লগে লগে ঠাস করে নূরজাহানের গালে একটা থাবড় (চড়) মারল দবির।
বাপের হাতে এমন একখান থাবড় খেয়ে নূরজাহান যে কী রকম থতমত খেল! খানিকক্ষণ বুঝতেই পারল না বাবা তাকে থাবড় মেরেছে, খুব জোরে, ডান গালে। গাল জ্বলে যাচ্ছে, মাথা টলমল করতাছে। চোখের দৃষ্টি একটুখানি ঝাপসা হয়েছে।
তবু এই দৃষ্টি নিয়েই ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মা বাবা যে কেউ মারলেই যে ব্যথা পাওয়া যায়, সেই ব্যথায় যে কাঁদতে হয় নূরজাহানের একবারও তা মনে হল না। এতটা অবাক তের চৌদ্দবছর বয়সের জীবনে সে আর কখনও হয়নি। বাবা তাকে থাবড় মেরেছে এরচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আজকের আগে নূরজাহানের জীবনে কখনও ঘটেনি।
ছেলেবেলা থেকেই পাড়া বেডানোর স্বভাব নূরজাহানের, সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেডানোর স্বভাব। এই স্বভাবের জন্য মায়ের চড়চাপড় কিলগুতা বহুবার খেতে হয়েছে। আর ঠোকনা তো উঠতে বসতেই খেতে হতো। এখনও হয়। মা যখন তার মাথার উকুন মারতে বসে তখন ঠোকনা নূরজানের কপালে বান্ধা। নূরজাহানের স্বভাব হচ্ছে বেশিক্ষণ স্থির হয়ে কোথাও বসতে পারেন না। শালিক পাখির মতো ছটফট করে লাফিয়ে ওঠে, হঠাৎ দৌড় দিতে চায়। উকুন মারার সময় স্থির হয়ে না বসলে কী করে হবে। এজন্য ওইসব সময় ছটফট করে ওঠা লাফিয়ে ওঠা আর আচমকা দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করলেই গাল থুতনিতে ঠোকনাটা তাকে দিবেই মা।
তবে বাবা কখনও মেরেছে এমন স্মৃতি নাই নূরজাহানের। উল্টা মা যখন মেরেছে বাবা তাকে বুক দিয়ে আগলেছে, নূরজাহানকে মারার দায়ে দবির গাছির হাতের কিল থাবড় তরি খেতে হয়েছে হামিদাকে। জন্মের পর থেকে, বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বাবার মুখে একটা কথাই শুনে এসেছে নূরজাহান, মাইয়ারা অইলো ঘরের লক্ষ্মী, বাড়ির লক্ষ্মী। লক্ষ্মীগো শইল্লে কোনওদিন হাত তুলতে অয় না। তাইলে অলক্ষ্মী লাইগ্যা যায় সংসারে। সেই বাবাই আজ হাত তুলল নূরজাহানের গায়ে! কেন, কী করেছে সে?
এসময় ঘাটপার থেকে উঠে আসছিল হামিদা। দুইহাত ভর্তি পাল বাসন হাঁড়ি কড়াই। সেই অবস্থায়ই দেখতে পেয়েছিল স্বামী তার মেয়েকে জোরে থাবড় মেরেছে। দেখে সেও নূরজাহানের চেয়ে কম অবাক হয়নি। এটা কী করে সম্ভব! দবির গাছি থাবড় মেরেছে নূরজাহানকে এরচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা আর কী হতে পারে সংসারে! নূরজাহানের মতো হামিদাও যেন বোবা হয়ে গেল, পাথর হয়ে গেল। থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই হাতে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, দাঁড়িয়ে রইল।
তবে মুড়ির ডালা ফেলে লাফিয়ে উঠল মাকুন্দা কাশেম। হা হা করে উঠল। মারলা ক্যা মাইয়াডারে, মারলা ক্যা গাছি দাদা? কী করছে ও?
