ও কামের আছে। তুমি বাইত্তে আহনের লগে লগে রান্দনঘরে গিয়া হানছে। আমার কিছু কওন লাগে নাই, রান বাড়ন শেষ।
ডিম ভেঙে ভাতে মিশিয়ে বেশ পরিপাটি করে একটা লোকমা মুখে দিল এনামুল। মুখভর্তি ভাত, সেই অবস্থায়ই বলল, রান বাড়ন খুব ভাল শিখছে রাবি। আমগো বাড়ির মতন।
দেলোয়ারা বললেন, আগে এমুন রানতে পারতো না। আমি হিগাইছি। আগের রান্দন আছিলো চউরাগো রান। মুখে দেওন যাইতো না।
পারভীনের রান্দনও আগে মুখে দেওন যাইতো না।
ঐডা বউর দোষ না। বিয়ার আগে কোনওদিন রানছেনি? পারবো কেমতে।
অহন খুব ভাল রানে। মার কাছে শিখছে।
বুজির শইলডা কেমুন? ভাল আছে?
হ অহন ভালই। কয়দিন আগে বি চদরীরে (বদরুদ্দোজা চৌধুরী) দেহাইছি। এত বড় ডাক্তার চদরী সাবে, মারে দেইক্কা কইলো আরে কিছু হয় নাই আপনের। একদোম ভাল আছেন। সংসারের কাম কাইজ যত পারেন করবেন আর সকালে বিকালে যতক্ষণ পারেন হাটবেন। দুইডা না তিনডা অষইদ দিল। তার কথা মতন চলতাছে দেইক্কা মায় অহন একদোম ভাল। আপনে ইবার ঢাকা গেলে আপনেরেও দেহাইয়া আনুম।
দেলোয়ারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হ দেহান ইট্টু লাগবো। বুকের মইদ্যে আইজ কাইল জানি কেমুন করে!
খাওয়া শেষ করে ঢক ঢক করে একগ্লাস পানি খেল এনামুল। দেখে হা হা করে উঠলেন দেলোয়ারা। দুদভাত খাইবা না?
না।
ক্যা?
খাজুরা মিডাই না অইলে দুদ ভাত খাওন যায় না।
খাজুরা মিডাই তো আছে। ঐ রাবি কারে (ঘরের চালার কাছাকাছি পাটাতন করা, কাঠের দোতলার উপরতলার মতো। দরকারি জিনিসপত্র রাখার জায়গা। কোথাও কোথাও আপারও বলে) ওট। মুড়ির জেরে দেক খাজুরা মিডাই আছে। লইয়ায়।
বাদলাকে কোল থেকে নামাল রাবি। বেতের ছোট্ট একখান সাজি (পাত্র) হাতে সিঁড়ি ভেঙে তরতর করে কারে উঠে গেল। একদলা গুড় নিয়ে নেমে এল। গুড়ের দলায় মুড়ি লেগে আছে দেখে দেলোয়ারা বললেন, কী লো রাবি, মিডাই গইল্লা গেছেনি?
রাবি বলল, হ। মুড়িডি ওদাইয়া (নরম হয়ে যাওয়া) গেছে। আরবচ্ছর যে মুড়ির জেরে মিডাই রাকলেন, মুড়িডি তো আর বদলান নাই।
হায় হায় মুড়ি বদলানের কথা তো আমার মনে আছিলো না।
এনামুল বলল, মিডাই গইল্লা গেছে কী অইছে। ঐ রাবি অন্য একখান পেলেট দে। এই পেলেটে তরকারি লাইগ্না রইছে, এই পেলেটে দুদভাত খাওন যাইবো না।
চটপটা হাতে অন্য একখান প্লেট দিল রাবি। একবার সেই প্লেটের দিকে তাকিয়ে আগের প্লেটটায় যত্ন করে হাত ধুয়ে ফেলল এনামুল। তারপর নতুন প্লেটে সামান্য ভাত নিল, বাটির দুধ অর্ধেকটা ঢালল, প্লেটের সামনে রাখা গুড়ের সাজি থেকে এক খামছা থকথকা গুড় নিল, নিয়ে নতুন করে খাওয়া শুরু করল।
এনামুলের দিকে তাকিয়ে একটু নড়েচড়ে বসলেন দেলোয়ারা। আবার চোখ থেকে চশমা খুললেন, শাড়ির আঁচলে কাঁচ মুছতে মুছতে বললেন, ইবার কী তুমি দুই একদিন থাকবা বাজান?
