হামিদা বলল, কথা কচ না ক্যা?
দবির বলল, কী কইবো! আর মোক দেহো না! মোক দেকলে বুজা যায় মাওলানা সাবরে রাজাকার ও কইছে। মাওলানা সাবে মিছাকথা কয় নাই।
কাশেম বলল, আমার মনে অয় মিছাকথাই কইছে মাওলানা সাবে। মাওলানা অইলে কী অইবো, বহুত মিছাকথা কয় হেয়। মিছাকথা কইয়া উল্টাসিদা তোমারে বুজাইয়া দিছে যাতে রসের দামডা না দিতে অয়। বহুত বদ মানুষ হেয়। নিজের ভালর লেইগা যা মনে অয় হেইডা করতে পারে। বকাবাজ্জি তো আছেঐ মাইর ধইরও দিতে পারে মাইনষেরে।
মান্নান মাওলানার ঘেটি ধাক্কার কথাটা মনে পড়ল দবিরের। এতটা অপমান জীবনে সে কখনও হয়েছে বলে মনে পড়ে না। চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরেছে। এখন আর কান্না পাচ্ছে না। কী রকম এক ক্রোধে বুক জ্বলে যাচ্ছে। এই ক্রোধই কি নূরজাহানের ওপর ঝাড়ল সে!
কাশেমের কথা শুনে মনে হচ্ছে নূরজাহান তাকে রাজাকার বলেছে কথাটা ঠিক বলেনি মান্নান মাওলানা। মেয়েটার ওপর দোষ চাপিয়ে রসের দাম না দেওয়ার অজুহাত তৈরি করেছে। এতকাল ধরে মান্নান মাওলানার বাড়ির গোমস্তা কাশেম, কাশেমের চেয়ে মান্নান মাওলানাকে আর বেশি কে চিনে! তবু ব্যাপারটা দবিরের জানতে হবে। কথাটা নূরজাহান বলেছে কিনা জানতে হবে। বলে থাকলে নূরজাহান তা স্বীকার করবে। মিথ্যা বলবে না।
হামিদার দিকে তাকিয়ে দবির বলল, জিগাও তোমার মাইয়ারে, মাওলানা সাবরে রাজাকার ও কইছে কিনা। মিছাকথা য্যান আমার লগে না কয়। সত্যকথা কইলে কিছু কমু না। মিছাকথা কইলে আবার মারুম।
নূরজাহানের দিকে এগিয়ে গেল হামিদা। কী রে, কইছস?
নূরজাহান কোনও কথা বলল না। কোনওদিকে তাকাল না। পাথরের মতো মুখ তার। চোখ স্থির। সেই চোখে রাগ অভিমান নাকি কান্না কোনটা যে আছে কেউ বুঝতে পারল না। আস্তে ধীরে বারবাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
হামিদা দিশাহারা গলায় বলল, কই যাচ, ও নূরজাহান!
নূরজাহান কথা বলল না, ফিরে তাকাল না। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির নামার দিকে চলে গেল।
হামিদা ব্যস্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকাল। যাও, ধরো মাইয়াডারে।
দবির গম্ভীর গলায় বলল, কাম নাই ধরনের। যেই মিহি ইচ্ছা যাইক গা।
একথায় হামিদা না, হা হা করে উঠল কাশেম। না না এইডা তুমি ঠিক কইলা না গাছি দাদা। রাগ কইরা যদি কোনও মিহি যায়গা মাইয়াডা? আমি দেকতাছি কই যায়! আমি অরে ফিরাইয়া আনি।
পায়ের কাছে পড়ে রইল কাশেমের মুড়ির ডালা, কাশেম সেদিকে ফিরেও তাকাল না, নূরজাহানের পিছু পিছু ছুটতে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা খাস ফেলল দবির। কেন যেন এই দীর্ঘশ্বাসটা একেবারে বুকে এসে লাগল হামিদার। পায়ে পায়ে স্বামীর কাছে এসে দাঁড়াল সে। একটা হাত রাখল স্বামীর কাঁধে। সত্য কইরা কও তো আমারে কী অইছে। কী কইছে মাওলানা সাবে? জিন্দেগিতে কোনওদিন মাইয়ার শইল্লে তুমি হাত উডাও নাই, আইজ উডাইলা! রস বেচা টেকা পাও নাই দেইক্কা নাকি আর কিছু অইছে? কও, আমার কাছে তো দুইন্নাইর কোনও কথা না কও না তুমি! এইডাও কও। মাওলানা সাবে কী তোমারে মারছে?
