পাগল মেয়ে একা সীতারামপুর যাবে শুনে চিন্তিত হল তছির মা। বলল, একলা যাওনের কাম নাই।
ক্যা? গেলে কী অয়? আমি কী আইজ নতুন যাইতাছি নি!
তারপরই মুখ খিচালো তছি। তুমি কইলাম এহেন থিকা যাও মা। আমি কইলাম তোমার মতলব বোজতাছি। আমার হাতে টেকা দেইক্কা সরতাছো না তুমি। টেকাড়া নেওনের মতলবে আছো। মইরা গেলেও এই টেকা আমি তোমারে দিমু না। তুমি যাওগা। আমি সীতারামপুর যামু।
তছির মা বুঝে গেল এরপর দাঁড়িয়ে থাকলে ঘটনা খারাপ হবে। মুখে যা আসে তাই বলে বকাবাজি তো তছি করবেই, সড়ক থেকে দৌড়ে নেমে চুলও টেনে ধরতে পারে মায়ের। গুম গুম করে কিল মারতে পারে মায়ের পিঠে। মাটিতে ফেলে গলা টিপে ধরতে পারে, বুকে চেপে বসতে পারে। যদিও তছির হাতের এসব মার খাওয়ার অভ্যাস আছে তার তবু আজ সে মারটা খেতে চাইল না। রিকশাআলা বসে আছে সড়কে, মেয়ে মারছে মাকে এ দৃশ্য দেখে বেকুব হয়ে যাবে। মেয়ে যে পাগল এটা তো সে জানে না! অচেনা মানুষের সামনে তছির হাতে মার খেতে আজ শরম করবে তার।
তছির মা তারপর বাড়ির দিকে পা বাড়াল। মুখ ঝামটা দিয়ে বলে গেল, জাহন্নামে যা মাগি! মর গা।
এসব কথা গায়েই মাখল না তছি। মুঠায় ধরা টাকা শাড়ির আঁচলে গিটটু (গিট) দিয়ে বাঁধল। তারপর গভীর আনন্দে ফেটে পড়া মুখে সড়কের পুব দিককার নামায় নেমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। রিকশাঅলা তাকে ডাকল। এই যে, হোনো হোনো। এইমিহি আহো।
তছি থামল। কীর লেইগা?
হাতের বিড়ি শেষ হয়ে আসছিল। ফুক ফুক করে বিড়িতে শেষ দুইটা টান দিল লোকটা তারপর নিজের বসার সিট থেকে পা নামিয়ে লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামল। তার আগে বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলেছে। তছির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, আহো। কথার কাম আছে।
এবার লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল তছি, রিকশার সামনে এসে দাঁড়াল। তাড়াতাড়ি কন। আমার কাম আছে।
লোকটা হাসল। কী কাম?
তছি বিরক্ত হল। মারে যে কইলাম হোনেন নাই আপনে?
হুনছি। তুমি মুরলিভাজা কিনতে সীতারামপুর যাইবা।
তয়?
ঐডা তোমার মা?
হ।
কোন বাড়ি তোমগো?
হাত তুলে নিজেদের বাড়ি দেখল তছি। ঐ বাড়ি।
তছির হাত অনুসরণ করে বাড়ি দেখল লোকটা। মুখ এখনও হাসি হাসি তার। বলল, তুমি যে কইছিলা রিশকায় চড়বা?
হ কইছিলাম। অহন চড়ুম না।
ক্যা?
আমার কাম আছে।
কাম তো সীতারামপুর যাওন, মুরলিভাজা কিনন।
হ।
সীতারামপুর রিশকা যায় না।
হ যায় না।
সাবধানী চোখে চারদিকে একবার তাকাল লোকটা। গলা নিচু করে বলল, সীতারামপুর তোমার যাওনের কাম নাই। তুমি আমার লগে লও।
কই যামু আপনের লগে?
