মাথাটা কিছুতেই তখন আর সোজা রাখতে পারে না। মাত্র হাঁটতে শিখা শিশুর ভঙ্গিতে শ্বাস টানে, যেন এখনই জানটা বেরিয়ে যাবে তার। ফলে আদিলদিকে দেখলেই মেজাজ বিগড়াইয়া যায় আলী আমজাদের। মাটিভর্তি য়োড়া মাথায় হেঁটে যাওয়া মানুষটার কোকসা বরাবর লাথথি মারতে ইচ্ছা করে। শইল্লে জোরবল নাই, মাইট্টাল অইতে আইছস ক্যা চুতমারানির পো! টেকার সময় তো একটেকা কম নিবি না!
এখনও ঠিক এমন একটা অনুভূতিই হল আলী আমজাদের। য়োড়া মাথায় ভাঙন থেকে উঠে আসছিল আদিলদ্দি, তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। দুই এক কোদাল মাটি বুঝি বেশি ছিল আদিলদ্দির য়োড়ায়। সে হাঁটছিল টলোমলো পায়ে। ঘেটি মটমট করছিল তার, হাঁ করে শ্বাস টানছিল। গায়ের চামড়ার মতো চাদরটা লগেই আছে। চিকন মাজার লগে চাদরটা সে প্যাচিয়ে বেঁধে রেখেছে। একপলক চাদরটার দিকে। তাকিয়ে হেকমতের দিকে মুখ ফিরাল আলী আমজাদ। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, এই চুতমারানির পোরে দেকলেঐ মেজাজ খারাপ অইয়া যায় আমার।
চারদিকের এত মাটিয়ালের মধ্যে কার কথা বলছে আলী আমজাদ ঠিক বুঝতে পারল না হেকমত। ছাতি ধরা হাত বদল করে বলল, কার কথা কন?
ঐ যে আদিলদ্দি না কী নাম! কামাড়গাও বাড়ি। নাম জিগাইলে পুরা নাম কয়। আদিলউদ্দিন।
হ এই বেডার শইল্লে জোরবল নাই।
জোরবল নাই তয় রাকছো ক্যা?
আপনেঐত্তো রাকতে কইলেন!
আলী আমজাদ জানে সেই আদিলদ্দিকে রাখতে বলেছে। তার কথা ছাড়া লোক রাখার সাহস হেকমতের হবে না। রাখলেও কোনও না কোনও ফাঁকে আলী আমজাদকে বলবে, লোকটাকে ডেকে এনে দেখাবে। এমনভাবে তার গুণকীর্তন গাইতে থাকবে যেন অশুরের মতো শক্তি লোকটার গায়ে। একা তিন মানুষের কাজ করবে। এমন মাটিয়াল আর হয় না।
কিন্তু আদিলদ্দিকে সে রাখেনি। আলী আমজাদ রাখার পরও দুই একবার বলবার চেষ্টা করেছে, এমুন ম্যাড়া (রোগা অর্থে) মাইট্টাল দিয়া কাম অইবো না। সেকথা পাত্তা দেয়নি আলী আমজাদ। কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। তোক যত পাও লাগায়া দেও। আদিলদ্দি কমজুরি হউক আর যাই হউক মানুষ তো, কিছু না কিছু মাডি তো উড়াইতে পারবো!
এখন যেন এসব কথা আর মনেই নাই আলী আমজাদের। হেকমতের কথা শুনে অন্যদিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, আমি রাকছিলামনি! কী জানি, মনে নাই।
হেকমত আমতা গলায় বলল, আপনে না রাকতে চাইলে খেদাইয়া দেই।
না থাউক। কাম তাড়াতাড়ি শেষ করন লাগবো। অহন আর মাইট্টাল খেদাইয়া লাব নাই। পারলে আরও ধরো। কামে লাগাও।
তখনই নূরজাহান আর মাকুন্দা কাশেম এসে দাঁড়াল আলী আমজাদ আর হেকমতের সামনে। প্রথমে নূরজাহানকে খেয়াল করেনি আলী আমজাদ, আনমনা চোখে তাকিয়েছিল হযরতদের বাড়ির উঁচু তালগাছটার দিকে। কী কথা বলবার জন্য হেকমতের দিকে তাকিয়েছে, তাকিয়ে নূরজাহানকে দেখে সেই কথা ভুলে গেল। দুই দিকের ঠোঁট যতদূর লম্বা করা যায় করে হাসল। সোনায় বাঁধানো দাঁতখান চকচক করে উঠল। সেই দাঁত দেখে ব্যাটারির কথা মনে হল নূরজাহানের। হাসি পেল। হাসবার আগেই আলী আমজাদ বলল, কই থিকা আইলা নূরজাহান? তোমারে আইজকাইল দেহিই না!
