বর্ষা বলল, কী হয়েছে বাবা? এমন করে তাকিয়ে আছ কেন?
তোমাকে দেখছি।
আমাকে আবার দেখার কী হল?
আগে নাস্তা খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে তুমিও সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জিজ্ঞেস করতে, আমি নাস্তা খেয়েছি কি না!
বর্ষা কথা বলল না।
মেয়ের মাথায় হাত দিলেন হাদি সাহেব। যে চলে গেছে শুধু তার জন্যই তোমার মায়া? আমাদের জন্য মায়া নেই?
দুহাতে বাবার হাতটা ধরল বর্ষা। এমন করে বলো না বাবা, এমন করে বলো না। আমার কষ্টটা আরও বাড়ে। আর এই যে তুমি আমাকে তুমি তুমি করে বলছ, শুনে আমি যে কষ্ট পাচ্ছি তুমি তা বুঝতে পার?
পারি।
তোমার মুখে তুমি শুনলে নিজেকে খুব দূরের মনে হয়।
হাদি সাহেব ধরা গলায় বললেন, মৃত্যু আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে বাদলকে, আর বেঁচে থেকে তুই নিজে নিজে অনেক দূরে চলে গেছিস।
বর্ষা কাতর গলায় বলল, আমি কী করব বাবা? আমার কিছু ভাল লাগে না।
লাগতে হবে। বাদলের শোক তোকে ভুলতে হবে। তুই আগের মতো হয়ে যাবি। হাসবি, আনন্দ করবি। লেখাপড়া করবি, গান করবি। এভাবে জীবন চলে না মা। প্রত্যেক মানুষকেই একদিন মরতে হবে। একথা জেনেও আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকাই মানুষের ধর্ম।
আমিও চেষ্টা করি বাবা। ভেতরে ভেতরে খুব চেষ্টা করি আগের মতো হতে। পারি না, কিছুতেই পারি না।
চেষ্টা করলে হয় না এমন কাজ মানুষের অভিধানে নেই। তুই আরও চেষ্টা কর।
বর্ষা তারপর হঠাৎ করেই কেমন শিশু হয়ে গেল। আধো আধো গলায় বলল, বাবা, তুমি আমাকে একটু আদর কর।
আয় মা আয়, আমার কাছে আয়।
বলে দুহাতে মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে ধরলেন হাদি সাহেব। কোত্থেকে যে বুকফাটা এক কান্না এল তার। চোখের জলে গাল মুখ ভেসে গেল যেন নিজের অজান্তে।
.
কাছারি ঘরের বাইরের দিককার দরজা দিয়ে খুবই উচ্ছল ভঙ্গিতে বেরিয়ে এল শুভ। বর্ষা ছিল ওদিকটাতেই। এখানে বেশ বড়সড় একটা বাগান। বাগান ছাড়িয়ে মাঠ। গাছপালা, ফুল আর সবুজ ঘাসে মনোরম হয়ে আছে জায়গাটা। এই পরিবেশে বর্ষাকে খুব অন্যরকম লাগল। বোধহয় এজন্যই শুভ তাকে ডাকল। এই, শোন।
বর্ষা অবাক চোখে শুভর দিকে তাকাল। আমাকে বলছেন?
শুভ সিরিয়াস মুখ করল। না তোমাকে না।
তাহলে?
হাওয়াকে বলেছি।
জ্বি?
হাওয়া মাঠ ফুলের বাগান, এদেরকে বলছি।
সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর হল বর্ষার। ঠাট্টা আমার ভাল লাগে না। কী জন্য ডাকলেন, বলুন।
বর্ষার মুখভঙ্গি এবং কথা বলার ধরনে শুভ একেবারে বিব্রত হয়ে গেল। কোনও কারণ নেই। তুমি সবসময় মনমরা হয়ে আছ, ভাবলাম তোমার সঙ্গে একটু মজা করি, তোমার মনটা ভাল করি। তুমি বিরক্ত হবে এটা আমি বুঝতে পারিনি। তাহলে, তাহলে এভাবে তোমাকে ডাকতাম না। সরি।
শুভ মন খারাপ করে ভেতর বাড়ির দিকে চলে এল।
ঘরে ঢুকে নিজের বিছানায় কিছুক্ষণ বসে রইল তারপর খাটের তলা থেকে ব্যাগটা বের করে জামাকাপড় গুছিয়ে ব্যাগে ভরতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যে নাহিদ এসে ঢুকল এই ঘরে। শুভকে জামাকাপড় গুছাতে দেখে অবাক হল। কী ব্যাপার? হঠাৎ জামাকাপড় গোছাচ্ছিস?