লগে লগে দুইহাতে হামিদার মাজার কাছটা জড়িয়ে ধরল দবির। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, মারে নাই, মাইরের থিকা বেশি করতাছে। গরদানডার মইদ্যে ঠেলা দিয়া বাইত থিকা নামায় হালায় দিছে। নূরজাহানের মা গো, জীবনে এমুন অপমান কোনওদিন অইনাই।
ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল দবির।
নিজের অজান্তেই দবিরের মাথাটা কখন জড়িয়ে ধরেছে হামিদা। ধরে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে অশুরের মতো মাওলানা প্রচণ্ড জোরে ঘেটি ধাক্কা দিয়ে বাড়ির নামায় ফেলে দিচ্ছে তার স্বামীকে। কী যে অসহায় ভঙ্গিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে মানুষটা, কী যে করুণ ভঙ্গিতে পড়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য সইতে পারে কোনও নারী! হামিদাও পারল না। অসহায় এক দুঃখ বেদনায় বুক ফেটে গেল তার, চোখ ফেটে গেল। গভীর মায়া মমতায় স্বামীর মাথা বুকে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল সে।
.
১.৪৫
বাড়ি থেকে বের হলেই নূরজাহানের মনে হয় স্বাধীনতা। চারদিকে অবারিত শস্যের চকমাঠ, গাছপালা, গ্রাম গিরস্তর ঘরবাড়ি, পুকুর ডোবা মাথার ওপরকার আকাশ, রোদ ছায়া, শীত পরালি কোনও কিছুই চোখে পড়ে না তার, কোনও কিছুই মনে থাকে না। নিজেকে নূরজাহানের মনে হয় দূর আকাশের পাখি আর নয়তো জোয়াইরা পানির উদ্দাম মাছ। যেদিকে ইচ্ছা উড়ে যাবে সে, জল কেটে ছুটে যাবে যেদিকে দুইচোখ যায়। এজন্য বাড়ি থেকে বের হবার পর নূরজাহান কখনও হাঁটে না। নিজের অজান্তেই মানুষ স্বভাব পাখি হয়ে যায়, মাছ হয়ে যায়। নূরজাহান উড়তে থাকে, ছুটতে থাকে।
বাড়ি থেকে চকে নামবার পর প্রথমে একটু দাঁড়ায় নূরজাহান। মুখ তুলে খোলা আকাশের দিকে চায়। আবহমান হাওয়া থেকে বুক ভরে টানে মুক্ত হাওয়া। তারপর আচমকা ছুট। অবস্থাটা এমন যেন বা নূরজাহান ছিল এক খাঁচাবন্দি পাখি। এইমাত্র খাঁচার দুয়ার খুলে দিয়েছে কোনও দয়ালু মানুষ। বাইরের দুনিয়াতে বের হয়েই কিছুক্ষণের জন্য স্বাধীনতার স্বাদ নিচ্ছে সে। তারপর মন চলো, যে দিকে দুইচোখ যায়।
কিন্তু আজ বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্য অবস্থা হল নূরজাহানের। একবারও আকাশের দিকে তাকাল না সে, একবারও বুক ভরে টানল না মুক্ত হাওয়া। নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। যেন দুনিয়ার কোনও কিছুই তার জানা নাই, কোনও বিষয়েই নাই কোনও আগ্রহ। যেন সে এক মৃত মানুষ। হাঁটছে কিন্তু প্রাণ নাই। কোনদিকে যাবে, কার কাছে যাবে কিছুই জানে না।
