আজ সকালে এই অনুভূতির অর্থ বুঝতে চাইছিল বদর। কিছুক্ষণ আগে কাজির পাগলা থেকে ফিরেছে। ফিরে গান্ধী ঘোষের দোকান থেকে কাঁঠাল পাতার ঠোঙায় চিকন সুতলি দিয়ে বাঁধা রসগোল্লার পোটলা রেখেছে চৌকির ওপর। হাফ পাউন্ড পাউরুটিটা রেখেছে, কমলা রঙের ফ্লাস্কটা রেখেছে। ফ্লাস্ক ভর্তি চা। আগে চা আনতো কেটলিতে করে। এলুমিনিয়ামের মাঝারি সাইজের একটা কেটলি আছে। কেটলির নলে কাগজের ঢিপলা (দলা) দিয়ে, যত দ্রুত সম্ভব হেঁটে মাওয়া কাজির পাগলা থেকে ফিরে আসতে আসতে ওই অত যত্নের পরও চা যায় পুকুরের পানি হয়ে। কাগজ জ্বেলে, শুকনা পাতা খড়নাড়া জ্বেলে আবার গরম করো চা। ম্যালা হাঙ্গম (যন্ত্রণা)। এখন এত হাঙ্গাম করবার সময় নাই। বদরকে যে চা গরম করবার কাজে বসিয়ে রাখবে, যতক্ষণে চা গরম করবে বদর ততক্ষণে দুইতিন মোড়া মাটি ফেলবে রাস্তায়, কাজ আগাবে, এসব ভেবে কয়দিন আগে দিঘলী বাজার থেকে এই ফ্লাস্কটা কিনে এনেছে আলী আমজাদ। ফ্লাস্কে রাখা চা ঘন্টার পর ঘন্টা গরম থাকে। এক ফ্লাক্স চা আনলে একা খেলে বেশ কয়েকবার খাওয়া যায়। কাপেরও দরকার হয় না, ঢাকনাটাই কাপ! সময়ে সময় বাঁচে, খেয়েও আরাম।
কিন্তু সময়ের কথা আজ ভাবছে না কেন আলী আমজাদ! এখনও যে নাশতা করতে এল না!
রোদ ওঠার পর আজ কাজের সাইটে গিয়েছে আলী আমজাদ। লগে মোটর সাইকেল। ঘুম থেকে উঠে মুখ তরি ধোয়নি। ঘন মোটা লোমের ভুরুর তলায়, নাকের বাঁকের দুইপাশে চোখের কোণে আমরুজ রঙের কেতুর (পিচুটি)। মাথার চুল এলোমেলো। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়েছিল বলে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত পশমি কম্বল মুড়া দিয়ে রেখেছিল বলে চুল মুখে কম্বলের আঁশ লেগে আছে। মুখটা বেশ নোংরা দেখাচ্ছিল। ঘুম ভাঙার পর এসব খেয়াল করেনি আলী আমজাদ। শুধু পোশাক খেয়াল করেছে। লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ঘুমিয়েছিল। উঠে কালো রঙের প্যান্ট পরেছে, সাদা শার্ট পরেছে, শার্টের ওপর প্যান্টের লগে মিলিয়ে পরেছে কোট। পায়ে জুতা, গলায় মাফলার। এমনিতেই বেদম শীত, তার ওপর চালাতে হবে মোটর সাইকেল, একদিকে মোটর সাইকেলের বেগ অন্যদিকে শীতের বেগ, দুই বেগে কাবু হয়ে যাবে আলী আমজাদ। তাছাড়া মুখ ধুতে গেলে পরিশ্রমও তো কম না! জাহিদ খাঁর বাড়ির ঘাটলায় যাও, মরার মতন ঠাণ্ডা পানিতে হাত ডুবাও, সেই পানি স্নো পাউডারের মতন লাগাও মুখে। না হয় বালতির ভোলা পানিতেই মুখ ধুইলো, সারারাত বালতিতে থাকার ফলে পুকুরের পানির চেয়ে কম ঠাণ্ডা হয় না বালতির পানি। কথা একই। বাড়িতে থাকলে না হয় গরম পানিতে মুখ ধোয়া যেত। বউ পানি গরম করে দিত। কিন্তু বাড়িতে তো আলী আমজাদ থাকছে না! থাকছে কাজের সাইটে, ছাপড়া ঘরে।
