লোকটা যে শুধু আগ বাড়িয়েই কথা বলে না, বেশিও যে বলে এনামুল তা পুরাপুরি বুঝল। আবার রাগল সে, নাকের পাটা আবার ফুলল তার। গম্ভীর গলায় বলল, এই মিয়া, এত প্যাচাইল পাইরো না।
লোকটা বলল, আর দশটা টেকা দেন, প্যাচাইল পারুম না।
তছি বলল, দেন সাদা। রিশকাআলা ভাইরে দশটা টেকা দেন আর আমারে দশটা টেকা দেন।
তছির কথা শুনে হি হি, হি হি করে হেসে উঠল পোলাপানরা। বেপারি বাড়ির দশ এগারো বছরের দুষ্টের শিরোমণি ছেলে তোতা বলল, পাগলেও টেকা চিনে।
শুনে আবার হাসির রোল পড়ল।
তাকে যে পাগল বলা হল, পাগল বললে সে যে রাগে একথা তছির এখন মনে নাই, সেও হি হি করে হাসতে লাগল। তোতার কথা শুনে ঠোঁট টিপে হাসছিল নূরজাহান। এখন তছিকে হাসতে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না সে, খিলখিল করে হেসে উঠল।
এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নূরজাহানের দিকে তাকাল এনামুল। চোখ থেকে আবার সানগ্লাস খুলল। তীক্ষ্ণচোখে কয়েক পলক নূরজাহানকে দেখে তছির দিকে তাকাল। সবাই হাসছে দেখে তার মুখেও মৃদু হাসি। সেই হাসি হাসিমুখে এনামুল বলল, টেকাদা কী করবি?
মুরলিভাজা খামু।
তছির কথায় আবার হেসে উঠল পোলাপানরা। এবার তছি আর তাদের লগে গলা মিলাল না। রেগে গেল। মুখ খিচাইয়া (খিঁচিয়ে) বলল, ঐ শয়তানের ছাওরা, ভেটকাচ ক্যা? দিমু ঠোকনা।
তারপর আবার এনামুলের দিকে তাকাল। দেন দাদা।
তছির পিছন পিছন সড়কের অদূরে এসে দাঁড়িয়েছিল তার মা। খানিক আগে মেয়ে তার বুকের কাপড় ঠিকঠাক করেছে দেখে এখন সে নিশ্চিন্ত। তবু বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না। গ্রামে নতুন একখান জিনিস আসছে দেখে তছি না কোনও গণ্ডগোল লাগিয়ে দেয়, এরকম একটা ডরে আছে।
একবার তছির মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিকে এনামুল বলল, মুরলিভাজা খাইতে দশটেকা লাগেনি ছেমড়ি?
না লাগুক, আপনে দেন।
তছির লগে গলা মিলিয়ে রিকশাআলা বলল, হ দেন সাব। দশবিশ টেকায় আপনের লাহান মাইষের কী যাইবো আইবো। আপনে বড়লোক মানুষ। এতবড় একখান গাড়ি লইয়া একলা আইছেন। রাস্তা পাকা অইয়া গেলে আমগো রিশকায় তো আর উডবেন না। গাড়ি লইয়া বাইত্তে আইবেন। দেন।
এনামুল আর কথা বলল না। মানিব্যাগ থেকে চকচকে দুইটা দশ টাকার নোট বের করে প্রথমে রিকশাআলাকে একটা দিল তারপর দিল তছিকে। দিয়েই বলল, টেকা দশটা চাইছস, দিছি। অহন আমার ব্যাগ ল। বাইত্তে দিয়ায়।
তছি নির্বিকার গলায় বলল, পারুম না। আমার কাম আছে।
কী কাম?
আপনেরে কমু না।
তছির এই ধরনের কথায় পোলাপানদের মুখে হাসির রোল পড়ার কথা কিন্তু তেমন কিছু হল না। বোধহয় তছির মুখ খিচানো আর বকাবাজির ভরে কেউ হাসছে না। নূরজাহান দাঁড়িয়েছিল তছির গা ঘেঁষে। একবার তছির মুখের দিকে তাকিয়ে এনামুলের ব্যাগের দিকে হাত বাড়াল। দেন দাদা, আমার কাছে দেন। আমি দিয়াহি।
এনামুল বলল, তোমারে আমি ঠিক চিনতে পারছি না। কোন বাড়ির মাইয়া তুমি?
