হয়ে কাটিয়ে গেলেন, ভুল হলো নাকি। আইনের বাইরে কাজ হলো নাকি? অল্প বয়সে ঝুঁকি নিয়ে যা করেছেন, করেছেন, কিন্তু তা করেছেন বিবেকের তাড়নায়। বিবেকের তাড়নায় তিনি আইন ভেঙেছিলেন। বেশি বয়সে বিবেক বিসর্জন দিয়ে আইন ভাঙতে তিনি পারবেন না। তা করতে মন সায় দেয় না। ভয়ও করে। অথচ উপর থেকে চাপ আছে। খুব চাপ। খোদ মহাকরণের চাপ। যা হয় না, তা যেভাবে হোক করে দিতে হবে। অল্প বয়সে বিবেকের তাড়নায় যে আইন ভেঙেছিলেন তার কথা মনে পড়ে। নিঃসন্তান বিধবা এক বৃদ্ধা যাবেন কাশীতে তীর্থ করতে, এক বিঘে জমি তার জন্য বেঁচে দেবেন। দেওরকে বলেছিলেন, এক বিঘে ধানীজমি নিয়ে তীর্থ যাত্রার পাথেয় দিতে। দেওর দিয়েছিল। বিনিময়ে তাঁর অজান্তে যাবতীয় সম্পত্তি বিক্রয় দলিলে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। ভিটেটুকু পর্যন্ত। এক মাস বাদে তিনি কাশী থেকে ফিরে দ্যাখেন তাঁর ভিটেই আর নেই। মাটির বাস্তুভিটে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে দেওর। সব দখল করে নিয়েছে রেজিস্ট্রি করা দলিলের জোরে। তিনি তরুণ বিবেকবান কর্মী। সেই বিধবা তাঁর কাছে অভিযোগ করলে, তিনি সেই দলিলের নথিবন্ধন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যা করা যায় না তাই করেছিলেন। এর ফলে ভুগতে হয়েছিল তাঁকে, কিন্তু শেষ অবধি তাঁর জয় হয়েছিল। বিবেকবান উপরওয়ালাকে সব লিখিত ভাবে জানালে তিনি সমস্ত কথা শুনে, আইনের পথ বাতলে দিয়েছিলেন। কী ভাবে রায় লিখতে হবে বলে দিয়েছিলেন। আইন তো আইন। লিখনে তার নানা ব্যাখ্যা করা যায়। এখনো লিখনে মহাকরণের অনুরোধ মান্য করা যায় যদিও তা এক প্রতিষ্ঠানের বেআইনি কাজকে মান্যতা দেবে। জমি হাঙরের পক্ষে দাঁড়ানো হবে। কাজ আর হয় না। উপর থেকে চাপ আসে, তবু ছোট সায়েব ফেলে রাখেন। কী ভাবে করবেন? বড় সায়েবের অনেক গুণ। একবার এক ধনী ব্যক্তির কাজ আটকে ছিল। আগে করার জন্য তিনি এসেছিলেন দুটি সিঙ্গল মল্ট হুইস্কির বোতল নিয়ে। দুই সায়েবকে দেবেন। বড়দিন আসছে তো। বড় সায়েব ছোট সায়েবকে ডেকেছিলেন তাঁর চেম্বারে। তখন ধনী ব্যবসায়ী বসে আছেন সেখানে। বড় সায়েব জিজ্ঞেস করলেন ছোটকে, আচ্ছা, দত্ত সাহাব, আপনি ড্রিঙ্ক করেন? ছোট সায়েব চমকে গেছেন, বাইরের লোকের সামনে এই প্রশ্ন? জিজ্ঞেস করলেন, কেন স্যার?