আগে প্রায়ই আতাহারদের বাড়িতে থাকত। ওই বাড়িতে থাকলেও মুখ ধোয়ার গরম পানিটা পেত। মান্নান মাওলানার অজুর জন্য যে পানি গরম করা হত তার অনেকটাই থেকে যেত আলী আমজাদের জন্য। ওই বাড়িতে থাক ল জামাই আদরে থাকা যায়।
কদিন ধরে থাকা হচ্ছে না। সারারাত কাজ চলে। হ্যাজাকের আলোয় মাটি তোলে মাটিয়ালরা, সারাদিন কাজ করে একদল, সারারাত আরেকদল। দিনের তদারকি তো আছেই, রাতের তদাররিকটাও করতে হয়। হেকমত আছে, তার ওপর কতটা নির্ভর করা যায়! কাজ কমিয়ে দিয়ে বিশ পঞ্চাশজন মাটিয়ালের কাছ থেকে এক দুইটাকা করে প্রতিদিন খেলে দিনরাত মিলে ম্যালা টাকা। মাটির কাজ শেষ হতে না হতে বড়লোক হয়ে যাবে হেকমত। মাস ছয়েক পরে দেখা যাবে নিজেই কন্ট্রাক্টর হয়ে গেছে। আজ সে যেমন ছাতা ধরে রাখে আলী আমজাদের মাথায় সেদিন তার মাথায় ছাতা ধরে রাখবে আরেকজন।
টাকা কি হেকমত মাটিয়ালদের কাছ থেকে খাচ্ছে না! বাড়তি রুজি কি তার হচ্ছে! না হলে কোন স্বার্থে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করতাছে। মানুষের শরীর তো! শরীরে কুলাচ্ছে কী করে! দুইজন ম্যানেজারের কাজ একা সে করতাছে কী করে! আলী আমজাদ নিজে তো হেকমতের দশভাগের একভাগ কাজও করতাছে না। দিনরাত মিলে ছয়সাত ঘণ্টার বেশি সাইটে সে থাকে না। যদিও প্রতি গোড়া মাটির লগেই পয়সা উঠছে তার। তবু সময়টা সে পুরাপুরি দেয় না। সাইটে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই ক্লান্ত লাগে। যদিও দাঁড়িয়ে খুব একটা থাকতে হয় না তাকে। আলী আমজাদ সাইটে আসবার লগে লগে হেকমত এসে মাথার ওপর ছাতা ধরে, বদর ছুটে যায় সড়কের ধারের যে কোনও বাড়িতে, গিয়ে হাতাআলা, হাতছাড়া একটা কাঠের চেয়ার নিয়ে আসে। আরাম করে সেই চেয়ারে বসে আলী আমজাদ। কখনও কখনও আশপাশের বাড়ি থেকে বউঝিরা চা পর্যন্ত বানিয়ে পাঠায় তাকে। এতবড় সড়কের কাজ হচ্ছে, রাতারাতি বদলে গেছে এলাকার চেহারা, কত মানুষ, কত উন্নতি, গিরস্ত বাড়ির বউঝিদের ধারণা এই উন্নতির মূলে আলী আমজাদের মতো কন্ট্রাক্টরদের বিরাট অবদান। সুতরাং এক দুইকাপ চা দিয়ে ফেরেশতার মতো এই সব মানুষের একটুখানি সেবা যদি করা যায়।
তবু সাইটে মন টিকে না আলী আমজাদের। দাঁড়িয়ে থাকলেও ক্লান্ত লাগে, বসে থাকলেও।
কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করবার পরও হেকমতের ক্লান্তি নাই কেন? কোন লোভে, কোন আশায় ওই অসুরের পরিশ্রম সে করতাছে! আলী আমজাদ না হয় অল্প কিছু পয়সা তার বাড়িয়েছে, এই পয়সার লোভে একজন মানুষ কী এতটা পরিশ্রম করে!
