এইডা কোনও কথা অইলোনি! একজন মানুষরে মাইরা হালাইবো আর বাদা দিলে অইবো বেদ্দপি! অইলে অইবো। অমুন বেদ্দপি করণ খারাপ না।
তয় আমার দুক্কু এইডা না মা। আমার দুক্কু গরুডি।
গরুডি আবার কী করছে?
ঐ বাইত্তে আমি যাইতে পারি না, গরুডিরে দেকতে পারি না, আমার দুক্কু খালি এইডাঐ। মারছেলো নাইলে আরও মারতো তাও যুদি বাইত্তে থাকতে দিতো, গরুডির লগে থাকতে দিতো!
মান্নান মাওলানার বাড়িতে কাল রাতে গরুদের লগে থাকার ঘটনাটা বলল কাশেম। শুনে নূরজাহান স্তব্ধ হয়ে গেল।
গরুদের লেইগা এতো টান! এইটা কেমুন মানুষ!
খুব হাসি পেল নূরজাহানের। কিন্তু হাসল না। চেপে রেখে বলল, আপনে যে রাইত দোফরে ঐ বাইত্তে গিয়া উঠলেন যুদি কেঐ দেইক্কা হালাইতো?
দেকলে বিপদ আছিলো কপালে। আবার মাইর খাওন লাগতো।
এই হগল জাইন্নাও গেলেন?
হ মা গেলাম। গরুডিরে না দেইক্কা অনেকদিন থাকছি আর থাকতে পারতাছিলাম। মাইর খাইলে কিছু অয় না। গরুডিরে না দেকলে মনডা কান্দে। কাইল রাইতে ঘুটঘুইট্টা আন্দারের মইদ্যে যহন গোয়াইল ঘরে গিয়া হানছি (হান্দাইছি, ঢোকা অর্থে), কী কমু মা তোমারে, অমুন আন্দারেও গরুডি আমারে ঠিক চিনলো।
নূরজাহান অবাক হয়ে বলল, কেমনে চিনলো?
কাটা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল কাশেম। শইল্লের গন্দে চিনলো। এহেকজন মাইনষের শইল্লে তো এহেক রকম গন্দ থাকে! চিননের পর গরুডি যে কেমুন করলো আমার লেইগা, কী কমু তোমারে! কোনডায় শইল চাইভা দেয়, কোনডায় শইল্লে মাথা ঘইষ্যা দেয়। ছোড বাছুরডা হারারাইত আমার কুলে হুইয়া ঘুমাইলো। আমার শইল্লে তো কিছু আছিল না, উদলা গাও, গরুডির লগে হারারাইত গোয়াইল ঘরে রইলাম, ইট্টুও শীত করলো না আমার। তয় শীত করতাছে বিয়ানে, গোয়াইল ঘর থিকা বাইর অওনের পর। গাছি দাদায় সুয়াটার না দিলে শীতে মনে অয় আইজ মইরা যাইতাম।
কাশেম আরেক মুঠ মুড়ি দিল মুখে, এক কামড় গুড় নিল।
নূরজাহান বলল, তয় আপনে অহনে কী করবেন? কই থাকবেন, কই খাইবেন?
কাশেম বলল, থাকনের কোনও অসুবিদা নাই। থাকনের জাগা আমার আছে।
কই?
হোনলে তুমি হাসবা।
না হাসুম না, কন।
হুজুরের বাড়ির গোয়াইল ঘরে।
কেমতে থাকবেন? ঐবাইত্তে আপনেরে যাইতে দিবো?
না হেইডা দিবো না। আমি থাকুম অন্য কায়দায়।
কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। মুখে মুড়ি ছিল, চাবাতে ভুলে গেল। কাশেমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আবার হাসল কাশেম। কায়দা কী হোনবা মা? বেবাকতে ঘুমাইয়া যাওনের পর রাইত দুইফরে গিয়া উডুম হুজুরের বাইত্তে। চুপ্পে চুপ্পে গিয়া ঢুকুম গোয়াইল ঘরে। হারারাইত গৰুডির লগে থাইক্কা বিয়াইন্না রাইত্রে, হুজুরে উইট্টা আয়জান দেওনের আগে আগে বাইর অইয়া আমু। হারাদিন অন্য জাগায় কাম করুম রাইত্রে গিয়া থাকুম গরুডির লগে।
গরুর লগে এমতে থাকতে পারেনি মাইনষে গোয়াইল ঘরে থাকতে পারে? গরুর শইল্লের গন্দ, গোবর চনা এই হগলের গন্দ। গরুতে আইম (শ্বাস ফেলা অর্থে) দেয় ঐ আইমের গন্দ, এই হগলের মইদ্যে থাকবেন কেমতে?
