সেই মেয়ে আজ এত বিষণ্ণ হয়ে আছে কেন?
আলী আমজাদকে দেখেই ফাল (লাফ) দিয়ে উঠেছে বদর। যে হিজলগাছের দিকে তাকিয়ে মনের ভিতরকার রহস্য বোঝার চেষ্টা করছিল, কোথায় উধাও হয়ে গেল সেই সব। আলী আমজাদের সঙ্গে কথা বলল না সে। পাশে দাঁড়ান নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রতিদিনকার মতোই ডুরেশাড়ি পরা নূরজাহান। টিয়াপাখি রঙের শাড়ির ওপর টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো লাল রঙের ডোরা। কিন্তু মুখ এমন মলিন কেন মেয়েটার! কোথায় তার চঞ্চলতা, কোথায় হাসি। আলী আজাদের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে উদাসীন দৃষ্টি! হঠাৎ করে এমন বদলে গেছে কেন নূরজাহান! কী হয়েছে তার? এরকম সকালবেলা আলী আমজাদের লগে কোথা থেকে এল?
বদরের ইচ্ছা করে নূরজাহানকে জিজ্ঞাসা করে, ও মাইয়া, কী অইছে তোমার? আইজ দিহি হাসো না, বইচা মাছের লাহান ফালাও না, আইজ দিহি তুমি অন্য মানুষ! বিয়াইন্নাবেলা কনটেকদার সাবের লগে কই থিকা আইলা?
জিজ্ঞাসা করা হয় না। আলী আমজাদের মানুষের লগে আগ বাড়িয়ে কথা বলবে তার কোনও মাটিয়াল এমন সাহস, এমন কলিজা কার আছে। আবার যদি হয় মেয়েমানুষ! আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলে ঢোর (স্বরনালী) ছিঁড়ে ফেলবে আলী আমজাদ। পাছায় লাথথি মেরে কাজ ছাড়িয়ে দিবে। মারের লগে কাজ চলে যাওয়া, কে যাবে এমন কাজ করতে! তারচেয়ে মনের কথা মনে চেপে রাখা ভাল।
নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছে বদর, আলী আমজাদ বলল, আনছচ?
আলী আমজাদের দিকে মুখ ফিরাল বদর। দাঁত না বের করা হাসি হেসে বলল, হ আনছি।
কুনসুম?
আট্টু আগে।
তারবাদে কী করছস?
বইয়া রইছি।
ক্যা?
পলকের জন্য নূরজাহানের দিকে তাকিয়েই আলী আমজাদের দিকে তাকাল বদর। মুখটা হাসি হাসি করল। আপনেঐত্তো কইছেন বেবাক জিনিস আইন্না য্যান বইয়া থাকি। আমার আগে য্যান আপনে না আহেন।
তরে কী আমি বাইরে বইয়া থাকতে কইছি।
না কোনহানে বমু হেইডা কন নাই।
বদর আবার নূরজাহানের দিকে তাকাল।
এবার ঘেটি কাত করে ব্যাপারটা খেয়াল করল আলী আমজাদ। ভিতরে ভিতরে রাগল। রাগলে গলার স্বর প্রথমে নিচে নামে তার, তারপর ওঠে। এখনও তাই হল। অরে চিনচ?
কথাটা বুঝতে পারল না বদর। বলল, কারে?
এই যে আমার লগে আইছে, আমার লগে খাড়ইয়া রইছে?
চিনুম না ক্যা?
ক তো কে?
নূরজাহান। দবির গাছির মাইয়া।
এত ভাল কইরা যহন চিনচ তাইলে বারবার অর মুখের মিহি চাইতাছস ক্যা?
একথায় বদর লজ্জা পেল। কথার উত্তর দিল না। মাথা নিচু করল।
আলী আমজাদের গলা এবার একটু উঠল। কইলি না?
