তাইলে অহনই লাগাইয়া দেই।
দে।
লগে তো য়োড়া নাই।
আমগোই য়োড়া থিকা একটা দিয়া দে।
আইচ্ছা।
কাশেমের দিকে তাকাল হেকমত। আহো আমার লগে।
চএত সহজে এরকম কাজের ব্যবস্থা হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি মাকুন্দা কাশেম। নূরজাহানের জন্য হয়েছে। তার একবার ইচ্ছা হল নূরজাহানকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। কাজে দেরি হয়ে যাবে দেখে করল না। দেরি হলে কাজটা যদি আবার না দেয় কনটেকদার সাবে!
হেকমতের পিছন পিছন ছুটতে লাগল মাকুন্দা কাশেম।
আলী আমজাদ তখন নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে আছে। নূরজাহান তাকিয়েছিল ছুটে যাওয়া কাশেমের দিকে। গভীর আনন্দে মুখটা যেন ফেটে পড়ছে তার। আলী আমজাদের দিকে মুখ ফিরাতেই সে বলল, তোমার কথা তো আমি রাখলাম তাইলে তুমিও আমার একখান কথা রাখো।
নূরজাহান অবাক হল। কী কথা?
আমার লগে এক জাগায় যাওন লাগবো। লও।
সড়ক যেখানে শেষ হয়েছে, যেখান থেকে মাটি ফেলে ফেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সড়ক তার থেকে খানিক দূরে সড়কের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আলী আমজাদের মোটর সাইকেল। যেন সড়কটা আলী আমজাদের বাপের সম্পত্তি। সড়কের মাঝখান ছাড়া মোটর সাইকেল সে রাখেই না। লোক চলাচল পুরা মাত্রায় শুরু না হলেও চারপাশের গ্রামের কিছু না কিছু লোক এরমধ্যেই সড়ক ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সড়কের মাঝখানে মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে রাখলে হাঁটাচলায় যে তাদের অসুবিধা হতে পারে ওসব ভাবেই না আলী আমজাদ।
নূরজাহানকে তার লগে যাওয়ার কথা বলেই মোটর সাইকেলটার দিকে তাকাল আলী আমজাদ। নূরজাহান বলল, কই যামু আপনের লগে?
আলী আমজাদ নূরজাহানের দিকে মুখ ফিরাল। হাসি মুখে বলল, আছে একখান জাগা।
কইতে পারেন না কই?
তোমার কি মনে অইতাছে আমি তোমারে খারাপ জাগায় লইয়া যামু!
একথায় নূরজাহান একটু রাগল। খারাপ জাগা ভাল জাগা আবার কী! কই লইয়া যাইবেন হেইডা কন না ক্যা?
রাগি ভঙ্গিতে কথা বলবার সময় খুবই অন্যরকম লাগে নূরজাহানকে। নাকের পাটা একটুখানি ফোলে, চোখ ছোট হয়, ভুরু কুঁচকে অদ্ভুত একটা ভঙ্গি হয় কপালের, সব মিলিয়ে দেখতে অপূর্ব লাগে।
এখনও লাগছিল।
আলী আমজাদ মুগ্ধ চোখে নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই নূরজাহানের ডান গালটা দেখতে পেল লাল হয়ে আছে। মানুষের হাতের পাঁচটা আঙুল যেন ফুটে আছে নূরজাহানের ডানগালে।
আলী আমজাদ আঁতকে উঠল। এমন একটা ভঙ্গি করল মুখের যেন নূরজাহানের গালের এই দাগ দূরজাহানের গালে পড়েনি, পড়েছে তার কলিজায়। পারলে নূরজাহানের গালটা দুইহাতে চেপে ধরে সে এমন দিশাহারা গলায় বলল, কী অইছে?
