আর মাকুন্দা কাশেমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছে উল্টা। চকে নেমে সে কখনও দৌড়ায় না। বাড়ি থেকে তাকে বের হতে হয় গরু নিয়ে। গরুরা হেলেদুলে আয়েশি ভঙ্গিতে চলে। কাশেমও চলে গরুগতিতে। আস্তে ধীরে, উদাস আয়েশি ভঙ্গিতে। হাঁটে তো হাঁটে না, চলে তো চলে না।
দুই মানুষের দুই স্বভাব আজ উল্টাপাল্টা হয়ে গেল। দবির গাছির বাড়ি থেকে বের হয়েই নূরজাহানের পিছু পিছু ছুটতে লাগল কাশেম শরীরে মান্নান মাওলানার মারের ব্যথা, ছুটতে গেলে মচমচ করে উঠে মাজার হাড় এর্সবের কোনও কিছুই এখন মনে নাই কাশেমের, উদিসও পাচ্ছে না। চিৎকার করে নূরজাহানকে ডাকতে লাগল সে। নূরজাহান, ও নূরজাহান, খাড়ও মা খাড়ও আমার কথা হোনো।
নূরজাহান নির্বিকার। একবারও পিছন ফিরে তাকাচ্ছে না, একবারও শুনছে না কাশেমের ডাক। হাঁটছে তো হাঁটছে।
ছুটতে ছুটতে এসে নূরজাহানকে ধরল কাশেম। পিছন থেকে নূরজাহানের ডান হাতটা টেনে ধরে বলল, খাড়ও মা। যাইয়ো না।
নূরজাহান উদাস নির্বিকার ভঙ্গিতে কাশেমের দিকে মুখ ফিরাল। এমন চোখে কাশেমের দিকে তাকিয়ে রইল যেন এই মুখ আজকের আগে কখনও দেখেনি। কাশেম নামে কাউকে চিনে না। লোকমুখে কাশেম যে মাকুন্দা কাশেম জীবনেও যেন সে কথা শোনেনি নূরজাহান।
কাশেম এসব খেয়াল করল না। ছুটতে ছুটতে এসে নূরজাহানকে সে ধরতে পেরেছে এটাই যেন তার জীবনের এক বড়কাজ। কাজটা করতে পেরে সে দারুণ খুশি। যেন দবির গাছির ঋণ খানিকটা হলেও শোধ করতে পারছে। এরকম শীত সকালে দবির তাকে নিজের গায়ের সোয়েটার খুলে দিয়েছে। নিজে খালি গা হয়ে সোয়েটার পরিয়ে কাশেমকে পাঠিয়েছে বাড়িতে। গাছির বউ গুড়মুড়ি খেতে দিয়েছে। এরকম মানুষের মেয়ে বাপের হাতে থাবড় খেয়ে রাগ করে বের হয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে, তাকে ফিরিয়ে আনা কাশেমের কর্তব্য। পোলাপান মানুষ রাগ করে কী না কী করে ফেলবে!
হাঁপাতে হাঁপাতে কাশেম বলল, কই যাও মা?
শীতল নির্বিকার গলায় নূরজাহান বলল, কইতে পারি না।
নূরজাহানের কথা বলার ভঙ্গি এমন, ভিতরে ভিতরে কাশেম কী রকম একটু থমকাল। এই কি সেই মেয়েটি, গাছি বাড়ি ফিরবার আগে কাশেমের মুখে তার মার খাওয়ার কথা শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল যে! এই কি সেই মেয়েটি, গরুদের লগে কাশেমের সম্পর্কের কথা শুনে পানির ওপর পানি পড়ার শব্দে হেসেছিল!
