রাতের কাজ শুরু করবার পর একটানা চব্বিশ ঘন্টা হেকমতকে কাজ করতে দেখে প্রথমে খুশি হয়েছে আলী আমজাদ। ভেবেছে লোক খুবই ভাল হেকমত, লোক খুবই কাজের। পয়সা যেটুকু বেড়েছে কাজ তারচেয়ে বেশিই করতাছে। এই ধরনের পরিশ্রমী লোক সবাই পছন্দ করে।
কয়েকদিন যাওয়ার পরই খটকা লাগল আলী আমজাদের। মনে হল যে পয়সা সে বাড়িয়েছে শুধুমাত্র ওই পয়সার লোভে নাওয়া খাওয়া ঘুম হারাম করে আবালের (যুবা ষাঁড়) মতো পরিশ্রম করতে পারে না কোনও মানুষ। নিশ্চয় ভিতরে কোনও রহস্য আছে। বড় রকমের কোনও স্বার্থ আছে হেকমতের। সেই স্বার্থটা ধরবার জন্য তারপর উঠে পড়ে লেগেছে আলী আমজাদ। দিন নাই রাত নাই যখন তখন চলে যায় সাইটে। প্রতিবারই যাওয়ার আগে ভাবে এইবার গিয়েই হেকমতের স্বার্থটা ধরে ফেলবে। হয়তো গিয়ে দেখবে দশ বিশজন মাটিয়াল কাজ বন্ধ করে সড়কের পাশে বসে গল্প গুজব করতাছে, বিড়ি খাচ্ছে। নয়তো দেখবে মাটিয়ালদের কাজে গতি নাই। হেকমতও সাইটে নাই। আশপাশের কোনও বাড়ির বাংলাঘরে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। কপাল ভাল হলে হেকমতের আসল স্বার্থটাই হয়তো ধরে ফেলবে আলী আমজাদ। কাজে ফাঁকি দেওয়া মাটিয়ালদের কাছ থেকে মাথা পিছু এক দুইটাকা করে হয়তো বুঝে নিচ্ছে হেকমত আর ঠিক তখনই গিয়ে তাকে হাতেনাতে ধরবে সে।
কিন্তু আলী আমজাদের সেই আশার গুড়ে য়োড়া য়োড়া বালি ঢেলে যাচ্ছে হেকমত। যখনই সাইটে যায় আলী আমজাদ গিয়েই দেখে দৃশ্য এক রকম। মাটিয়ালরা নিয়ম মতো কাজ করতাছে, হেকমত তার নিজস্ব নিয়মে ছুটাছুটি করতাছে, চিৎকার চেঁচামেচি করতাছে, কোথাও কোনও গড়বড় নাই। আলী আমজাদ হতাশ হয়েছে, তবে দমে যায়নি। হেকমতের স্বার্থ রহস্য উদঘাটনের আশায় এখনও সমান উৎসাহে লেগে আছে। যে কারণে রাত বিরাতে আতাহারদের বাড়িতে আর ঘুমাতে যাওয়া হয় না তার। ওই বাড়িতে গেলে যখন তখন সাইটে যাওয়া হবে না। হেকমতকে হাতে নাতে ধরা হবে না।
আজ সকালেও হেমতকে ধরবার আশায়ই সাইটে এসেছে আলী আমজাদ। এসে আগের মতোই হতাশ হণেছে। মাহতাব আলীদের বাড়ি থেকে হাতলআলা কালো রঙের ভারী একখান চেয়ার এনে দিয়েছে বদর, সেই চেয়ারে বসেই পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট বের করেছে। কিছুদিন হল মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বো না আলী আমজাদ, অন্যদিকে তাকিয়ে বলে। বদরের লগেও তাই করল। টেকাডা ধর।
গভীর উৎসাহে টাকা ধরল বদর। আড়চোখে তার টাকা ধরার ভঙ্গি খেয়াল করল আলী আমজাদ। গম্ভীর গলায় বলল, টেকা ধইরা বহুত আরাম, না?
কথাটা বুঝতে পারল না বদর। বলল, কী কইলেন?
আগের মতোই অন্যদিকে তাকিয়ে আলী আমজাদ বলল, তুই মনে করছস টেকাডা তরে আমি আল্লাদ কইরা দিলাম!