নূরজাহান কথা বলবার আগেই তছি বলল, হায় হায় দাদা, কন কী আপনে? অরে চিনেন নাই? ও তো দবির গাছির মাইয়া নূরজাহান
নূরজাহান! কচ কী?
হ।
ব্যাগ নূরজাহানের হাতে দিয়ে হাসল এনামুল। তরে তো আমি চিনতে পারি নাই নূরজাহান। তুই তো বিয়ার লাইক (লায়েক) অইয়া গেছস। কী রে ছেমড়ি, কবে এত ডাঙ্গর অইলি?
নূরজাহান কথা বলল না। হেসে মাথা নিচু করল।
এনামুল বলল, খালি ডাঙ্গর অচ নাই চালাকও অইছস।
কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। একপলক এনামুলের মুখের দিকে তাকিয়ে সড়কের নামার দিকে হাঁটতে লাগল। এনামুলও চলল তার পিছন পিছন।
.
১.৫০
দশটা টাকা হাতে পাওয়ার পর তছি আর তছি নাই, দিশাহারা হয়ে গেছে, অন্য মানুষ হয়ে গেছে। কী রেখে কী করবে বুঝতে পারছে না। রিকশার দিকেও এখন আর মন নাই তার।
রিকশার চারপাশ ঘিরে দাঁড়ান ভিড়টা এখন আর নাই। ছেলেমেঘেরা যে যার মতো ফিরে গেছে। রিকশাআলা যায়নি। রিকশা আগের জায়গায়ই দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নিজের জায়গায় না বসে এনামুল যেখানে বসেছিল সেখানে বসে খুবই আয়েশি ভঙ্গিতে পা দুইটা লম্বা করে দিয়েছে নিজের সিটের ওপর। প্রায় শুয়ে পড়ার মতো অবস্থা। এই অবস্থায় বিড়ি ধরিয়েছে, আরামছে টানছে, আড়চোখে তছিকে দেখছে।
তছির মা তখনও দাঁড়িয়ে আছে সড়কের নামায়। তার দিকে তাকিয়ে মুখ খিচালো তছি। তুমি এহেনে খাড়ইয়া রইছো ক্যা? বাইত্তে যাও।
তছির মা নিরীহ গলায় বলল, তর লেইগা খাড়ইয়া রইছি। তুইও বাইত্তে ল মা।
আমি অহন যামু না। আমার কাম আছে।
কী কাম?
কইতে পারি না।
এনামুল যে দশটা টাকা দিয়েছে তছিকে, তছি যে মুরলিভাজা খাওয়ার কথা বলেছে সবই শুনেছে তার মা। মেয়ের এলোমেলো কথা শুনে এখন বুঝল সেই টাকা নিয়ে বেদম উত্তেজনায় আছে পাগল মেয়েটা। কী করবে না করবে বুঝতে পারছে না। এই ব্যাপারে মেয়েকে সাহায্য করতে চাইল সে। বলল, বাইত্তে ল মা। আলাদ্দিরে দিয়া মাওয়ার বাজার থনে মুরলিভাজা আনাইয়া দিমুনে তরে।
তছি বলল, না। টেকা আমি কেঐর হাতে দিমু না, দিলেই আমার টেকা দিয়া বেবাকতে মিল্লা মুরলিভাজা কিন্না খাইবো। আমি সীতারামপুর যামু।
ক্যা?
সীতারামপুরের দোকানে মুরলিভাজা পাওয়া যায়। দুই টেকার কিনলে টোপর ভইরা যাইবো। খাইতে খাইতে হাইট্টা আমু। বাইত্তে আহনের আগেই শেষ। কেরে একটা দিমু না। রোজ দুই টেকার কইরা খামু।
