আজ আর এসব দিকে খেয়াল রইল না তছির। রিকশা দেখে সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেল সে। দশগণ্ডা জমিন পার হবার আগেই হাওয়ার বেগে কখন বুকের আঁচল খসে পড়ল তার, কখন উন্মুক্ত হল যুবতী স্তন, দৌড়ের তালে তালে লাফাতে লাগল, কিছুই খেয়াল করল না সে। তছির পিছন থেকে এই ব্যাপারটা খেয়াল করল তার মা। করে দিশাহারা হয়ে গেল। রিকশা দেখে তছির লগে বাড়ির নামায় এসে দাঁড়িয়েছিল তছির মা। পাগল মেয়ে আচমকা ছুট দেবে এটা সে জানত না। যখন ব্যাপারটা তার চোখে পড়ল সেও চিৎকার করতে করতে ছুটল তছির পিছন পিছন। ওলো ও তছি, কাপোড় ঠিক কর মাগি। মাইনষে কইবো কী!
মায়ের কথা কানেই গেল না তছির, সে ছুটছে তো ছুটছেই। ছুটতে ছুটতে যখন সড়কে এসে উঠল, ভিড় ঠেলে যখন রিকশার সামনে এসে দাঁড়াল তখনও তার বুক খোলা। রিকশাআলা জোয়ানমর্দ লোক, সে হা করে তাকিয়ে আছে তছির বুকের দিকে। রিকশায় বসা মানুষটাও তাকিয়েছিল। তবে পলকের জন্য। তাকিয়ে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। এটা খেয়াল করল নূরজাহান। করে তহির মায়ের মতো সেও দিশাহারা হয়ে গেল। কী করবে না করবে বুঝতে পারল না। তারপর তছির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কনুই দিয়ে আস্তে করে তছির পেট বরাবর একটা গুতা দিল। লগে লগে রিকশা দেখা বাদ দিয়ে তেড়ে উঠল তছি। ঐ ছেমড়ি, কন্নি (কনুইয়ের গুতো) দিলি ক্যা?
কথা না বলে চোখ ইশারায় তছিকে তার খোলা বুক দেখাল নূরজাহান। তছি তা বুঝল না। খ্যাক করে উঠল। কী কচ?
এবার দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে নূরজাহান বলল, কাপোড় ঠিক কর।
এবার ব্যাপারটা বুঝল তছি। ছটফট করে বুক ঢাকল। লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করল।
রিকশায় বসা লোকটা এবার তছির দিকে তাকিয়ে প্রথম কথা বলল, কী রে পাগলনি, কেমন আছ?
প্রথমে রিকশা দেখায় ব্যস্ত ছিল তছি তারপর নূরজাহানের কনুইয়ের গুঁতা খেয়ে ব্যস্ত হয়েছে নিজেকে নিয়ে। ফলে রিকশায় বসা লোকটাকে সে খেয়ালই করেনি। লোকটার কথা শুনে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। তাকিয়ে হাসল। খানিক আগের পাওয়া লজ্জা কোথায় উধাও হয়ে গেল তার! ভারি একটা আমোদর গলায় বলল, হায়। হায় এনামুল দাদায় দিহি! আপনেরে তো আমি খ্যালঐ করি নাই। রিশকা কইরা কই থিকা আইলেন?
সানগ্লাসটা আবার চোখে পরল এনামুল। কোলের ওপর রাখা ব্যাগ হাতে নিল, রিকশা থেকে নামল। হাসিমুখে বলল, ঢাকা থিকা।
ঢাকা থেকে রিকশা নিয়ে বাড়ির কাছে চলে এসেছে এনামুল এই কথা শুনে নূরজাহান আর তার বয়সী পোলাপানরা তো অবাক হলই, তছি যে তছি, পাগলনি, সেও অবাক। ভুরু কুঁচকে, চোখ পিটপিট করে বলল, কন কী দাদা! ঢাকা থিকা রিশকা লইয়া বাইত্তে আইয়া পড়ছেন।
এনামুল কথা বলবার আগেই রিকশাআলা বলল, আরে না। সাবে তোমার লগে ফাঁইজলামী করতাছে। আইছে ছিন্নগর থিকা।
লোকটার আগ বাড়িয়ে কথা বলা পছন্দ করল না এনামুল। সানগ্লাসে ঢাকা বলে চোখ দেখা যাচ্ছে না তার, দৃষ্টি কতটা বদলেছে বোঝা যাচ্ছে না, তবে মুখটা থমথম করতাছে, নাকের পাটা সামান্য ফুলেছে। রিকশাআলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, এই মিয়া এত কথা কও ক্যা! তোমারে কেঐ জিগাইছে?