এইমাত্র হচ্ছিল এক জায়গায় যাওয়ার কথা, সেই কথা শেষ হতে না হতেই হচ্ছে আরেক কথা। তাছাড়া আলী আমজাদের দিশাহারা, ভয় পাওয়া ভাব দেখে, কথা বলবার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কী যেন কী মহা সর্বনাশ হয়ে গেছে তার। এসব দেখে মুখের রাগ উধাও হয়ে গেল নূরজাহানের চোখের দৃষ্টিতে পড়ল দুশ্চিন্তার ছায়া। বলল, কো কী অইছে?
তোমার গালে?
নূরজাহান তার ডানগালে হাত দিল। কী অইছে গালে?
লাল অইয়া রইছে। মনে অয় মাইনষের হাতের পাঁচখান লউং (আঙুল) ফুইট্টা রইছে।
আলী আমজাদের কথায় এতক্ষণের উদ্বিগ্ন ভাব কেটে গেল নূরজাহানের। সে একটু বিরক্তই হল। ইস আপনে যে কেমুন একখান মানুষ! আমার গালে কী অইছে হেইডা লইয়া যে এমুন একখান ভাব করলেন যে জাইত (জাত) সাপে দংসাইছে আপনেরে!
মুখের ভয় পাওয়া ভাব তবু বজায় খল আলী আমজাদ। বলল, করুম না? কও কী? গালডা এমুন অইয়া রইছে তেমার আর হেইডা দেইক্কা আমি কিছু কমু না!
এত কওনের কিছু নাই। এমুন করনেরও কিছু নাই।
আইচ্ছা করলাম না। অহন কও গালে কী অইছে তোমার?
এবার বাবার কথা মনে পড়ল নূরজাহানের। জীবনে প্রথম বাবা আজ তার গায়ে হাত তুলেছে। প্রচণ্ড জোরে থাবড় মেরেছে নূরজাহানের গালে। কথাটা ভেবে গভীর অভিমানে বুক ভরে গেল নূরজাহানের। চোখ ছলছল করে উঠল। চোখের পানি সামলাবার জন্য অন্যদিকে মুখ ফিরাল সে।
আলী আমজাদ বুঝল ব্যাপারটা। একটা সুযোগ নিল। হাত বাড়িয়ে নূরজাহানের একটা হাত ধরল। কী অইছে কও আমারে!
গলার স্বর কাদার মতো, যেন নূরজাহানের কষ্টে মরে যাচ্ছে সে, যেন নূরজাহানের কষ্টে এখনই হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করবে।
আলী আমজাদের এসব কায়দা একদমই পাত্তা দিল না নূরজাহান। আলী আমজাদ তার হাত ধরবার লগে লগে নিজেকে বদলে ফেলেছে সে। চোখের পানি সামলেছে, বুকের ভিতরকার অভিমান চাপা দিয়েছে। প্রথমে রাগি চোখে আলী আমজাদের দিকে তাকাল সে, তারপর ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিল। হাত ছাড়েন।
আলী আমজাদের হাত থেকে ঝটকা মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়েছে নূরজাহান এই দৃশ্য কোনও মাটিয়াল দেখল কী না, দেখে কনটেকদার সাবের অপমানে ভিতরে ভিতরে পুলক বোধ করল কী না বুঝার জন্য মাটিয়ালদের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। তাকিয়ে বেকুব হয়ে গেল। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে হেকমত। কিছু একটা বলবার জন্য যেন অপেক্ষা করতাছে। অনুনয়ের চোখে তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের দিকে।
হেকমতকে দেখেই মাথায় রক্ত লাফিয়ে উঠল আলী আমজাদের। প্রচণ্ড ক্রোধে গর্জে উঠতে যাবে তার আগেই ভয়ার্ত গলায় হেকমত বলল, দেখি নাই সাব, আমি কিছু দেখি নাই। একখান কথা কইতে আইছিলাম। এমুন কোনও দরকারি কথাও না। পরে কইলেও অইবো। যাই গা।
