পালঙ্কের মাঝামাঝি জায়গায় একখান ছপ (মাদুর) বিছানো হয়েছে। সেই ছপে আসাম (আসনপিঁড়ি) করে বসে ভাত খাচ্ছে এনামুল। তার পরনে এখন আকাশি রঙের চেক লুঙ্গি আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। গলায় মোটা সোনার চেন আছে। চেনের মাথায় সিকির মতো একখান লকেট। মাথা ঝুঁকিয়ে ভাতের লোকমা যখন মুখে তুলছে এনামুল, গলার চেন আর লকেট এসে পড়ছে পাতের ওপর। এক ফাঁকে চেনটা স্যান্ডো গেঞ্জির বুকের কাছে ঢুকিয়ে দিল এনামুল, দেলোয়ারার দিকে তাকাল। মুখভর্তি ভাত চাবাতে চাবাতে জড়ান গলায় বলল, সমবাত দিয়া সব সময় আহন যায়নি? আথকা আইয়া পড়নঐ ভাল।
চশমা মোছা শেষ করে চোখে পরলেন দেলোয়ারা। নিজেগ বাইত্তে সমবাত না দিয়া আইলেও অয়। তয় অসুবিদা খালি একখানঐ, খাওন দাওনের। আগে সমবাত পাইলে বাজার হাট করাইয়া রাখন যায়। দেহো তো কী দিয়া কী খাইতাছে আইজ!
এনামুল আরেক লোমা ভাত মুখে দিল। ভালঐ তো খাইতাছি। এত বড় বড় দুইডা কইমাছ, দুইডা হাসের আন্ডা, ডাইল দুদ, খারাপ কী!
এনামুলের সামনে সাজিয়ে রাখা ভাতের গামলা, তরকারির বাটি, ডাল আর দুধের বাটির দিকে একবার তাকালেন দেলোয়ারা। বললেন, আগে জানলে মাওয়ার বাজার থিকা বড় একখান ইলশা মাছ আনাইতাম। এক দেশসের দুদ আনাইতাম।
ইলশা মাছের থিকা কইমাছ অনেক ভাল। শীতকাইল্লা কই খাইতে খুব স্বাদ। এই দিনে বুকটা লাল টকটইক্কা অইয়া যায় কইমাছের। শইলভর্তি তেল। আর জোয়াইরা দিনের কই অইলো খারাপ। মুখে দেওন যায় না। পেটভর্তি আন্ডা। শইলডা যায় লাম্বা হইয়া, মাথাডা যায় বড় অইয়া, খাইতে লাগে টাকি মাছের লাহান।
একটা কই খাওয়া শেষ করেছে এনামুল। এখন বাটি উপুড় করে বাকি কইটাও নিল। প্রচুর তেল মশলা দিয়ে, প্রচুর পিয়াজ দিয়ে ভুনা করা হয়েছে কই। মাছটা পাতে নেওয়ার পর বাটির গায়ে লেগে থাকা ঝোল আঙুল দিয়ে কেচে প্লেটে নিল এনামুল। ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় রান্না খুবই পছন্দ হয়েছে তার, আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। যদিও প্রায় সব খাবারই সমান আগ্রহ নিয়েই খায় এনামুল। ছেলেবেলা থেকেই সে একটু পেটুক স্বভাবের। তবু আজকের এই খাবারের প্রতি তার এতটা আগ্রহ দেখে দেলোয়ারা খুশি হলেন। সরল গলায় বললেন, রান কেমুন অইছে?
আপনে রানছেন আম্মা?
না বাবা আমি রান্দি নাই। রানছে রাবি। আল্লায় বাচাইছে যে ছেমড়িডা আইজ বাড়া বানতে (ধানভানা। ঢেঁকি সংক্রান্ত কাজ) যায় নাই। গেলে আমি ঝামেলায় পড়তাম।
কই মাছটা এত বড়, এনামুলের প্লেট ভরে গেছে। ভাতও আছে বেশ খানিকটা, তবে ভাতের দিকে মন নাই তার। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কই মাছের পেটের দিকটা ভাঙছে আর মুখে দিচ্ছে। দেলোয়ারার দিকে তাকাচ্ছেও না, কথা টুকটাক বলছে। এখনও বলল। কী ঝামেলায় পড়তেন।
রান্দন বাড়নের কী করতাম?