তছির গলা চড়া। শুনে লোকটা একটু ভড়কাল। সাবধানী চোখে আবার চারদিকে তাকাল। আগের মতোই নিচু গলায় বলল, আস্তে কথা কও।
লগে লগে গলা একেবারেই নিচু করে ফেলল তছি। আইচ্ছা।
আমি কই কী, তুমি আমার লগে কোলাপাড়া বাজারে লও। আমার রিশকায় বহো, তোমারে আমি লইয়া যাই। এককামে দুইকাম অইবনে তোমার। রিশকায় চড়নও অইলো, মুরলিভাজা খাওনও অইলো। কোলাপাড়া বাজারে বহুত ভাল মুরলিভাজা পাওয়া যায়। লাল টুকটুইক্কা। আমি কিন্না দিমুনে তোমারে। তোমার টেকা ভাঙ্গন লাগবো না।
রিকশাআলার কথা শুনে চোখ দুইটা চকচক করে উঠল তছির। সত্যঐ?
হ।
তারপরই মুখে দুশ্চিন্তার একটা ছায়া পড়ল তছির। কোলাপাড়া থিকা আহুম নে কেমতে? আমি তো কোনওদিন ঐমিহি যাই নাই।
রিকশাঅলা বলল, আমি তোমারে রিশকায় কইরা দিয়া যামুনে।
সত্যঐ?
হ।
এবার হাসল তছি। আপনে বহুত ভাল মানুষ রিশকাআলা ভাই। নাম কী আপনের?
রোস্তম।
বাড়ি কোন গেরামে।
উত্তর বাকশা (পাইকসা)।
একটু থেমে রুস্তম বলল, এত প্যাচাইলের কাম নাই। তাড়াতাড়ি লও। তোমারে আবার দিয়া যাওন লাগবো। হারাদিন যাইবো গা নে।
দ্রুত হাতে রিকশার হুড তুলল রুস্তম। অকারণেই দুই তিনটা থাবড় দিল সিটে। কাঁধে ফেলা গামছা শক্ত করে মাজায় বাঁধতে বাঁধতে বলল, ওডো। তাড়াতাড়ি ওডো।
লাফ দিয়া রিকশায় উঠল, তছি। গভীর আনন্দে মুখখানা যেন ফেটে পড়ছে। সেই মুখের দিকে একবার তাকিয়ে রুস্তম বলল, আঁচল দিয়া মুখখানা ঢাইকা লও। এই গেরামের মাইনষে যেন তোমারে দেইক্কা না চিনতে পারে।
তছি অবাক হল। ক্যা?
দেকলে তোমারে যুদি আমার লগে না যাইতে দেয়, তোমার মা ভাইগো যুদি গিয়া কইয়া দেয় তাইলে একখান ভেজাল লাইগো যাইবো। তয় বেশিক্ষুণ মুখ ঢাইক্কা বইয়া থাকন লাগবো না, দোকাছির (দোগাছি) সামনে গিয়া খুইল্লা হালাইলেঐ অইবো। ঐমিহি তোমারে কেঐ চিনবো না।
ভাল কথা কইছেন। গেরামের কেঐ দেকলে আপনের লগে আমারে যাইতে দিব না।
বেশ যত্নে মাথায় ঘোমটা দিল তছি, আঁচল টেনে নাকের ডগা পর্যন্ত ঢাকল, অচেনা মানুষ হয়ে গেল। গ্রামের কেউ তছিকে দেখে এখন চিনতেই পারবে না। জীবনে মাথায় কখনও ঘোমটা দেয়নি তছি, মুখ ঢাকেনি আঁচলে। দেশ গ্রামের নরম সরম বউর ভঙ্গিতে রিকশায় বসেছে তছি, এই ভঙ্গিতে বসার মেয়ে সে না। তছি এখন একেবারেই বদলে যাওয়া তছি।
একবার তছিদের বাড়ির দিকে তাকাল রুস্তম তারপর তাকাল তছির দিকে। তছি বলল, লন, তাড়াতাড়ি লন।
১.৫১-৫৫ দুইপা তুলে বেশ গুছিয়ে
১.৫১
দুইপা তুলে বেশ গুছিয়ে পালঙ্কের মাথার দিকটায় ঢেলান দিয়ে বসলেন দেলোয়ারা। চোখ থেকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে বললেন, সমবাত (সংবাদ) না দিয়াঐ যে বাইত্তে আইলা!
