আলী আমজাদকে রেগে উঠবার সুযোগ না দিয়ে, বকাবাজি করবার সুযোগ না দিয়েই ঝড়ের বেগে পা চালিয়ে মাটিয়ালদের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল হেকমত। তবে হেকমতের কারবার দেখে ভিতরে ভিতরে ভাল রকমের ধাক্কা খেল আলী আমজাদ। মনে মনে খারাপ একটা বকা দিল হেকমতকে। চুতমারানির পোয় তো দেহি ভাল কায়দা ধরছে! বেবাক কিছু দেইক্কাও কইলো কিছু দেহে নাই। গাইল দেওনের আগে পলাইলো। কয় কী! এমুন অইলে তো হেকমইত্তার কাছে মাইর খাইয়া যামু আমি!
হেকমতের কথা ভাবতে ভাবতেই পাশে দাঁড়ান নূরজাহানের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। ভুলে গেল ঝটকা মেরে তার হাত ছাড়িয়ে দিয়ে তাকে অপমান করেছে নূরজাহান সেই দৃশ্য দেখে ফেলেছে তার ম্যানেজার। এসব যেন কোনও ব্যাপারই না এমন ভঙ্গিতে হাসল সে। কইলা না কী অইছে গালে?
নূরজাহান মুখ গোমড়া করে বলল কিছু না।
আমার কাছে মিছাকথা কইয়ো। আমি জানি কী অইছে।
কন তো কী?
কেঐ তোমার গালে থাবড় মারছে।
কে কইলো আপনেরে?
এই হগল আমি বুজি।
তাইলে কন তো কে মারছে।
তোমার বাপে।
কথাটা শুনে চমকে উঠল নূরজাহান। কেমতে কইলেন?
আলী আমজাদ হে হে করে হাসল। কথাডা মিলছে কী না কও।
নূরজাহান মাথা নিচু করে করে বলল, মিলছে।
তয় আরেকখান কথা কই দেখবা ওইডাও মিলবো।
কী কথা?
বিয়ান থিকা অহনতরি তুমি কিছু খাও নাই।
নূরজাহান কথা বলল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
আলী আমজাদ বলল, এর লেইগা তোমারে একটা জাগায় লইয়া যাইতে চাইতাছি। তুমি আমার সামনে আইয়া খাড়নের পর তোমার মুক দেইক্কা আমি বুজছিলাম বিয়ান থিকা তুমি কিছু মুখে দেও নাই। থাবরের দাগ দেখছি পরে। কইলে বিশ্বাস করবা না, বিয়ান থিকা আমিও কইলাম কিছু মুখে দেই নাই। বহুত খিদা লাগছে। এক মাইট্টালরে পাডাইয়া কাজির পাগলা বাজার থিকা রসোগোল্লা আনাইছি। গান্দিগোষের (গান্ধি ঘোষ) দোকানের রসোগোল্লা। পাউরুটি আনাইছি। চা ও আছে। আমার লগে বহাইয়া এই হগল খাওনের লেইগা তোমারে লইয়া যাইতে চাইতাছি। আমার ঘরডা অহনতরি জাহিদ খাঁর বাড়ির লগেঐ আছে। লও যাই। দুইজনে মিল্লা খাওয়া দাওয়া করি গা।
নূরজাহান নির্বিকার গলায় বলল, না।
ক্যা?
আমি কিছু খামু না। খিদা নাই।
না খাইলা তাও লও।
ক্যা?
আমি খাইলাম তুমি বইয়া বইয়া দেকলা। তোমার লগে কথা কইতে কইতে খাইলাম।
না।
এবার অন্য লাইন ধরল আলী আমজাদ। মুখটা শিশুর মতো অভিমানী করে বলল, তোমার এক কথায় এতবড় একখান কাম আমি কইরা দিলাম, মাকুন্দারে মাইট্টাল বানাইয়া দিলাম, ডেলি পনচাইশ সাইট টেকা কামাইবো, মাওলানা সাবের পোলা আতাহার আমার দোস্ত, তাগো কথা চিন্তা করলাম না, আর তুমি আমার একখান কথা হোনতাছো না! আমি কী বদলোক? ঐ ঘর নিয়া তোমার লগে আকাম করুম! বদলোক অইলে তুমি এহেন থিকা চইলা যাওনর পরঐত্তো মাকুন্দারে আমি কামে থিকা ছাড়াইয়া দিতে পারি। তুমি পরে আইয়া জিগাইলে কমু ও কাম পারে না দেইক্কা ছাড়াইয়া দিছি। তহন তুমি আমারে কোনও দোষ দিতে পারবা?