বদর ভয় পেয়ে গেল। এমতেঐ চাইছি।
এবার রাগে ফেটে পড়ল আলী আমজাদ। এমতে চাইছো চুতমারানির পো! তুমি একখান বদ। জিনিসপত্র লইয়া ঘরে না বইয়া থাইক্কা তুমি আইয়া বইছে বাইরে। এমুন জাগায় বইছো যেহেন থিকা জাহিদ খাঁর বাড়ির ঘাড দেহা যায়। বাড়ির বউঝিরা ঘাড়ে আহে তুমি চাইয়া চাইয়া দেহে। বহুতদিন তোমারে আমি দেকছি বাড়ির বউঝি দেকলে তুমি মিষ্টাইয়া মিষ্টাইয়া (মিটি মিটি) হাসো।
একটু থেমে, নূরজাহানের দিকে একবার তাকিয়ে, আবার বদরের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। চড়া গলা নামাল। তর কপালে কইলাম শনি আছে।
বদরের ইচ্ছা হল আলী আমজাদকে বলে, সে ভুলেও জাহিদ খার বাড়ির ঘাটলার দিকে তাকায় না, সে তাকায় ওই যে পুকুরের ওপর বাঁকা হয়ে থাকা গাছটার দিকে। গাছটার দিকে তাকালে তার মনের ভিতর কেমন করে।
বলা হয় না। আলী আমজাদ বিশ্বাস করবে না। বললে বকাবাজির মাত্রা বাড়িয়ে দিবে। ভেক ধরছো চুতমারানির পো!
অন্য সময় হলে আলী আমজাদের বকাবাজি গায়ে লাগত না বদরের, এরকম বকাবাজি তো দিনে রাতে মিলে বহুবার বহুজনকে করতাছে আলী আমজাদ। দুইচার দিনে এক দুইবার বদরকেও করে। শুনে অভ্যস্ত বদর। কিন্তু আজকের বকাটা খুব গায়ে লেগেছে তার। নূরজাহানের সামনে হুদাহুদি (শুধু শুধু) এমন বকা! নূরজাহানের দিকে তো বদচোখে একবারও তাকায়নি বদর। আর জাহিদ খাঁর বাড়ির বউঝিদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহস তার হবে কেন!
দুঃখে অপমানে চোখ ফেটে যেতে চাইল বদরের। আলী আমজাদ ওসব খেয়াল করল না। বলল, কয় টেকা খরচা করছস?
নিজেকে সামাল দিয়ে বদর বলল, সাতাইশ টেকা।
কেমতে?
দুই টেকা দামের আষ্টডা রসোগোল্লা ষোল্ল টেকা, পোয়ারুটি ছয় টেকা, চা পাঁচ টেকা। ষোল্ল আর ছয় বাইশ আর পাঁচ সাতাইশ।
লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বাকি টাকা বের করে দিল বদর। টাকা হাতে নিয়ে আলী আমজাদ বলল, চুরি করছস কত?
একথায় বদর একেবারে আঁতকে উঠল। মুখের অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আলী আমজাদের দিকে। কথা বলতে যেন ভুলে গেল।
আলী আমজাদ আবার বলল, কইলি না?
এতক্ষণ ধরে মানুষ দুইজনের কথা শুনছিল নূরজাহান। নিজে কথা বলেনি। এবার বলল। আলী আমজাদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী প্যাচাইল পারতাছেন? বান্দা ইসাব দিছে। এহেন থিকা চুরি করবো কেমতে!
বদরের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নূরজাহানের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। এতক্ষণের রাগরাগি, বকাবাজি সব ভুলে গেল। সোনায় বাঁধানো দাঁতে ঝিলিক দিয়ে হাসল। করতাছে, করতাছে। এর মইদ্যেও চুরি করনের পথ আছে। আষ্টডা রসোগোল্লা কিন্না ষোল্ল টেকার জাগায় গান্দিরে দিছে পোনরো টেকা। চাইর টেকার চা কিন্না কইতাছে পাঁচ টেকা। খালি পোয়াটিডা থিকা চুরি করতে পারে নাই। ওইডার বান্দা দাম।