রিকশাআলা বলল, না জিগায় নাই।
তয়?
এমতেঐ কইলাম। এত মানুষজন দেইক্কা ফুর্তি লাগতাছে।
বেশি ফুর্তি ভাল না।
তছি বলল, করুক না। ফুর্তি করলে কী অয়। ও রিশকাআলা ভাই, আমারে ইট্টু রিশকায় চড়াইবেন?
রিকশাআলা প্রথমে তছির মুখের দিকে তাকাল তারপর তাকাল বুকের দিকে। তছির বুক এখন যত্ন করে ঢাকা, কিছুই দেখতে পেল না সে। তবে তার তাকানোটা সানগ্লাসের ভিতর থেকে খেয়াল করল এনামুল, করে রাগল। মুখে কিছু বলল না, মনে মনে খারাপ একটা গাল দিল লোকটাকে। তারপর প্যান্টের হিপ পকেটে হাত দিয়ে মোটা মানিব্যাগ বের করল। একটা দশ টাকা আর একটা পাঁচ টাকার নোট একত্র করে রিকশাআলার হাতে দিল। নেও।
তছির দিকে মন ছিল বলে কয়টাকা ভাড়া দিয়েছে এনামুল রিকশাআলা তা খেয়াল করেনি। টাকা হাতে নিয়ে হা হা করে উঠল। কত দিলেন সাব?
এনামুল নির্বিকার গলায় বলল, গনা জানো না?
জানুম না ক্যা?
তয় গইন্না দেহো।
দেকছি। পোনরো টেকা।
পোনরো টেকা ঠিক আছে না?
না। পোনরো টেকা দিবেন ক্যা?
তয় কত দিমু।
ইনসাফ কইরা দেন।
ইনসাফ কইরা দিছি।
এইডা কোনও ইনসাফ হয় নাই। পঁচিশ টাকা দেন।
কী? ছিন্নগর থিকা মেদিনমোণ্ডল পঁচিশ টেকা ভাড়া?
হ। পঁচিশ টেকা ক্যা তিরিশ টেকাও অইতে পারে। আমি কমঐ চাইছি। এইমিহি তো রিশকাঐ আহে না। রাস্তা অহনতরি পাকা অয় নাই, ইটাও বিছাইন্না হয় নাই, কাঁচা মাডির রাস্তা। এমন রাস্তায় রিশকা চালাইতে জান বাইর অইয়া যায়। তার উপরে খালি রিশকা লইয়া ফিরন লাগবো। আমি এইমিহি আইতাম না। আপনে জোর কইরা আনছেন দেইক্কা আইছি। এই যে এত পোলাপান দেকতাছেন, রিশকা গেরামে ঢোকনের লগে লগে ঝাঐক্কর (ঋক) দিয়া বাইত থনে বাইর অইছে, রিশকার পিছে পিছে দৌড়াইতাছিল, অন চাইরমিহি ভিড় কইরা খাড়ইছে, কীর লেইগা কন তো? কারণ আছে। কারণ অলো অরা তো ইহ জিন্দিগানিতে (জিন্দেগি। জীবন) রিশকা দেহে নাই। ঐ যে মাইনষের বাড়ির মিহি চান, দেহেন বাইরবাইত্তে নাইলে বাড়ির নামায় আইয়া বাড়ইছে বাড়ির বউঝিরা, বুড়াবুড়িরা। খেতখোলার মিহি চান, দেহেন কিষাণরা বেবাকতে এইমিহি চাইয়া রইছে। রিশকা দেকতাছে। আজ পয়লা রিশকা আইলো এই গেরামে। আপনেঐ পয়লা আইলেন। দেন, পঁচিশটা টেকা দেন।
