নূরজাহান বলল, হ।
আলী আমজাদ বিগলিত হয়ে গেল। সত্য কথা কইতাছো তো, না ফাইজলামি করতাছো?
আমি আপনের লগে কোনওদিন ফাইজলামি করি?
করো না!
কবে করছি।
কতদিন করছো!
নূরজাহান মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, একদিনের কথা কন তো! কী ফাইজলামি করছি কন!
কইছিলা না আমার মুকে এমুন পচাগন্দ, আমার বউ আমার লগে থাকে কেমতে!
শুনে নূরজাহান লজ্জা পেয়ে গেল। আড়চোখে একবার মাকুন্দা কাশেমের দিকে তাকাল। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে কাশেম। এদিকে তার মন নাই। তাকিয়ে তাকিয়ে মাটিয়ালদের কাজ দেখছে। সে
নূরজাহান যে কাশেমের দিকে তাকিয়েছে ব্যাপারটি যেন খেয়ালই করল না আলী আমজাদ। আগের মতোই আমোদর গলায় বলল, ওই দিন আমার সোনায় বানদাইন্না দাঁত লইয়া ফাইজলামি করতাছেলা। কইছেলা আমি হাসলে বলে তোমার মনে অয় আমি বেটারি লাগাইয়া হাসতাছি।
শুনে এমন হাসি পেল নূরজাহানের! এক হাতে মুখ চেপে ধরে হাসি সামলাল। বলল, আপনের দিহি বেবাক কথা মনে আছে!
থাকবো না! তোমার কথা আমার মনে না থাইক্কা পারে?
নূরজাহান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, কন কী!
হ। মাইনষে যার কথা বেশি চিন্তা করে তার বেবাক কথা মনে থাকে।
আমার কথা আপনে চিন্তা করেন?
করি।
ক্যান?
পরে একদিন কমুনে। সমায় অইলে কমুনে। অহন তোমার কথা কও। কী বলে কইবা আমারে! কও।
তারপর হঠাৎ করেই মাকুন্দা কাশেমকে তাদের পাশে দেখতে পেল আলী আমজাদ। নূরজাহানকে কিছু একটা বলবার জন্য আগাইয়া আসছে কাশেম। কথাটা আর বলতে পারল না, তার আগেই কুত্তার মতন খাউ খাউ করে উঠল আলী আমজাদ। এই বেডা, তুই এহেনে খাড়ইয়া রইছস ক্যা? চাছ কী!
আলী আমজাদের এরকম খেউক্কানি (খেঁকুড়ে ভাব )দেখে কাশেম থতমত খেল। মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল তার, বলতে পারল না। বলল নূরজাহান। এমুন কইরেন না। হেয় আমার লগেঐ আইছে।
শুনে আলী আমজাদ নরম হল। অ। কীর লেইগা আইছে তোমার লগে?
এমতেঐ।
খাড়ই রইছে ক্যা? যাইতে কও গা।
একটুখানি থেমে থাকল নূরজাহান তারপর বলল, যেই কথা আপনেরে কইতে চাই হেইডা কাশেম কাকার লেইগাঐ।
কাশেম কাকা কেডা?
নূরজাহান হাসল। এই যে হেয়।
মুখে ভারি একটা তাচ্ছিল্যের ভাব করল আলী আমজাদ। মাকুন্দারে তুমি কাকা কও?
কাকা অইলে কমু না?
কেমুন কাকা তোমার?
আপনা না। এক গেরামের মানুষ। আমার বাবারে কয় গাছিদাদা। হের লেইগা আমি কই কাকা।
আতাহরগো বাড়ির গোমস্তারে কও কাকা, শরম করে না তোমার?
কীয়ের শরম!
