তীরে এসে তরী ডুবে গেল আলী আমজাদের। কোথা থেকে গ্রামে এসে ঢুকল রিকশা। কারও কিছু হল না সর্বনাশ হল শুধু আলী আমজাদের।
রাগে ক্রোধে ভিতরটা বাঙ্গির মত ফেটে যেতে চাইছে আলী আমজাদের। মনে মনে রিকশায় বসা লোকটাকে বেদম গালাগাল করতে লাগল সে। তুই কেডারে নম্বার পোয় কইথিকা আইলি? খাড়ো, জুইত (সুবিধে) মতন পাইয়া লই, গোয়া মাইরা দিমু তর।
আলী আমজাদ কথা বলছে না দেখে নূরজাহান আবার বলল, কী অইছে! এত চিল্লা চিল্লি কীয়ের!
এবারও নূরজাহানের দিকে মুখ ফিরাল না আলী আমজাদ। রিকশায় বসা লোটার উদ্দেশ্যে মনে মনে করতে থাকা গালাগাল বন্ধ করে মনমরা গলায় বলল, একখান রিকশা আইছে।
কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। বলল, কী হইছে?
রিকশা।
নিজের অজান্তে চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা মেয়েটা তারপর উঠে দাঁড়াল। রিকশা আইছে আমগো গেরামে! কন কী!
নূরজাহানের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাবার আগেই, নূরজাহানের লগে কথা বলবার আগেই তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছাপড়া ঘর থেকে পাগলের মতো ছুটে বেরুল নূরজাহান। প্রথমে বেশিদূর গেল না, ঘরের অদূরে, সড়কের মুখে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে রিকশার দিকে তাকিয়ে রইল। আনন্দে উত্তেজনায় মিষ্টি মুখখানা ফেটে পড়ছিল। সকাল থেকে ঘটে যাওয়া এতগুলি ঘটনার কোনওটাই আর মনে রইল না।
রিকশা তখন হাজামবাড়ি বরাবর থেমেছে চারদিক ঘিরে ধরেছে পোলাপানে। চিল্লাচিল্লি এখন একটু থেমেছে তবে রিকশায় বসা লোকটা তখনও রিকশা থেকে নামেনি। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। এই লোককে দেখতে না, রিকশা একেবারে কাছ থেকে দেখবার জন্য আচমকাই দৌড় দিল নূরজাহান।
বাপের হাতে থাবড় খাওয়ার পর নূরজাহান আজ আর নূরজাহান ছিল না, একেবারেই বদলে গিয়েছিল। গ্রামে রিকশা দেখে, আচমকা দৌড় দেওয়ার সময় সে আবার নূরজাহান হয়ে গেল। জোয়ারের পানিতে ছুটতে থাকা মাছের মতো ছুটতে লাগল। পিছনে কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আলী আমজাদের মনের ভিতর যে তখন কী হচ্ছে আলী আমজাদ ছাড়া কেউ তা জানে না। কয়েক পলক ছুটন্ত নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল সে, তারপর মুখ ঘুরিয়ে ঘরের ভিতর চৌকির দিকে তাকাল। চৌকির ওপর কাঁঠালপাতার ঠোঙায় বাঁধা গান্ধি ঘোষের আটখান রসগোল্লা, হাফ পাউণ্ড পাউরুটি আর ফ্লাস্ক ভর্তি চা, জিনিসগুলো যেমন ছিল তেমনই আছে, শুধু পাশে বসা নূরজাহান নাই।
