তছির কথায় রুস্তম একটু বিরক্ত হল তবে বিরক্তিটা প্রকাশ করল না। তছিকে বুঝতেও দিল না কিছু। ভিতরের অস্থিরতা ভিতরে চেপে হাসিমুখে নরম গলায় বলল, কাঁচাৰুগো বাড়ি তোমারে যাওনের সমায় দেহামুনে। কোলাপাড়া গেরামে কাঁচাৰুগো বাড়ি ছাড়া দেহনের কিছু নাই। আগে কইলে আহনের সমায়ঐ দেহাইতাম। খালপাড়ের লগে অনেক কাঁচাৰু বাড়ি আছে। পাডাতন করা ঘর, দোতালা ঘর। নতুন ঢেউটিনের বেডা ঝকঝক করে। কোনও কোনও ঘরের টিনে রঙ লাগাইন্না, জানলা কপাটে রঙ লাগাইন্না। যাওনের সমায় দেহামুনে।
তছি বাধুক শিশুর মতো বলল, আইচ্ছা দেহাইয়েন। তয় অহন খালি বাজার দেহান।
বাজার দেইক্কা কী করবা, আর বাজারে যাওন তোমার ঠিকও অইবো না।
ক্যা?
তোমগো গেরামের কোনও মাইনষে যুদি তোমারে এহেনে দেইক্কা হালায়?
কেমতে দেখবো? আমগো গেরামের কোনও মানুষ এই বাজারে আহে না। মাওয়ার বাজারে যায়, নাইলে যায় কাজির পাগলা বাজারে।
এই বাজারেও আহে। আমি দেকছি।
দেকতে পারেন। কেঐ মরলে কাফোনের কাপোড় কিনতে আহে। ছনু মামানি যেদিন মরলো হেদিন মেন্দাবাড়ির মোতালেইব্বা আইছিলো। আইজ তো আমগ গেরামের কেঐ মরে নাই। কেডা আইবো?
তছির কথা শুনে রুস্তম একটা ফাপরের মধ্যে পড়ে গেল। ভিতরে আগের অস্থিরতাটা আছেই। সে চাইছে একরকম, হতে যাচ্ছে অন্যরকম। এত কিছুর পরও যদি পরিকল্পনা মতো কাজ না হয় তাহলে কী লাভ হল এসব করে! তার লগে যদি বাজারে যায় তছি, তছির পরিচিত না হোক রুস্তমের পরিচিত কেউ না কেউ দেখবেই! কথা কিছু না কিছু উঠবেই। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, কী রে রোসতইমা, লগে কেডা? কী জবাব দিবে রুস্তম! স্বভাব চরিত্রের কথা রুস্তমের এদিককার অনেকেই জানে। ভারি একটা প্যাঁচঘোচের মধ্যে রুস্তম পড়ে যাবে।
না তছিকে নিয়ে বাজারে সে কিছুতেই যাবে না।
হঠাৎ করে নিজেকে তারপর বদলে ফেলল রুস্তম। গভীর চিন্তার একখান ছায়া মুখে ফেলে বলল, আসলে এই হগল কোনও কামের কথা না। রিশকায় থিকা নামতে তোমারে ক্যান দিতাছি না, ক্যান বাজারে নিতে চাইতাছি না তার অন্য একধান কারণ আছে।
তছি উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কী কারণ?
আমগ এইমিহি রিশকা চোর খুব বাইড়া গেছে।
কন কী?
হ। চোরডি খালি তালে থাকে কুনসুম কোন রিশকাআলা রিশকা রাইক্কা চোক্কের আঐল (আড়াল) অইলো। লগে লগে সিডে বইয়া রিশকা চালাইয়া দেয়। মাইনষে তো মনে করে যার রিশকা হেয়ঐ চালাইয়া যাইতাছে। কিছু কয় না। রিশকা যার চুরি অয় মাথায় বাড়ি পড়ে তার। পাছ ছয় হাজার টেকা দাম এহেকখান রিশকার। পুরা টেকাডা গলায় পাড়া দিয়া উসিল কইরা লয় মাহাজনে। এর লেইগা রিশকা থুইয়া কোনওহানে যাই না আমি।
যেন ব্যাপারটা খুবই ভাল ভাবে বুঝেছে তছি এমন গলায় বলল, ভাল করেন। রিশকা থুইয়া যাইবেন ক্যা?
