বদর তখনও তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের দিকে। মুখে অদ্ভুত ভঙ্গি, চোখে পলক পড়ে না। ব্যাপারটা আলী আমজাদ খেয়াল করল না, পাত্তা দিল না। নূরজাহান খেয়াল করল। বদরের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনে যান গা।
আলী আমজাদও বলল, হ যা গা। যা চুরি করছস, করছস। হেইডা তো আর ফিরত পামু না। যা অহন কামে যা।
বদর তবু নড়ল না। আগের মতোই তাকিয়ে রইল আলী আমজাদের দিকে। চোখে পলক পড়ে না তার।
এবার আলী আমজাদ বিরক্ত হল। খাউ খাউ করে উঠল, কীরে যাচ না?
বদর নড়েচড়ে উঠল। চোখে পলক পড়ল তার। মুখভঙ্গি বদলে গেল। তবে এক পা নড়ল না সে।
বদর নড়ছে না দেখে আলী আমজাদ এবার প্রচণ্ড রাগল। চিৎকার করে বলল, কীরে অহনরি যে খাড়োইয়া রইলি! গেলি না।
কোন ফাঁকে বদরের মুখভঙ্গি আবার বদলেছে, চোখের দৃষ্টি আবার বদলেছে। শীতল চিন্তিত একটা ভঙ্গি তার চোখে মুখে। আলী আমজাদ যত জোরে চিৎকার করল ঠিক ততটাই নিচু গলায় সে বলল, আপনে আমারে চোর কইলেন!
আলী আমজাদ আবার চিৎকার করল। হ কইলাম। তুই চুরি করছস কইছি। চোররে চোর কমু না, দারগা কমুনি!
ক্যান কইলেন? আমি তো চুরি করি নাই।
চুরি কইরা বেবাকতেই এইকথা কয়।
আমি মিছাকথা কই না।
আলী আমজাদ মুখ ভেংচি দিয়ে বলল, না তুমি মিছাকথা কও না নমবার পো! (নমোরপুত্র অর্থে) তুমি অইলা পীর আউল্লা (আউলিয়া)। যা সর আমার চোক্কের সামনে থিকা।
বদরের দৃষ্টি এখনও আগের মতো। চিন্তিত, অপমানিত মুখভঙ্গি। আলী আমজাদ এত যে চিল্লাচিল্লি করতাছে তার যেন গায়েই লাগছে না।
আলী আমজাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠিক আগের ভঙ্গিতে আবার বলল, আমি মিছাকথা কই না। একটা পয়সাও আপনের চুরি করি নাই। আমগো বংশের কেঐ চোর না। আমার বাপ দাদায় বহুত পরহেজগার মানুষ আছিলো। আপনে আমারে চোর কইলেন ক্যা?
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আলী আমজাদ। লগে যে নূরজাহান আছে ভুলে গেল। প্রচণ্ড রাগে ঝাঁপিয়ে পড়ল বদরের ওপর। ডানহাতে এমন জোরে ঘেটি ধাক্কা দিল বদরের, বদর উড়ে গিয়ে তিনচার হাত দূরে পড়ল। মুখটা মাটিতে থুবড়ে গেল। তবু মুখভঙ্গি আর চোখের দৃষ্টি বদলাল না তার। আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়াল, হাতমুখে লাগা ধুলামাটি ঝাড়ল তারপর আবার এসে দাঁড়াল আলী আমজাদের সামনে। আপনে আমারে চোর কইলেন!
এবার আলী আমজাদ থতমত খেল। তবে পলকের জন্য। তারপরই নিজেকে সামলাল। আগের তেজ বজায় রেখে বলল, চুতমারানির পোয় তো বহুত দিগদারি (যন্ত্রণা) করতাছে। ঐ বেডা চোর কইছি কী অইছে। তুই কইলাম যা এহেন থিকা। অহনতরি নাস্তাপানি খাই নাই। মেজবান লইয়াইছি নাস্তা খাইতে। মিজাজ আর খারাপ করি না। তাইলে পিডাইয়া মাইরাই হালামু। যা কামে যা।
এসব কথা বদরের যেন কানেই গেল না। সে আগের মতোই বলল, আপনে আমারে চোর কইলেন!