ভুরু কুঁচকে চোখে দুই তিনটা পলক ফেলল কাশেম। কাটা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসতে গেল, গিয়েই ঠোঁট কুঁচকাল। শীতের টানে ফসল তুলে নেওয়া চকের মতো শুকনা, কাটা ঠোঁটের কাটা অংশ চড়চড় করে উঠল। বুঝি রক্ত বের হবে। তবু সেদিকে মন দিল না কাশেম। পুরাপুরি হাসতেও পারল না। তবে মুখটা হাসিহাসি করে বলল, কও কী! কই যাও কইতে পারো না মা! থাউক যাওনের কাম নাই। লও বাইত্তে লও।
এবার কাশেমের দিক থেকে মুখ ফিরাল নূরজাহান। না আমি অহন বাইত্তে যামু না।
তয় কই যাইবা?
কইলাম যে কইতে পারি না।
একটু থেমে কাশেম বলল, গোসা করছো মা?
নূরজাহান কাশেমের দিকে তাকাল না। বলল, কার লগে গোসা করুম?
তোমার বাপের লগে।
নূরজাহান কথা বলল না। আগের মতোই আস্তে ধীরে হাঁটতে লাগল। কাশেমও হাঁটতে লাগল তার লগে লগে। হাঁটতে হাঁটতে বলল, মা বাপ থাকলে কত সমায় তারা কিল থাবড় মারে। হেতে কী অয়! আদর যে করে হে তো মারতেও পারে। মা বাপ আছে দেইক্কা মারে। না থাকলে তো আর মারতো না। এই যে আমার মা বাপ নাই, আমারে কেঐ মারে!
কাশেমের দিকে মুখ ফিরাল নূরজাহান। মান্নান মাওলানা মারছে না আপনেরে?
কাশেম থতমত খেল। হ মারছে।
তয়?
ঠোঁট ছড়িয়ে আবার হাসার চেষ্টা করল কাশেম। কাটা জায়গা কেটে রক্ত বের হবার ভয়ে হাসল না। বলল, হের মাইর আর বাপ মার মাইর এক না। বাপ মায় মারে যেমুন। আদরও করে অমুন। দুইডা দুই পদের। তুমি বুজবা না মা।
আমার বোজনের কাম নাই। আপনে যান।
কই যামু।
কই যাইবেন আমি কেমতে কমু?
আমার তো যাওনের জাগা নাই। গাছি দাদায় কইলো তোমগো বাইত্তে যাইতে, গেছি।
তয় আবার যান।
কই?
আমগো বাইত্তে।
হ তোমগো বাইত্তেই যামু। তয় তোমারে না লইয়া যামু না। তোমারে না লইয়া গেলে তোমার বাপরে আমি কী জব দিমু
এতক্ষণ ধরে কাশেমের মুখে বাপ কথাটা শুনছে, আর মানুষটা তার এত প্রিয়, জন্মের পর থেকে একটা দিনও যাকে না দেখে থাকেনি নূরজাহান, আজ এই প্রথমবার সেই মানুষের কথা শুনতে ভাল লাগছে না নূরজাহানের। কোনও রাগ ঘৃণা যে হচ্ছে বাপের ওপর তাও না। কেমন যেন একটা অবস্থা। যেন এই মানুষটা থাকলেও যা না থাকলেও তাই। আছে তো আছে, নাই তো নাই।
সংসারের প্রিয় মানুষরা সবসময় চোখ জুড়ে থাকে মানুষের। দূরে কোথাও চলে গেলে, চোখ বুজে, খুলে সেই মানুষটাকে দেখতে পায় মানুষ। মানুষটার মুখখানা দেখতে পায়। দুনিয়াতে বাপের চেয়ে প্রিয় কোনও মানুষ নাই নূরজাহানের। প্রিয় কোনও মুখ নাই। বাপ যতক্ষণ বাড়িতে না থাকে, বাপের কথা ভাবলেই চোখের সামনে মানুষটাকে দেখতে পায় নূরজাহান। তার হাঁটাচলার ভঙ্গি, কথা বলা আর কাজ করবার ভঙ্গি, হাসিহাসি মুখ দেখতে পায়। আজ জীবনে প্রথম, কাশেমের মুখে বার বার শুনছে বাপের কথা, তাকে নূরজাহান দেখতে পাচ্ছে না। না তার হাঁটাচলা, না তার কাজকর্মের ভঙ্গি, না তার শোয়া খাওয়া, না তার মুখ।