এইত্তো বুজছো। তয় বহে, আমি মুরলিভাজা লইয়াহি।
তছি কাতর গলায় বলল, আমি যামু না?
শুনে হেসে ফেলল রুস্তম। অইছে কাম। আমি কই কী আর আমার সারিন্দায় (সারেঙ্গি) কয় কী! আরে রিশকা চুরি অওনের ডর আছে দেইক্কাইত্তো তোমারে বহাইয়া থুইয়া যাইতাছি। তুমি বইয়া রিশকাড়া পাহারা দেও, আমি আইতাছি।
এবার তছিও হাসল। বুজছি। যান আপনে। তয় তাড়াতাড়ি আইয়েন।
আইচ্ছা।
রুস্তম পা বাড়িয়েছে, তছি বলল, মুরলিডি দেইক্কা আইনেন। ওদাইন্না (ন্যাতানো) মুরলি আইনে না।
রুস্তম আবার বলল, আইচ্ছা।
.
১.৫৩
ছাই রঙের খাদায় ভাতের ফ্যান আর তরিতরকারির ছালবাকল নিয়ে মান্নান মাওলানার সীমানায় এসেছে ফিরোজা। গোয়াল ঘরের লগে মাটির ভিটির ওপর বসান জাবনা দেওয়ার গামলায় জিনিসগুলি ফেলে ফিরে যাবে, মান্নান মাওলানা তাকে দেখে ফেললো। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে মুখে একখান পান পুরেছেন তিনি। ছিলেন বড়ঘরের দুয়ারের সামনে, ফিরোজাকে দেখে পান চাবাতে চাবাতে গোয়ালঘরের দিকে এলেন। গরুর জাবর কাটার মত মুখখানা নাড়াতে নাড়াতে বললেন, সমবাত কী লো ফিরি।
খাদা কাত করে জিনিসগুলি মাত্র জাবনার গামলায় ফেলতে যাবে ফিরোজা, হাত থেমে গেল। মান্নান মাওলানাকে দেখলেই বুক ধুগৰুগ ধুগযুগ করতে থাকে, গলা শুকিয়ে আসে, হাত পা আড়ষ্ট হয়ে যায়। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফিরোজা। এখনও তেমন হল। বুকের কাছে খাদা ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে। এক ফাঁকে বুকের আঁচল ভাল করে টেনে দিয়েছে। চোখ এখন মাটির দিকে। ভঙ্গি জড়সড়।
তাকিয়ে তাকিয়ে ফিরোজাকে দেখলেন মান্নান মাওলানা। তারপর বললেন, কথা কচ না ক্যা?
ফিরোজা তবু কোনও কথা বলল না, তবু নড়ল না।
মান্নান মাওলানা বললেন, আইচ্ছা ফ্যানডি হালা।
এবার নড়ল ফিরোজা। তবে মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল না। খাদা কাত করে জিনিসগুলি জাবনার গামলায় ফেলল।
কাজ শেষ করবার পর এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকবার কারণ নাই, যে রকম দ্রুত পায়ে এসেছিল সেইরকম পায়েই ফিরে যাওয়ার কথা ফিরোজার। এখনও কত কাজ বাকি রয়ে গেছে। ঘাটে গিয়ে গোসল করবে, ভিজা কাপড় রোদ দিবে উঠানের তারে, নানীকে খাওয়াবে, নিজে খাবে, তারপর যদি একটু আজার পাওয়া যায়। কিন্তু পা নড়াতে পারছে না ফিরোজা। মান্নান মাওলানা এসে সামনে দাঁড়াবার পর পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। সেই পা টেনে তোলবার শক্তি নাই।