এবার আলী আমজাদের গেল মাথা খারাপ হয়ে। দুইহাত তুলে বদরের গলা টিপে ধরতে গেল কিন্তু পারল না, নূরজাহান এসে মাঝখানে দাঁড়াল। বদরকে কিছু বলল না, বদরের দিকে তাকালও না। আলী আমজাদের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝাল গলায় বলল, কী আরম্ব করলেন আপনে?
নূরজাহানকে এভাবে মাঝখানে দাঁড়াতে দেখে থামল আলী আমজাদ। তবে গলার জোর কমাল না। বলল, অরে চোর কইছি কী অইছে! এমুন করতাছে ক্যা? কামে যায় না ক্যা?
নূরজাহান বদরের দিকে তাকাল যান আপনে কামে যান।
নূরজাহানের কথায় চোখ ছলছল করে উঠল বদরের। কাতর গলায় বলল, কনটেকদার সাবে আমারে চোর কইলো ক্যা? কও বইন, আমি বলে চোর? আমি বলে চুরি করছি। আমগো বাড়ি কান্দিপাড়া। ভাল বংশের পোলা আমি। পেডের দায়ে মাইট্টাল অইছি। চোর অইলে তো আগেঐ অইতে পারতাম!
সামান্য একটা কথায় এমন আঘাত পেতে পারে কোনও মানুষ, এমন করে ভেঙে পড়তে পারে নূরজাহান কখনও দেখেনি। নূরজাহান কী, তার বাপের বয়সী আলী আমজাদও দেখেনি। দুইজনই তারা অবাক হয়েছে। তবে দুইজনের অবাক হওয়া দুইরকম। আলী আমজাদ ভাবছে চুরি বদর করেছেই না হলে এইটুকু কথা এত গায়ে লাগবো কেন তার! এইটুকু কথা নিয়া এমন বাড়াবাড়ি সে কেন করবে! আর নূরজাহান। ভাবছে, চুরি করার কথা শুনে, তাও নূরজাহানের সামনে চোর বলা হয়েছে দেখে এতটা ভেঙে পড়েছে বদর। আসলে চুরি সে করেনি।
মানুষটার জন্য খুব মায়া লাগল নূরজাহানের। বদরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কথাডা কনটেকদার সাবে এমতে কইছে। আমি জানি আপনে চুরি করেন নাই। আপনে ভাল মানুষ। যান কামে যান।
বদর তারপর আর একটাও কথা বলল না। দুইহাতে চোখ মুছতে মুছতে সড়কে উঠল, উঠে ধীরে পায়ে হাঁটতে লাগল। যেন কাজে যাওয়ার কোনও গরজ নাই তার।
একবার বদরের দিকে তাকিয়ে নূরজাহানের দিকে মুখ ফিরাল আলী আমজাদ। হাসল। বদইরা হালায় পাগল! চোর কইলে এমুন করে মাইনষে! কইছি কী অইছে!
নূরজাহান চিন্তিত গলায় বলল, চুরি হেয় করে নাই।
করছে।
কেমতে বুজলেন?
চুরি না করলে কথাডা অর গায় লাগতো না।
আমার মনে অয় অন্যকথা। চুরি করে নাই দেইক্কাঐ কথাডা তার গায় লাগছে, মনে লাগছে।
যা ইচ্ছা অউক গা। লও ঘরে লও।
নূরজাহন একটু চমকাল। ক্যা ঘরে যামু ক্যা?
আলী আমজাদ হাসল। নাস্তা খাইবা না?
না। কইলাম যে খিদা নাই!
খিদা তোমার আছে। লও।
বলেই নূরজাহানের কাঁধে হাত দেওয়ার চেষ্টা করল আলী আমজাদ। তার আগেই চট করে সরে গেল নূরজাহান। একটু রাগল। আপনে কইলাম এমুন করবেন না আমার লগে।