দবির কোনও কথা বলল না। থমথমা মুখে ঘরের ওটায় (উঁচু ভিতের ঘরে ওঠার জন্য দরজার সামনে সিঁড়ির মতো যে দুতিনটে থাক থাকে) বসল। না আকাশের দিকে তাকাল, না গাছপালা ঘর দুয়ারের দিকে, না কারও মুখের দিকে। মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু মাটি দেখতে পেল না।
কোনও কোনও সময় এমন হয় মানুষের, যেদিকে তাকায় সেদিককার কোনও কিছুই দেখতে পায় না। তাকিয়ে থাকে ঠিকই, দেখে না।
দবির গাছির অবস্থা এখন তেমন।
মাকুন্দা কশেম এসবের কিছুই বুঝল না। কাটা ঠোঁট সরু করে চুকচুক করে শব্দ করল। মাইয়াডা কী করতাছে কিছু বোজলাম না গাছি দাদা? ক্যান অরে এত জোরে একখান থাবড় মারলা?
দবির এবারও কথা বলল না। আগের মতোই মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
নূরজাহান তখনও স্তব্ধ হয়ে আছে, তাকিয়ে আছে বাপের মুখের দিকে। চোখে পলক পড়ে না তার।
কিন্তু হামিদার স্তব্ধতা ভেঙেছে তখন। হাতের থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই নিয়ে নরম পায়ে রান্নাচালার সামনে এল সে। যেটা যেখানে রাখার নামিয়ে রাখল। তারপর দবিরের সামনে এসে দাঁড়াল। খানিক আগে সম্পূর্ণ নতুন এক ঘটনা ঘটেছে এই সংসারে, যেন সেই ঘটনার কিছুই জানে না হামিদা, যেন সে কিছুই দেখেনি, কিছুই শোনেনি, রস বেচে বাড়ি ফিরে আসার পর স্বামীকে প্রথমে যে কথাটা সে বলে আজও তাই বলল। মুড়ি মিডাই দেই, খাইয়া লও।
মাটির দিক থেকে চোখ তুলল না দবির। অদ্ভুত এক অসহায় গলায় বলল, না।
ক্যা, খাইবা না? খিদা লাগে নাই?
না।
তারপরই ধীরে শান্ত গলায় ঘটনাটা জানতে চাইল হামিদা। কী অইছে তোমার?
হামিদার লগে কাশেমও গলা মিলাল। হ, কী অইছে গাছি দাদা?
দবির চোখ তুলে কাশেমের দিকে তাকাল। উদাস গলায় বলল, হুইন্না আর কী করবি! মুড়ি খা।
হামিদা বলল, মাইয়াডারে যে মারলা?
উদাস এবং নরম দুঃখি ভাব কেটে গেল দবিরের। নূরজাহানের দিকে এক পলক তাকিয়ে রাগী গলায় বলল, অর লেইগা এত শরম পাইতে অইবো ক্যা মাইনষের কাছে? এত কথা হোনতে অইবো ক্যা?
কীয়ের শরম? কী কথা হোনছো?
ও বলে মাওলানা সাবরে রাজাকার কইছে। এর লেইগা যা মুখে আহে তাই আমারে হুনাইয়া দিল মাওলানা সাবে। রসের দাম যা অয় তার অরদেকে নামাইয়া আনলো, তাও টেকা দিল না। বেবাক অর লেইগা।
শুনে হামিদা তাকাল নূরজাহানের দিকে। কীরে সত্যঐ তুই মাওলানা সাবরে রাজাকার কইছস?
এই প্রথম চোখে পলক পড়ল নূরজাহানের। শরীর নড়ল না তার শুধু মুখটা নড়ল। নরম ভঙ্গিতে অন্যদিকে মুখ ফিরাল সে। অদূরে পড়ে আছে তার মুড়ির ডালা। এখনও অর্ধেকের বেশি মুড়ি রয়ে গেছে ডালায়, গুড় রয়ে গেছে বেশির ভাগই। সাহসী ডেকি (মাত্র যুবতী হয়েছে, এই অর্থে) কুকরাটা পায়ে পায়ে এগুচ্ছে নূরজাহানের মুড়ির ডালার দিকে। এখনই ঠোকরে ঠোকরে সাবাড় করবে ডালার মুড়ি। নূরজাহান কেন, উঠানে দাঁড়িয়ে বসে থাকা অন্য মানুষগুলির কেউই তা খেয়াল করল না।
