ভিতরে ভিতরে নূরজাহান খুবই অবাক হল। পাশাপাশি হাঁটছে কাশেম, কাশেমের কথা একদম ভুলে গেল। ভাবল চোখ খোলা আছে বলে বাপের মুখটা সে দেখতে পাচ্ছে না, হয়তো বা চোখ বুজলে দেখতে পাবে।
হাঁটতে হাঁটতে চোখ বুজল নূরজাহান। তারপরও দবির গাছির মুখটা সে দেখতে পেল না। হামিদাকে দেখল, তাদের বাড়িটা দেখল, বাড়ির খুটিনাটি সবকিছু দেখল কিন্তু বাড়ির প্রধান মানুষটাকে দেখতে পেলে না।
এটা কেমন করে হচ্ছে! কেন হচ্ছে।
ভিতরে ভিতরে নূরজাহান কেমন দিশাহারা হয়ে গেল! এমন তো কখনও হয়নি তার। আজ কেন হচ্ছে! জীবনে আজ প্রথম বাবা তার গায়ে হাত তুলেছে বলে!
কাশেম বলল, সড়কের কাছে তো আইয়া পড়লা মা, এলা বাইত্তে লও।
নূরজাহানের যেন হঠাৎ খেয়াল হল বাড়ি থেকে অনেকটা দূর চলে এসেছে। বড় সড়কের কাছাকাছি। বেশ কয়েকদিন সড়কের এদিকে আসা হয় না। আজ যখন এসেই পড়েছে একটু দেখে যাবে কতদূর আগালো সড়ক! মাওয়ার ঘাট ধরতে আর কতদিন লাগবো।
কাশেমের দিকে তাকিয়ে খুবই স্বাভাবিক গলায় নূরজাহান বলল, আপনে যান গা, আমি ইট্টু সড়কের মিহি ঘুইরাহি।
কাশেম বিগলিত গলায় বলল, তাইলে আমিও তোমার লগে যাই মা।
ক্যা?
তোমার মা বাপরে কইছি তোমারে বাইত্তে লইয়া যামু, না লইয়া যাই কেমতে?
অন্য সময় হলে এই ধরনের কথা শুনে হাসত নূরজাহান। এখন হাসল না। মুখ ঘুরিয়ে কাশেমের দিকে আর তাকালও না। সড়কের দিকে হাঁটতে লাগল।
১.৪৬-৫০ আলী আমজাদের মাথার উপর ছাতা
১.৪৬
আলী আমজাদের মাথার উপর ছাতা ধরে আছে হেকমত। শীত সকালের রোদে ছাতা জিনিসটার দরকার হয় না। তাও রোদ আটকাবার জন্য। যদি ক্কচিত কখনও গম্ভীর হয়ে নামে কুয়াশা, দুপুর পর্যন্ত সুর্যের মুখ দেখা যায় না, রোদ বলতে কিছু থাকে না, কুয়াশা ফুটা করে আচমকা পড়তে শুরু করে গুঁড়িবৃষ্টি, তখন হয়তো গ্রাম গিরস্তের কেউ কেউ ছাতা মেলে মাথার ওপর। তাও খুব সৌখিন গিরস্ত না হলে না, সচ্ছল আর শীতকাতর গিরস্ত না হলে না। বেশিরভাগ গিরস্তই গায়ের চাদর মেয়েছেলের ঘোমটার মতো করে তুলে দেয় মাথায়। বৃষ্টি আটকায়। কিন্তু শীতের দিনের রোদ আটকাবার জন্য ছাতা দেশ গ্রামের কোনও মানুষ কখনও দেখেনি।
দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে খুব মজা পেল নূরজাহান। ভুলে গেল সকালবেলার ঘটনা। সড়কের অদূরে এসে দাঁড়াল সে। মুখের মজাদার ভঙ্গি করে আলী আমজাদ আর ছাতা ধরা হেকমতের দিকে তাকিয়ে রইল। লগে যে মাকুন্দা কাশেম আছে ভুলে গেল।
সড়কের কাজে মাটিয়াল বেড়েছে ম্যালা। প্রতিদিন অনেকখানি করে আগাচ্ছে সড়ক। এই তো কয়দিন আগে ছিল জাহিদ খাঁর বাড়ির সামনে, আজ এসে গেছে হযরতদের বাড়ির সামনে। দুইদিন পর দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল ছাড়িয়ে কুমারভোগ ধরবে। তারপর মাওয়ার ঘাট।
মাটিয়াল, সড়কের কাজ কোনওটাই খেয়াল করছিল না নূরজাহান। সে তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের দিকে, হেকমতের দিকে। আলী আমজাদ নড়ে তো ছাতা হাতে হেকমতও নড়ে। আলী আমজাদ দুইপা আগায়, তিন পা পিছায় তো হেকমতও আগায় পিছায়। যেন কোনওভাবেই রোদের আঁচ কন্ট্রাক্টর সাহেবের গায়ে না লাগে।
আলী আমজাদ এই ব্যাপারটাকে মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না। কালো রঙের কোটপ্যান্ট পরা। কোটের তলায় সাদা শার্ট। গলায় মাফলার আছে। মাফলারটা বেশ টাইট করে প্যাচিয়ে রেখেছে। পায়ে জুতা। দেখে বুঝা যায় এতকিছু পরে থাকার পরও শীতটা তার আছে।
এই অবস্থায় রোদে থাকতেই তো পছন্দ করে মানুষ, হেকমত তাহলে ছাতা ধরে রেখেছে কেন আলী আমজাদের মাথায়!