নাহিদের দিকে তাকাল না শুভ। গম্ভীর গলায় বলল, চলে যাব।
কোথায়?
শিলা তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, তোমার পক্ষে এখন সবকিছুই সম্ভব। এই মুহূর্তে তুমি যদি বাড়ি থেকে বেরিয়েও যাও, আর কখনও এই বাড়িতে ফিরে না আস তাও আমি অবাক হব না।
না, তা আমি করব না। ওরকম প্ল্যান থাকলে আরও আগেই চলে যেতে পারতাম। চলে যাওয়া সবচে’ সহজ কাজ।
তা অবশ্য ঠিক।
এজন্যই ওই কাজটা আমি করব না। শুভকে আমার বর হিসেবে তোমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রপার সম্মানটা তাকে দিতে হবে।
কথাটা আমি একটু ঘুরিয়ে বলতে চাই।
মানে?
মানে হচ্ছে তোমার বর হিসেবে শুভর সম্মান টম্মান কোনও ব্যাপার নয়, তুমি তোমার পৈতৃক সম্পত্তির শেয়ার না নিয়ে এখান থেকে যাবে না।
ওসব নিয়ে আমি ভাবছি না।
নিশ্চয় ভাবছ।
আসলেই ভাবছি না। কারণ বাবার প্রপার্টি থেকে আমাকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই। ইচ্ছে করলেই কেউ তা পারবে না।
ইচ্ছে করলে পারবে।
কী করে?
আমি তোমাকে সেটাই বলতে চাই।
বল, শুনি।
তোমার ভাইরা ইচ্ছে করলে প্রপার্টি থেকে সম্পূর্ণই বঞ্চিত করতে পারে তোমাকে। তুমি যে রকম বাড়াবাড়ি করছ, বিরক্ত হয়ে তোমার ভাইরা যদি তাই করে, তখন তুমি কী করবে?
অদ্ভুত এক নির্মোহ চোখে শিলার চোখের দিকে তাকাল সেতু। শান্ত গলায় বলল, আমি কোনও প্রপার্টি চাই না। কিছু চাই না আমি। আমি শুধু শুভকে চাই।
সেতুর কথা শুনে অবাক হয়ে গেল শিলা।
.
চায়ের কাপ হাতে মামুন সাহেবের রুমের দিকে যাচ্ছে আলী, হঠাই সামনে পড়ল লালু দিলু। আচমকা এই দুজনকে দেখে আলী কেমন ভড়কে গেল। তার ভড়কানো ভাবটা খেয়াল করল না লালু। গম্ভীর গলায় বলল, নাম কী?
আলী থতমত খেল। কার নাম?
তোর।
আমার? আমার নাম আলী আজম।
এই নাম রাখতে তোকে কে বলেছে?
জ্বি?
লালু একটু গলা চড়াল। এই নাম রাখতে তোকে কে বলেছে?
নামটা আমার বাবা রেখেছে।
যেই রাখুক, আজমের কোনও দরকার নাই। শুধু আলী। ঠিক আছে?
জ্বি।
তাহলে দুটো ঠাণ্ডা আর দুপ্যাকেট বেনসন নিয়ে আয়।
স্যার না বললে তো আনতে পারি না।
সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠল লালু, তর স্যারের খেতাপুরি। যা নিয়া আয়।
লালু দিলু আর ফিরে তাকাল না, স্বপনের রুমে ঢুকল। ঢুকে চেয়ার টেনে স্বপনের মুখোমুখি বসল।
