মনে আছে গ্রীষ্মে কাঁসাই এর বালুকাচ্ছন্ন বুক পার হয়ে গাড়ি উঠবে বাঁধে। বলদ দুটি টানতে পারছে না। উপরে উঠতে গিয়ে বসে পড়ছে বার বার। গাড়িতে অনেক ধানের বস্তা। ভার কম নয়। গাড়োয়ান টানছে গাড়ি জোয়ালে কাঁধ দিয়ে। মনে পড়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে দুই বলদ। গাড়োয়ান থামাতে পারছে না। পথে ফণা তোলা বিষধর দেখেছিল তারা। গরুর গাড়ির গতি দেখেছিলাম সেদিন। গাড়োয়ান অসহায়। আবার দেখেছি ধীর গতিতে নববিবাহের পর কন্যা চলেছে শ্বশুরবাড়ি। ছইয়ের ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে জলভরা চোখে সে দেখছে চারদিকের মাঠ আর গ্রাম-পৃথিবী। বরই গাড়োয়ান। সে বরবেশে বসে আছে গাড়োয়ানের জায়গায়। গরুকেও সাজিয়েছে সে ফুলের মালা দিয়ে। আহা এমন দৃশ্য জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না।
গরুর গাড়ির ইতিহাস যুগ যুগান্তের। নতুনপ্রস্তর যুগের সময় থেকেই মানুষ এই যানটি ব্যবহার করে আসছে। আল্পস পর্বতের উপত্যকায় গুহাচিত্র পাওয়া গেছে গরুর গাড়ির। গুহাচিত্র থেকে জানা যায়, যে খ্রিস্টের জন্মের ৩১০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগেও গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল। হরপ্পা সভ্যতাতেও যে গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল তার সপক্ষে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খ্রিস্টজন্মের ১৬০০ থেকে ১৫০০ বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল, যা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ে।
হ্যাঁ, এও সত্য, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতার আদ্যিকালের এই যান। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গায়কের গানের অংশ শোনাই,
গরু মইষের গাড়ি নাই
গাড়ির উপুরা ছই নাই
ছইয়ের তলোত কইনা নাই
সেই গাড়ির গাড়িয়াল নাইরে
আজি গাড়িয়াল বন্ধু হারেয়া গেইছে রে।
গাড়িয়াল, গাড়োয়ান হারিয়ে গিয়ে মানুষের গানই শেষ হয়ে গেছে।
এই দেখুন গরুর রচনা লিখতে গিয়ে গরুর গাড়ি নিয়ে কত কথা বলে ফেললাম। গরুর রচনা এমনি। গরুকে ফেলে তা যাত্রা করে অন্যদিকে। অন্য কারো উদ্দেশে।
বেচতে বেচতে নতুন বছর
পত্র ঝরণের কাল শেষ। কচি পাতা জেগেছে সোনামুখীর শালবনে। শুকনো পাতার স্তুপে আগুন লাগিয়ে জীর্ণ পুরাতন সব ত্যাগ করে নতুন পাতায় সেজে উঠছে শালবন। এখন বনাঞ্চল ফাঁকা ফাঁকা। বহুদূর পযর্ন্ত দেখা যায়। অপারেশন গ্রিন হান্ট এই সময়ে হয়েছিল। বনে কারো লুকিয়ে থাকার উপায় নেই। এই সময়ে আদিবাসীরা শিকারে যায়। অবশ্য শিকারের আছেই বা কী? মেঠো খরগোস, শজারু…এই সব। শীতকাল চলে গেছে। বসন্তও যায় যায়। চৈত্রের দুপুরে ডাক উঠেছে, ও বাবা, ভোলানাথের চরণেই সেবা লাগি, মোয়াদেব! আরে যে লোকগুলোকে আমরা সবদিন দেখি এমনি এমনি। মধুদা রিকশা চালায়, সাধনদার চাল ব্যবসা, গোরাদা ফুটবল খেলে