ক্যা আপনের রান্দন রান্দেন নাই।
হেইডা তো রানছি। ঐ রান তুমি মুখে দিতে পারতা না। এক পোয়া চাউলের ভাত রান্দি আর ইট্টু ডাইল, ইট্টু দুদ। ঐ এক রানে দুফইরা খাওনও অয় রাইতের খাওনও অয়।
কিছু না থাকলে ঐডাঐ খাইতাম নে।
তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় এনামুল বলল, ও আম্মা, এতবড় কই পাইলেন কই?
দেলোয়ারা হাসলেন। কইডি আমার না।
তয়?
রাবিগো।
অরা পাইলো কই?
বাদলকে কোলে নিয়ে রাবি দাঁড়িয়ে আছে পুব দিককার দুয়ারের সামনে। সেখান থেকে বলল, বাদলার বাপে ধরছেলো।
চোখ তুলে রাবির দিকে তাকাল এনামুল। কই থিকা?
বিলেরবাড়ির পুকর থিকা। বিলে কামলা দিতে গেছিলো, ফিরনের সমায় আইত্তাইয়া (হাতিয়ে) ধইরা আনছে।
হ বিলেরবাড়ির পুকঐরের কই বহুত বড় অয়।
বাদলা বলল, তিনডা ধরছিলো। একটা আমি খাইয়া হালাইছি।
বলেই হি হি করে হাসল। হাসিটা বেশ মজা লাগল এনামুলের। খেতে খেতে বাদলাকে সে বলল, কীরে ছেমড়া, মার কুলে উইট্টা রইছস ক্যা?
বাদলা কথা বলবার আগেই দেলোয়ারা বললেন, ছেমড়াডা এমনই। বেশি আল্লাইন্দা। মায় যহন বাড়া বানতে যায় তহন দেহগা (দেখ গিয়া) টই টই কইরা ঘোরতাছে। এক্কেরে ডাঙ্গর পোলাপানের লাহান। মায় বাইত্তে আইলো আর নান্নাবাচ্চা অইয়া গেল। কুলে উইঠা বইয়া থাকে।
রাবি হাসিমুখে বলল, না বুজি সব সমায় কুলে ওড়ে না। মানুষজন দেকলে ওডে। অহন উটছে মামারে দেইক্কা।
এনামুল আনমনা গলায় বলল, মামাডা আবার কেডা?
রাবি লাজুক গলায় বলল, ক্যা আপনে? আপনেরে আমি মামা কই জানেন না! আপনের মা খালারে যদি বুজি কই, আপনে তো তাইলে মামা!
বাদলা বলল, আর আমার অইলেন দাদা।
চোখ পাকিয়ে, কপট রাগে বাদলার দিকে তাকাল এনামুল। তোমার আর দাদা কওনের কাম নাই। কুল থিকা নামো।
দেলোয়ারা বললেন, হ ও আর নামছে। কতুক্ষণ পর দেইক্কোনে মার বুকের দুদ খাইতাছে।
একথা শুনে এনামুল মজা পেল, রাবি পেল লজ্জা। মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। মুখে লাজুক হাসি।
এসব কথার ফাঁকে ফাঁকে কই মাছটা খেয়ে শেষ করেছে এনামুল ভাত শেষ করেনি। কইয়ের কাটা একপাশে রেখে আঙুলের ডগায় ভাত নাড়াচাড়া করতাছে। দেলোয়ারা বললেন, আভা দুইডা খাও বাজান।
এনামুল ডিমের বাটির দিকে তাকাল। দুইডা খাইতে পারুম না আম্মা। একটা খাই।
খাও।
এনামুল একটা ডিম নিল। ডিমও রাবি রানছে?
হ। বেবাক রান্দনঐ রাবির।
এত তাড়াতাড়ি রানলো কেমতে?