অল্প কয়দিনে আলী আমজাদ লোকটা বেশ ফুলেছে। বিশেষ করে পেট। এই এতটা দূর থেকেও পোটকা মাছের মতন পেটখান তার দেখা যাচ্ছে। যেন গরুর ফ্যান খৈল খাওয়ার বিশাল একখান গামলা উপুড় করে পেটের লগে বেঁধে রেখেছে আলী আমজাদ। কথাটা ভেবেই খিলখিল করে হেসে উঠতে চাইল নূরজাহান। কী ভেবে শব্দ করে হাসল না, হাসল নিঃশব্দে। তার সেই হাসি মাকুন্দা কাশেম দেখে ফেলল। দেখে খুবই অবাক হল। হাসো ক্যা মা? কী অইছে?
হাসি বন্ধ করল নূরজাহান। কিছু না।
সড়ক মিহি যাইবা কইলা, যাইতাছ না ক্যা? সড়কের সামনে আইয়া খাড়াইয়া রইল্যা ক্যা?
এমতেঐ।
কনেটেকদার সাবরে দেইক্কা?
ক্যা, হেরে দেইক্কা খাড়ামু ক্যা?
কনটেকদার সাবরে ডরাইতেও পারো।
অবাক হয়ে কাশেমের মুখের দিকে তাকাল সে। কনটেকদার সাবরে আমি ডরামু ক্যা?
কাশেম কাঁচুমাচু গলায় বলল, অনেকেই হেরে ডরায়।
কন কী?
হ।
ক্যা, ডরায় ক্যা?
পয়লা কথা অইলো ম্যালা টেকা পয়সা আছে, তরবাদে আতাহারগো লগে দুস্তি। টেকা আর ক্ষেমতা যার থাকে হেরে মাইনষে এমতেঐ ডরায়।
আমি ডরাই না। লন আমার লগে, দেইখেন নে কনটেকদার সাবের লগে কেমতে কথা কই আমি! হেয় কেমতে কথা কয় আমার লগে।
কাম নাই যাওনের। লও আমরা বাইত্তে যাই গা।
হাঁটতে হাঁটতে নূরজাহান বলল, না।
.
১.৪৭
আদিলদ্দি নামের মাটিয়ালটা একেবারেই ভাঙাচোরা শরীরের, একেবারেই কমজোরি। মাপ মতন ভরা মাটির গোড়া বহন করতেই তার জান বেরিয়ে যায়। কোদাল চালিয়ে চাপ চাপ মাটি কেটে ছোঁড়া ভর্তি করে দেয় যেসব মাটিয়াল, হাতের মাপ তো সব সময় আর ঠিক থাকে না তাদের, মাটি তো আর ধান চাউল না যে ওজন রাখতে হবে কাঁটায় কাঁটায়, দুই এক কোদাল মাটি কমবেশি হতেই পারে কোনও কোনও য়োড়ায়। কম হলে আদিলদ্দির কোনও অসুবিধা নাই, বেশি হলেই মরণ। ঘেটি সোজা করে হাঁটতে পারে না। যেন এখনই হরমাইলের (পাটখড়ি) মতন মট করে ঘেটি ভেঙে যাবে তার।