ভালো, তারাই সব বদলে গেছে, পালটে গেছে। গাজনের সন্ন্যাসী হয়েছে। এদের সঙ্গে জুটেছে লালু কাওরা। কাহার। সে খেতে পায় না এমনিতেই। সড়কি নিয়ে কচ্ছপ খুঁজে বেড়ায়। ঘরামির কাজ করে, মাটি কোপায়। কিন্তু তাতে সংসার চলে না। পেটপুরে খাওয়াও হয় না। এই এক মাস গেরুয়া ধরে সন্ন্যাসী হয়ে তার ভাত জোটে, ফলমূল জোটে। গাজনের সন্ন্যাসীদের দিতে কার্পণ্য করে না গেরস্ত। কিন্তু তা গাঁয়ে। আমাদের সেই ছেলেবেলায়। অবাক হয়ে দেখতাম এই কদিন আগে যে লোকটি তাস পেটাচ্ছিল বাজারে বকুল গাছের গোড়ায়, বাঁধানো চাতালে, সে গেরুয়া ধরে মহাদেবের চরণে সেবা লাগি বলে বেড়াচ্ছে। মধুদা রিকশাওয়ালা কিন্তু গেরুয়া পরেই সওয়ারি নিয়ে চলেছে আমতলা থেকে নলকোঁড়া। মাঝে মাঝে হাঁক মারছে’ ‘মোয়াদেবের সেবা লাগি…’। চৈত্র শেষে গাজন। সে এক মস্ত হৈ হৈ। বান ফোঁড়া, খেজুর গাছ মোড়া, উপর থেকে ঝাঁপ, সে কত কী! শিব মন্দিরে এয়োতির লাইন। মহাদেবের মাথায় দুধ ঢালতে কে আর আসেনি। যার স্বামী একটা বিধবা মেয়েছেলের জন্য হাটখোলা থেকে আর বাড়িই ফেরে না সব দিন, সেও এসেছে শিবের লিঙ্গমূর্তিতে দুধ ঢালতে। লোকটা যে সব টাকা সেই বিধবার কাছেই ঢেলে দিচ্ছে, হে মহাদেব, নতুন বছরে কী হবে? সব মনে পড়ে যায় সকাল বেলায় ড্যাডাং ড্যাডাং কাঁসর বাজিয়ে সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসিনীদের ফ্ল্যাটের দুয়ারে এসে দাঁড়াতে দেখে। হাতে সরা। তার ভিতরে একটি জবা ফুল। সন্ন্যাসীর হাতে শিবলিঙ্গের ছবি, দিতে হবে কিছু। মেলে না। মনে পড়ে যায় লিঙ্গ বর্ধক জাপানি যন্ত্রের কথা। বিধবার পায়ে হাটখোলার গণেশদা সব দিয়ে দিল জাপানি তেল মেখে। বসন্ত কাল যে। সব্বোনেশে চৈত। সবটা ঘেটে দিয়ে যাচ্ছে এই সব চিনে জাপানি কোম্পানি। আমাদের ভোলানাথের আর মান থাকল না গো। হ্যাঁ, চৈত্র বড় সবর্নেশে। দুপুরভর এপাশ ওপাশ করে এবাড়ির সে আর ওবাড়ির ও। দুপুর আগুন হয়েছে। গা হাত পা আগুন হয়েছে। মনও। অনুরোধের আসর তো উঠে গেছে। মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে… কেউ বলে ফাল্গুন কেউ বলে কুসুমের মাস…।
সব আমাদের সেই বাল্যকালের কথা। এই কালে সেই রামও নেই, রাবনও নেই। কিন্তু সীতাহরণ আছে। টেলিভিশন দেখে স্বামীর ঘর থেকে ফিরে আসা তপুদির কি আর সেই কল্পনার দুয়ার খুলতে পারে? সেই সময়ে তা হতো। রেডিওর এরিয়ালের তারে কাকেদের সভা বসত বেলা পড়ে এলে। এ বাড়ির কুমু, সারা দুপুর আগানে বাগানে ঘুরে বেড়ায়, সাপের শঙ্খ লাগা দেখেছে সে চৈত্রের ঘোর রৌদ্রের ভিতর আরো অনেকের সঙ্গে। কচি আমের খোসা ঝিনুকে ছাড়িয়ে কুচি কুচি করে লঙ্কা আর নুনে জারিয়ে খেতে খেতে তপুদি কুমুর কাছে শোনে সাপের শঙ্খ লাগার কথা। ইস, তাকে ডাকেনি কেন কুমু। নতুন বস্ত্র ফেলে দিত। তার উপরে উঠে যেত যদি সাপ সাপিনী, সেই কাপড় নিয়ে সব কাজে জয় হয়। তপুদির স্বামী পারবে, পারবে। পুরুষ মানুষ পারবে না কেন? সাপের শঙ্খ লাগা কাপড় পেতে শোবে তারা।