নূরজাহান বলল, একলগে দুইডা কথা জিগাইতেছেন। কয়ডার জব দিমু?
দুইডারঐ দেও।
একটা একটা কইরা দিমু, না একলগে?
আলী আমজাদ আবার আগের মতো হাসল। তুমি বড় রস কইরা কথা কও নূরজাহান। আমার বহুত ভাল্লাগে।
তাইলে আরেকখান কই?
কও।
আপনের গরম বেশি?
কিছু না ভেবে আলী আমজাদ বলল, গরমের দিন গরম বেশি, শীতের দিন শীত বেশি।
এইডা শীতের দিন না?
হ।
তয়?
তয় আবার কী! শীতের দিন দেইক্কাঐত্তো সুটকুট ফিনছি। গলায় মাপলার, পায়ে জুতামুজা। আর এই বছর কেমন শীত পড়ছে দেকতাছ না!
নূরজাহান হাসল। হ দেকতাছি। দেইক্কাঐত্তো জিগাইলাম।
এবার আলী আমজাদ একটু চিন্তিত হল। চোখ সরু করে নূরজাহানের দিকে তাকাল। তুমি মনে অয় আমার লগে ঠাট্টা মশকরা করতাছো?
নূরজাহান কথা বলবার আগেই কাশেম হাসিমুখে করে বলল। হ। আপনের মাথায় ছাতি দেকতাছে তো এর লেইগা এত কথা কইতাছে।
কাশেমের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। কীরে মাকুন্দা, তুই আইলি কই থিকা?
কাশেম লাজুক গলায় বলল, মার লগেঐ আইছি।
আতাহরগ বাইত্তে থিকা তরে বলে খেদাইয়া দিছে? তয় তুই অহন থাকচ কই? কাম করচ কই?
নূরজাহান বলল, এই হগল কথা পরে কইবনে। আগে ছাতিডা বুজান।
আলী আমজাদ হেকমতের দিকে তাকাল। যেন ব্যাপারটা খুবই মজার এমন ভঙ্গি করে বলল, সব সমায় ছাতি ধইরা রাখনের কাম নাই। ছাতিডা বুজাও। ঐ মিহি গিয়া কামকাইজ দেহো। আমার থিকা কামকাইজ দেহন ভালো।
হেকমত আড়চোখে একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল। ভিতরে ভিতরে ক্ষিপ্ত হয়েছে। মুখে হালকা রাগি একটা ভাব। নরম ভঙ্গিতে ছাতা বন্ধ করল, তারপর দ্রুত হেঁটে মাটিয়ালদের ভিড়ে মিশে গেল।
আলী আমজাদ বলল, বোজলা নূরজাহান, ম্যানেজার অইলে কী অইবো, এই হালায় অইলো চাকর বাকরের লাহান। শীতের দিনেও আমার মাথার উপরে ছাতি মেইল্লা রাখে। কও দিহি, তোমার খবরবাৰ্তা কী!
আলী আমজাদের চোখের দিকে তাকিয়ে নূরজাহান বলল, আপনের লগে কথা আছে।
তার লগে কথা আছে নূরজাহানের শুনে অদ্ভুত এক আনন্দে বুকের খুব ভিতরে দোলা লাগল আলী আমজাদের। প্রথমে যেন কথাটা তার বিশ্বাস হল না। হাসিমুখে নূরজাহানের দিকে তাকাল। কী কইলা! আমার লগে তোমার কথা আছে!