শুনে বদর খুবই লজ্জা পেল। না হেইডা মনে করুম ক্যা? আমারে আপনে টেকা দিবেন কীর লেইগা?
তাইলে যে ভেটকাইলি (হাসলি)।
কুনসুম ভেটকাইছি!
ভেটকাইছস। আমি দেকছি।
এবার সত্যি সত্যি হাসল বদর। কেমতে দেকলেন? আপনে তো অন্যমিহি চাইয়া আছিলেন!
আমার চক্কু অইলো আষ্টডা। সবই দেহি। কুনসুম কুন চক্কু দিয়া দেহি কেঐ উদিস পাইবো না।
তয় আমি কইলাম হাসি নাই কনটেকদার সাব। সত্যঐ হাসি নাই।
না হাসলেও আমদ পাইছস। ক পাচ নাই?
বদর মাথা নিচু করে বলল, হ পাইছি।
কীর লেইগা পাইছস কমু আমি?
কন তো!
তুই বোজছস তরে কোনও কামে পাডামু আমি। মাইট্টালগিরি ছাড়া অন্য যে কোনও কামে পাড়াইলে তুই বড় আমদ পাচ। ক পাচ না?
হ পাই। মাইট্টালগিরি করতে আমার ভাল্লাগে না।
এবার বদরের দিকে মুখ ফিরাল আলী আমজাদ। হাসল। তয় বোজছস আমি কী মাল?
বুজছি।
এইবার তাইলে কাজির পাগলা বাজারে যা। গান্দির দোকান থিকা দুইটেকা দামের আষ্ট রসোগোল্লা আনবি, এক ফেলাচ (ফ্লাস্ক) চা আনবি। করিমের ডাক্তারখানার লগে একখান দোকান আছে ওই দোকান থেইকা একখান পোয়ারুটি (পাউরুটি) আনবি। মাজারকি (মাঝারি)।
কোটের পকেট থেকে ছাপড়া ঘরের চাবি বের করে বদরের হাতে দিয়েছে আলী আমজাদ। জিনিসটি আইন্না ঘর খুইল্লা বহিচ। আমি আইতাছি। দেরি করিচ না কইলাম। আমি আইয়া যদি দেহি তুই আহচ নাই তাইলে কইলাম খাইছি তরে। বহুত খিদা লাগছে আমার।
ভারি একটা উদ্বেগ নিয়ে তারপর কাজির পাগলা ছুটেছে বদর। যত দ্রুত সম্ভব ফিরে এসেছে। এসে যখন দেখেছে আলী আমজাদ আসেনি, খুশি হয়ে ঘরের দুয়ার খুলেছে। জিনিসগুলি চৌকির ওপর রেখে নিজে এসে বসেছে বাইরে, দুয়ারের কাছে এমন জায়গায় যেখান থেকে পুকুরের ওপর ঝুঁকে থাকা হিজলগাছটা পরিষ্কার দেখা যায়। গাছের তলায় পানির ওপর ছিটরুটির মতো রোদ, ঠাণ্ডা একখান ভাব, তাকিয়ে থাকতে থাকতে আশ্চর্য এক ঘোর লেগে গেল বদরের। বুকের ভিতর অদ্ভুত এক অনুভূতি। এই অনুভূতির অর্থ কী!
কতক্ষণ এই গাছের দিকে তাকিয়ে বসে আছে বদর, মনে নাই। হঠাৎই পিছনে একজোড়া মানুষের পায়ের শব্দ পেল। ঘোর ভেঙে গেল। চমকে পেছন ফিরে তাকাল।
বদরের ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে আলী আমজাদ। সঙ্গে নূরজাহান। এখানে মাটিয়ালের কাজ করতে আসার পর থেকেই নূরজাহানকে চিনে বদর। সময় সময় সড়কের কাজ দেখতে আসে। চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে। সারাক্ষণই দইকুলির (দোয়েল পাখি) মতন লাফায়। কখনও হাঁটে না, ছুটে বেডায়। গাঙ্গের পানির মতন আওয়াজ করে হাসে। মুখখানা এত মিষ্টি মেয়েটার, মুখের দিকে তাকালে খারাপ মন ভাল হয়ে যায়।