আড়চোখে কাশেমের দিকে একবার তাকাল আলী আমজাদ। তারপর বলল, শরম যে কীয়ের তুমি বুজবা না।
না বুজলে বুজান।
কাম নাই। কাইশ্যারে লইয়া কী কইবা কও।
আলী আমজাদের কথায় আচরণে বোঝা যাচ্ছিল কাশেমকে নিয়ে কথা বলবে নূরজাহান এটা তার ভাল লাগছে না। সে আশা করেছিল অন্যকিছু। হয়তো এমন কোনও কথা বলবে নূরজাহান যা শুনে অন্যরকম একটা আনন্দ পাবে সে!
নূরজাহান বলল, কাশেম কাকায় অহন আর মাওলানা সাবের বাইত্তে কাম করে না।
আলী আমজাদ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, হেইডা জানি।
কাকারে একটা কাম দেন।
চট করে নূরজাহানের দিকে মুখ ফিরাল আলী আমজাদ। কী?
হ। কাম দেন একখান।
কী কাম?
মাইট্টাল বানাইয়া দেন। মাইট্টাল তো আপনের লাগে।
হ লাগে। মানুষ পাইলেঐ অহন মাইট্টাল বানাই আমি। তয় কাইশ্যারে বানান যাইবো না।
ক্যা?
ও আমার দোস্তের বাড়ির গোমস্তা আছিলো।
আছিলো কী অইছে? অহন তো নাই।
মাওলানা সাবে বাইত্তে থিকা খেদাইয়া দিছে অরে। ঐ বাড়ির খেদাইন্না মানুষ আমি রাকুম না।
ক্যা? রাকলে কী অইবো?
আতাহার গোসা করবো।
আলী আমজাদের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না নূরজাহান। তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নূরজাহানকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসল আলী আমজাদ। যেন নূরজাহানের কথার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে এমন ভঙ্গিতে বলল, তয় তুমি যুদি কও তাইলে কাইশ্যারে আমি রাখুম।
শুনে লাফিয়ে উঠল নূরজাহান। সত্যই রাখবেন।
সত্যই রাখুম।
তয় রাখেন।
তুমি কইলা?
হ।
আলী আমজাদ এবার কাশেমের দিকে তাকাল। ঐ কাইশ্যা, আমার ম্যানাজার হেকমইত্তারে ডাক দে।
কাশেম লগে লগে বলল, দিতাছি।
দূরে, মাটিয়ালদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হেকমতকে চিৎকার করে ডাকল। ম্যানাজার সাব, ও ম্যানাজার সাক্ট এইমিহি আহেন। কনটেকদার সাবে ডাকে।
আলী আমজাদ ডেকেছে শুনে পাগলের মতো ছুটে এল হেকমত। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কন সাব।
নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে আলী আমজাদ বলল, অরে মাইট্টাল বানাইয়া দেও।
কাকে মাটিয়াল বানাতে হবে! নূরজাহানকে! এইটুকু মেয়ে মাটিয়াল হবে কী করে? আজকাল কোনও কোনও এলাকার গরিব মেয়েছেলেরা মাটিয়ালগিরি করে কিন্তু এই এলাকায় তেমন মেয়েছেলে নাই। তাহলে?
হেকমত ভয়ে ভয়ে বলল, কারে?
মুখ ঘুরিয়ে কটমটা চোখে হেকমতের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। বোজ নাই কারে! তুই কী মনে করছস নূরজাহানরে মাইট্টাল বানাইতে কইছি আমি!
শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল নূরজাহান। সেই হাসির শব্দে হেকমত বেকুব হয়ে গেল। এই অবস্থা থেকে তাকে বাঁচাল মাকুন্দা কাশেম। কনটেকদার সাবের কথা আপনে বোজেন নাই ম্যানাজার সাব। নূরজাহানরে না, আমারে মাইট্টাল বানাইতে কইছে।
হেকমত বলল, এইবার বুজছি।
তারপর আলী আমজাদের দিকে তাকাল। কবে থিকা কামে লাগামু সাব
আলী আমজাদ গম্ভীর গলায় বলল, আইজ থিকাঐ।