আস্তে ধীরে হেঁটে চৌকিটার সামনে এল আলী আমজাদ। তারপর প্রথমেই যেন রিকশায় বসা লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এমন ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্লাক্সের ওপর। বেদম জোরে একটা লাথথি মারল ফ্লাস্কে। উড়ে গিয়ে ধাম করে ঢেউটিনের চালায় লাগল জিনিসটা। লেগে চৌচির হয়ে গেল। ঢাকনা খুলে, ঢাকনার তলার মুখ খুলে কোনটা কোনদিকে ছিটকে গেল কে জানে? ফাটা ফ্লাস্কের মুখ দিয়ে, তলা দিয়ে ভরভর করে তখন চা পড়ছে। যেন রিকশায় বসা লোকটাকেই লাথথি মেরে নাকমুখ ফাটিয়ে দিয়েছে আলী আমজাদ। ফাটা নামুখ দিয়ে এখন ভরভর করে রক্ত পড়ছে। আর। সড়কের মাটি ভিজছে। তারপর বিশাল ক্রোধে দুই হাতে পাউরুটিটা খামছে ধরল আলী আমজাদ, যেন রিকশাআলার ঘেটি গলা খামছি দিয়া ধরছে। ধরে এমন দলা মোচড়া করতে লাগল যেন রিকশাআলার ঘেটি মুচড়ে, গলা টিপে আধামরা করে ছুঁড়ে ফেলছে সড়কের ধারে এমন ভঙ্গিতে পাউরুটিটা ছুঁড়ে ফেলল।
রসগোল্লার ঠোঙাটা যেমন ছিল তখনও তেমন আছে। ঠোঙাটাকে আলী আমজাদের মনে হল খালি রিকশা। এতক্ষণ সওয়ারী ছিল, রিকশাআলা ছিল, তাদের উপর প্রতিশোধ আলী আমজাদ নিয়ে ফেলেছে। এখন বাকি আছে শুধু রিকশা, রিকশাটাকেও ছাড়বে না আলী আমজাদ। এই রিকশার জন্যই হাতের কাছে এসেও ফসকে গেছে শিকার!
শরীরের সব শক্তি এক করে, শরীরের সব রাগ ক্রোধ এক করে যেন রিকশার হুড ভাঙছে আলী আমজাদ এমন ভঙ্গিতে খচমচ করে মিষ্টির ঠোঙা ছিঁড়ল, ছিঁড়ে একটা একটা করে রসগোল্লা একেকদিকে ছুঁড়তে লাগল, যেন রিকশা ভেঙে টুকরা টুকরা করে রিকশার একেক অংশ একেক দিকে ছুঁড়ে ফেলছে। এরকম শীতসকালেও আলী আমজাদের কপালে ঘেটিতে আর গলায় জমেছে রসগোল্লার সিরার (রস) মতন ঘাম। কোটের তলায়, শার্টের তলায় ক্রোধের গরমভাপ চোখ কান ঝাঁ ঝাঁ করতাছে। নাকমুখ দিয়ে সমানে বের হচ্ছে গরম চায়ের বাষ্পের মতো শ্বাস। আলী আমজাদ আর মানুষ নাই, জন্তু হয়ে গেছে।
.
১.৪৯
হাজামবাড়ি আর সড়কের মাঝখানে দশগণ্ডা জমিন। সেই জমিন চোখের পলকে পেরিয়ে এল তছি পাগলনি। প্রথমে বাড়ির নামা থেকে রিকশাটা দেখেছে সে, দেখে দামড়ি বাছুরের মতো দুই তিনটা লাফ দিয়েছে তারপর চিৎকার করতে করতে সড়কের দিকে ছুটেছে। তোমরা কে কই আছো, দেইক্কা যাও, রিশকা আইছে দ্যাশে।
তছি পাগলনির পরনে বেগুনি রঙের সস্তা একখান কাপড়। কয়দিন ধরে এই কাপড় পরে আছে কে জানে। হদ্য ময়লা। খানে খানে ধুলামাটি লেগে আছে। কাপড়ের তলায় ছায়া ব্লাউজ কিছুই কখনও থাকে না তার। ফলে তছি যখন ছুটাছুটি করে, নিচের দিকে তার কোনও অসুবিধা হয় না, হয় উপরের দিকে। হাওয়ায় আঁচল সরে যায় বুক থেকে, তছির যুবতী বুক দেখা যায়।
জন্ম পাগল হলে কী হবে, মেয়েমানুষ তো, শরীর বোঝে তছি। ফলে ছুটার সময় যেমন করে পারে আঁচল টেনে বুক ঢেকে রাখে।