দুধভাত খেতে খেতে এনামুল বলল, হ থাকুম। কয়দিন আজাইর (বেকার) আছি।
ক্যা কনটেকদারি কাম নাই তোমার? কাপড়ের ব্যবসা চলতাছে না?
চলতাছে, বেবাকঐ চলতাছে।
তয়?
তয় আগের থিকা ইট্টু কম চলতাছে। এর লেইগাঐ বাইত্তে আইলাম। মান্নান মাওলানা সাবে আমারে একখান পত্ৰ দিছিলো। তার বলে কী কথার কাম আছে আমার লগে!
হ আমারেও কইছিল তুমি বাইত্তে আইলে য্যান তারে খবর দেই।
দুধ ভাতের লগে এক কামড় গুড় মুখে দিয়ে এনামুল বলল, পত্রে মাওলানা সাবে আমারে লেকছিল আমার যুদি টাইম না থাকে তাইলে হেয়ঐ ঢাকা গিয়া আমার লগে দেহা করবো। আমার কাছে এমুন কী কাম পড়লো মাওলানা সাবের? আপনে কিছু জানেননি আম্মা?
চশমাটা চোখে পরে দেলোয়ারা বললেন, পুরা জানি না। তয় তার লগে একদিন কথা অইছিলো, কথা হুইন্না বোজলাম তোমারে দিয়া গেরামে একখান মজজিদ করাইতে চায়।
একথা শুনে খাওয়ার কথা যেন ভুলে গেল এনামুল। দেলোয়ারার মুখের দিকে তাকাল। মজজিদ করাইতে চায়? কোনহানে?
আমগ ছাড়া বাইত্তে।
কন কী?
দেলোয়ারা হাসলেন। হ আমার কাছে তো কইলো!
খানিক আনমনা হয়ে কী ভাবল এনামুল তারপর রাবির দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ রাবি, আতাহারগ বাইত্তে যা তো। মাওলানা সাবরে ডাইক্কা লইয়ায়। আমার কথা কবি।
.
১.৫২
কোলাপাড়া বাজারের কাছাকাছি রিকশা থামাল রুস্তম। থামিয়ে লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামল। তছির দিকে তাকিয়ে অস্থির গলায় বলল, তুমি ইট্টু বহো। আমি খালি যামু আর আমু।
ঘোমটায় মুখ মাথা ঢেকে এখনও আগের মতোই বসে আছে তছি। কী রকম একটা ঘোরের মধ্যে যেন ছিল। রুস্তমের কথা শুনে ছটফট করে উঠল। দাঁতে কামড়ে রেখেছিল শাড়ির আঁচল, ছেড়ে দিয়ে বলল, কই আইলাম
আগের মতোই অস্থির গলায় রুস্তম বলল, কোলাপাড়া আইছি। এইডা কোলাপাড়া বাজার।
উঁকি মেরে বাজারের দিকটা দেখল তছি,। এত তাড়াতাড়ি কোলাপাড়া আইয়া পড়লাম? ও রিশকাআলা ভাই, রিশকা তো আপনের উড়াজাহাজের লাহান। চোক্কের নিমিষে মেদিনমোণ্ডল থন কোলাপাড়া আইয়া পড়লাম।
হ আমার রিশকা উড়াজাহাজঐ। তয় তুমি বহে আমি মুরলিভাজা কিন্না আনি।
আমিও আপনের লগে যামু।
ক্যা?
এইমিহি কোনওদিন আহিনাই। কোলাপাড়া গেরামডা কেমুন, বাজারডা কেমুন ইট্টু দেহি। ও রিশকাআলা ভাই, কাঁচারুগো (তামা পেতল কাঁচের জিনিসপত্র এবং এলুমিনিয়ামের ব্যবসা করেন যারা) বাড়ি কোনডি কন তো? কোলাপাড়ায় বলে বহুত কাঁচারু বাড়ি।