আমি থাকতে পারি। মাইনষের থিকা গরুর লগে থাকতে আমার বেশি আরাম। মানুষ শয়তান বদমাইস অয়, ইতর বদজাইত অয়, গরুরা অয় না। গরুরা মাইনষের থিকা ভাল। হোনো মা, আমি যহন গরুডির লগে থাকি, আমার মনে অয় আমি আছি আমার মা বাপের লগে, আমার ভাই বইনের লগে, বউ পোলাপানের লগে। আমার মা বাপের কথা আমার মনে নাই, ভাই বইন আত্মীয় স্বজন কেঐরে আমি দেহি নাই, বউ পোলাপান এই জীবনে আমার অইবো না, তয় অমুন একখান সংসারের কথা চিন্তা করতে আমার বহুত আমদ লাগে। এমুন সংসার অনেক থাকে না মাইনষের, মা বাপ ভাই বইন বউ পোলাপান লইয়া একখান ছোট্ট ঘরের মইদ্যে থাকে বেকতে, গরুডির লগে গোয়াইল ঘরে থাকলে আমার এমুন মনে অয়। কোনও কোনও গরুরে মনে অয় আমার মা বাপ কোনও কোনওডারে মনে হয় ভাই বইন, বাছুড়ডিরে মনে অয় পোলাপান।
মানুষের এই ধরনের কথা কখনও শোনেনি নূরজাহান। গরুর লগে এমন সম্পর্ক হতে পারে মানুষের, জানা ছিল না। খুবই হাসি পাচ্ছিল তার। হাসির চোটে বুক ফেটে যাচ্ছিল। হাসি চাপবার জন্য অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইল।
কাশেম বলল, আর যে গোবর চনার গন্দের কথা কইলা, গরুর শইল্লের গন্দ, আইমের গন্দ, এইডি আমার কাছে গন্দ মনে হয় না। একখান ঘরের মইদ্যে অনেকটি মানুষ থাকলে হেই ঘরের মইদ্যে অনেক পদের গন্দ থাকে না! পোলাপানের ও মুতের গন্দ, মাইনষের উয়াস নিয়াসের (শ্বাস প্রশ্বাসের) গন্দ, গোয়াইল ঘরে থাকলে আমার অমন মনে অয়।
নূরজাহান ঠোঁট টিপে হাসল। মা বাপ মনে অয় গরুডিরে, ভাই বইন, পোলাপান মনে অয়, পোলাপানের মা মনে অয় না কেঐরে? বউ মনে অয় না?
কথাটা শুনে কী রকম লাজুক হয়ে গেল কাশেম। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, শরমের কথা, কী কমু মা তোমারে! মনে অয়, আমার পোলাপানের মাও মনে অয় একটা গরুরে। বউ মনে অয়।
একথা শুনে হাসি আর ধরে রাখতে পারল না নূরজাহান। খিলখিল করে হেসে উঠল। কোনওদিকে না তাকিয়ে পাগলের মতো দুলে দুলে হাসতে লাগল।
তখনই শূন্যতার কাঁধে মৃতের মতো বাড়িতে এসে উঠল দবির। ঘরের ছেমায় ভারটা নামিয়ে রাখল।
প্রথমে বাবার মুখ খেয়াল করেনি নূরজাহান। হাসির তালে ছিল। হাসতে হাসতে বাবার দিকে মুখ ফিরিয়েছে, কাশেমের মুখে শোনা কথা মজা করে বলতে যাবে, বাবার মুখ দেখে থতমত খেল। হাসি বন্ধ হল নূরজাহানের, মুড়ির ডালা ফেলে দবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। কী অইছে বাবা? মুখহান এমুন দেহা যাইতাছে ক্যান তোমার?
