তোর হয়েছে?
হ্যাঁ। তবে অন্য একটা কথাও মনে হয়েছে।
কী বলতো!
তোর সঙ্গে আমার এতদিনের বন্ধুত্ব কিন্তু আমি তোদের অর্থনৈতিক অবস্থার কিছুই জানি না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। খালুজান কী করেন রে?
নাহিদ হাসল।
হাসিটা খেয়াল করল না শুভ। বলল, এখানে আসার পর থেকে দেখছি সারাক্ষণই বাড়িতে বসে আছেন। কখনও কখনও কাছারি ঘরে গিয়ে বসছেন, কৃষক ধরনের কিছু লোকজন আসছে। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
এটাই তার পেশা।
মুখ ঘুরিয়ে নাহিদের দিকে তাকাল শুভ। মানে?
আমাদের গ্রামের চারপাশে যত ধানের জমি আছে সেগুলোর বেশির ভাগই আমাদের। যারা বাবার কাছে আসে তারা ওইসব জমি চাষ করে।
তার মানে বিশাল অবস্থা তোদের! তোরা হচ্ছিস এই এলাকার জমিদার!
ন তেমন বিশাল আর কই!
বিনয়ের দরকার নেই।
বিনয় করছি না। আমার বাবা হচ্ছেন অত্যন্ত নরম হৃদয়ের, দয়ালু ধরনের মানুষ। একটু কঠিন হলে অবস্থা আরও ভাল থাকত আমাদের।
বুঝেছি।
কী বুঝলি বল তো?
কৃষকরা এসে কেঁদেকেটে পড়লে অনেক কিছুই মাফ করে দেন তিনি।
রাইট।
এই ধরনের মানুষদের আমার খুব ভাল লাগে। অবশ্য তোরা সবাই বেশ নরম ধরনের। খালাম্মা খালুজান, তুই বর্ষা।
নাহিদ চুপ করে রইল।
যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন সুরে শুভ বলল, আচ্ছা শোন, এই পারু মেয়েটা কে রে? দেখে তো বাড়ির কাজের মেয়ে মনে হয় না!
আলতো করে চশমা খুলল নাহিদ। কাজের মেয়ে সে নয়।
তাহলে?
আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। বাড়ির অবস্থা ভাল না, এজন্য আমাদের এখানে থাকে। বাবা ওর জন্য পাত্র দেখছেন। আমরাই বিয়ে দিয়ে দেব।
একথার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে কেমন বদলে ফেলল শুভ। আর এই যে তোর হতভাগা বন্ধুটা বিয়ে করে ফেরার হয়ে আছে তার কী করবি?
নাহিদ হাসল। কী করতে হবে?
ণা না হাসি নয়, হাসি নয়। ওপরে ওপরে যত হাসি আনন্দেই থাকি, মনটা কিন্তু আমার ভাল না বন্ধু।
তা জানি।
পুরোটা মনে হয় জানো না। আমার কিন্তু সারাক্ষণই সেতুর কথা মনে হয়।
একটু উদাস হল শুভ। জানালার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলল, সেতু কী করছে, কেমন আছে কিছুই জানি না। ও জানে না আমার কথা। আমি যে তোদের এখানে চলে এসেছি…।
শুভর কাঁধে হাত দিল নাহিদ। এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই। কয়েকদিন পর আমি ঢাকায় যাব, যেমন করে পারি সব খবর নিয়ে আসব।
কীভাবে নিবি?
দেখা যাক।
একটা সোর্স ছিল দোলন, কিন্তু ওর তো সেতুদের বাড়িতে যাওয়া নিষেধ!
এতকিছু তুই এখন ভাবিস না। যতদিন এখানে থাকবি, আনন্দে থাক। সেতু খুবই সিরিয়াস টাইপের মেয়ে। বিয়ে যখন একবার হয়ে গেছে, দুদিন আগে পরে সব ঠিক হবেই।
শুভ আর কথা বলল না। আনমনা হয়ে রইল।
.