আলী আমজাদের কথায় ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করল নূরজাহান। মন একটু নরম হল তার। তবে মুখের ভঙ্গি বদলাল না। আগের মতোই নির্বিকার গলায় বলল, আইচ্ছা লন।
আচমকা রাজি হয়ে যাবে নূরজাহান এটা ভাবেনি আলী আমজাদ। প্রথমে কথাটা বিশ্বাসই করল না। বলল, কী কইলা?
কইলাম, লন যাই।
এবার গলাকাটা কুকরার মতন একটা ভাব হল আলী আমজাদের। কী রেখে কী করবে বুঝতে পারল না। পারলে নূরজাহানকে কুলে নিয়ে দৌড় দেয়।
তবে এই ভাব সামাল দিল আলী আমজাদ। সরল গলায় বলল, তয় লও।
পাশাপাশি হেঁটে মোটর সাইকেলটার সামনে এল দুইজন। আলী আমজাদ বলল, তুমি কোনওদিন মটর সাইকেলে চড়ছো?
না।
তাইলে আইজ তোমারে চড়ামু। অহনঐ।
মোটর সাইকেলে চড়ার কথা শুনে ভারি একটা আনন্দ হল নূরজাহানের। মোটর সাইকেলে চড়তে কেমন লাগে জানা নাই। নিশ্চয় খুব মজার।
আলী আমজাদ বলল, মটর সাইকেলে আমার পিছে বইয়া আমারে পাচাইয়া ধইরা রাখবকা। আমি তো কইরা চালাইয়া দিমু। চোক্কের নিমিষে দেখবা জাহিদ খাঁর বাড়ির সামনে গেছি গা।
মার কথা মনে পড়ল নূরজাহানের। মা একদিন বলেছিল মেয়েমানুষের শরীর শুধুমাত্র একজন পুরুষের জন্য। সেই পুরুষের নাম স্বামী। স্বামী ছাড়া অন্যকোনও পুরুষ মেয়েদের শরীর ছুঁইতে পারে না। আলী আমজাদের মোটর সাইকেলে চড়ে পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরতে হলে তার বুক লেগে যাবে আলী আমজাদের পিঠে। ছি।
নূরজাহান অস্থির গলায় বলল, না না আমি মটর সাইকেলে চড়ুম না।
আলী আমজাদ অবাক হল। ক্যা?
এমতেঐ।
তারপর কথা অন্যদিকে ঘুরাল নূরজাহান। আমার ডর করে।
কীয়ের ডর? আমি আছি না!
থাকলেই বা কী, আমি চড়ুম না। আপনে মটর সাইকলে যান, আমি আইট্টাইতাছি।
আলী আমজাদ চতুর লোক। ব্যাপারটা সে বুঝল। বুঝে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসি হাসল। তাইলে আমিও আর মটর সাইকেল লমু না লও দুইজনেঐ আইট্টা যাই।
মোটর সাইকেল আগের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে রইল, আলী আমজাদ আর নূরজাহান পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
.
১.৪৮
ছাপড়া ঘরের পিছনদিকে, পুকুরপারে একটা হিজলগাছ। গাছের গোড়া পুকুরপারের আঁটালমাটি কামড়ে ধরে আছে, দেহ চলে গেছে পুকুরের দিকে, গিয়ে ডিঙ্গি নৌকার মতো বাঁক নিয়ে মাথা তুলেছে আকাশে। সকালবেলার রোদ জাহিদ ধার বাড়ি ডিঙিয়ে, বাড়ির গাছপালা, বাঁশঝাড় আর চৌচালা টিনের ঘরগুলির চাল ডিঙিয়ে যখন এই পুকুরে আসে, মাথার দিককার ঝাঁপড়ানো ডালপালা দিয়ে গাছটা আপ্রাণ চেষ্টা করে বোদ ঠেকিয়ে রাখতে। রোদ পুরাপুরি ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা গাছটার নাই। ডাল পালার ফাঁক ফোকর দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রোদ এসে পড়ে পুকুরের পানিতে। হিজলের ছায়ার তলে পানি, পানির ওপর ছিটরুটির মতো রোদ, জায়গাটা সারাদিন কাল (ঠাণ্ডা) হয়ে থাকে। হঠাৎ হঠাৎ তাকালে মনের ভিতর কী রকম একটা অনুভূতি হয়। এই অনুভূতির অর্থ বোঝে না বদর। বহুকালের পুরানা একখান হিজলগাছ, তার তলায় পুকুরের পানি, ছড়ানো ছিটানো রোদ, কালভাব, দেশ গ্রামের পথেঘাটে, গিরস্ত বাড়ির লগের আর ছাড়াবাড়ির নির্জন পুকুরপারে তাকালে এরকম দৃশ্য দেখা যেতেই পারে কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে মনের ভিতর এমন করবে কেন!