মিনু বললেন, পারুর বিয়ের ব্যাপারে আর চেষ্টা করছ না?
হাদি সাহেব মাত্র শুতে যাবেন, স্ত্রীর কথা শুনে থমকালেন। কখন করব? বাদলকে নিয়ে এতবড় একটা ধকল গেল, ছেলেটা মারা যাওয়ার পর এখন যাচ্ছে বর্ষাকে নিয়ে। ছেলেমেয়ে নিয়ে টেনশান থাকলে অন্যকোনও দিকে মন দেয়া যায়?
স্বামীর পাশে বসলেন মিনু। বর্ষা এখন একটু স্বাভাবিক হয়েছে। এখন চেষ্টা করো।
পিঠের তলায় দুটো বালিশ দিয়ে আধশোয়া হলেন হাদি সাহেব। কোথায় স্বাভাবিক হয়েছে? আমি তো ওর কোনও চেঞ্জ দেখছি না! বাদলের কবরের সামনে যাচ্ছে, কাঁদছে, চুপচাপ বসে থাকছে।
হয়তো আরও কিছুদিন এরকম থাকবে, তারপর ঠিক হয়ে যাবে।
হাদি সাহেব কীরকম আনমনা হলেন। বর্ষাও দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল!
চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকালেন মিনু। হঠাৎ একথা বললে যে!
মনে হল।
তুমি কি ওর বিয়ের কথা ভাবছ?
ভাবা উচিত না?
আগে পারুর বিয়েটা দাও, তারপর দেখা যাবে। বিএ পাসটা করুক বর্ষা।
হাদি সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তা কী আর হবে!
কেন হবে না?
মনে যে রকম আঘাত পেয়েছে, এই আঘাত কাটিয়ে পড়াশুনো চালানো খুব কঠিন। তারচে’ বিয়ে দিয়ে দিলে অবস্থাটা চেঞ্জ হতে পারে।
না, এখন এসব ভেব না।
কেন ভাবব না?
মাত্র কিছুদিন হল যে মেয়ের যমজ ভাই মারা গেছে সেই মেয়ের এখন বিয়ে হতে পারে না।
তা আমিও বুঝি। বর্ষার কথা ভেবেই বিয়ের চিন্তাটা আমার মাথায় এসেছিল।
কথা বলতে বলতে গলা ধরে এল হাদি সাহেবের। চোখ ভরে এল জলে। স্ত্রীর কাছ থেকে চোখের জল লুকোবার জন্য অন্যদিকে মুখ ফেরালেন তিনি। মেয়েটির জন্য আমি খুব কষ্ট পাই। আমি চাই ও আবার আগের মতো হোক। হাসি আনন্দে ভরিয়ে রাখুক বাড়ি। এটা চাক আমার কাছে, ওটা চাক। গলা ছেড়ে গান করুক, ছুটোছুটি করুক।
মায়াবি হাতে স্বামীর একটা কাঁধ ধরলেন মিনু। তুমি মন খারাপ করো না। আমি বলছি, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ওকে ভাল করে বোঝাও। তুমি যা যা চাও জোর দিয়ে বল ওকে। আমার মনে হয় তাতে বেশ কাজ হবে।
স্ত্রীর কথা মনে রেখেই বুঝি পরদিন সকালে মেয়ের ঘরে এসে ঢুকলেন হাদি সাহেব।
বর্ষার ঘুম ভেঙেছে অনেক সকালে।
ঘুম ভাঙার পর মাথার কাছের জানালা খুলে দিয়েছে সে। বিছানায় বসে এখন ফাঁকা শূন্য দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাবার পায়ের শব্দে চোখ তুলে তাকাল।
হাদি সাহেব বললেন, নাস্তা খেয়েছ মা?
বর্ষা শান্ত গলায় বলল, খেয়েছি।
কথাটা শুনে হাদি সাহেব আনমনা হয়ে গেলেন। পাশে বসে অপলক চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
