দবির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, মাথা তুলে কিছু একটা বলতে চাইল, মান্নান মাওলানা তেড়ে এলেন। ঘেটে ধরে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিলেন দবিরকে। অহনতরি খাড়াইয়া রইছস?
ধাক্কা খেয়ে খানিকদূর ছিটকে গেল দবির কিন্তু হুমড়ি খেয়ে পড়ল না, নিজেকে সামলাল। এত অপমান কোনওদিন হয় নাই সে। এতটা দুঃখ কোনওদিন পায় নাই। দুঃখে অপমানে বুক ফেটে গেল দবির গাছির, চোখ ফেটে কান্না এল। অতি কষ্টে কান্নাটা আটকাল সে। মাথা নিচু করে খালি ঠিলা চারটা ভারে বসাল তারপর কোনও দিকে না তাকিয়ে ভারটা কাঁধে নিল।
মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে যখন নেমে যাচ্ছে দবির পিছনে তখনও সমানে চিল্লাচ্ছেন মান্নান মাওলানা। বাপ বেডি দুইডাঐ শয়তান। বাপে কয় আমি মানুষ ঠকাই মাইয়ায় কয় রাজাকার। রাজাকার যহন কইছে রাজাকারের কাম আমি কইরা ছাড়ুম। ল্যাংটা কইরা ঐ ছেমড়ির হোগায় (পাছায়) আমি বেতামু। হোগার চামড়া উড়াইয়া হালামু।
দবির গাছির চোখ দিয়ে তখন টপ টপ করে পানি পড়ছে।
.
১.৪৪
চাপা ক্রোধের গলায় নূরজাহান বলল, আপনে কেমুন পুরুষপোলা! আপনেরে যে এমনে মারলো আপনে কিছু কইতে পারলেন না?
নূরজাহানদের উঠানের রোদে বসে আছে কাশেম। সকালেবলার রোদ বেশ চড়েছে এতক্ষণে। কুয়াশা সরে ঝকঝক তকতক করতাছে চারদিক। গাছগাছালির ডালপালায় ঝোপঝাড় এবং ঘরবাড়ির আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা কুয়াশা শীত উধাও হতে শুরু করেছে। গিরস্তবাড়ির লগের ডোবানালা আর পুকুরের পানিতে জমিয়ে বসেছিল যে কুয়াশা রোদের তাপে হালকা ধুমার মতো উড়তে শুরু করেছে তা। গিরস্তবাড়ির বউঝিরা ঘাটলায় বসে মরার মতো ঠাণ্ডা পানিতেই শুরু করেছে দিনের কাজ।
হামিদাও গেছে ঘাটপারে। যাওয়ার আগে পাতলা একখান কথা গায়ে জড়িয়ে উঠানের কোণে রোদ পোহাতে বসা নূরজাহানকে দিয়ে গেছে পোয়াখানেক মুড়ি ধরে এমন ডালার একডালা মুড়ি আর মাঝারি মুচির (ডেলা) খাজুরা গুড়ের অর্ধেকটা। একমুঠ মুড়ি আর এক কামড় গুড় মাত্র মুখে দিয়েছে নূরজাহান তখনই বাড়িতে এসে উঠল কাশেম। হামিদা তখনও ঘাটপার যায়নি। দুইহাতে কায়দা করে ধরা বাসি থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই, মাত্র পা বাড়িয়েছে, উঠানে এসে দাঁড়াল কাশেম। বিগলিত গলায় বলল, গাছি দাদার লগে দেহা অইলো তো, কইলো বাইত যা, তর ভাবীছাবরে কইচ মুড়ি মিডাই দিতে, খাইতে থাক আমি আইতাছি।
হামিদা আর নূরজাহান দুইজনেই তখন সব ভুলে কাশেমকে দেখছে। হামিদা কথা বলবার আগেই নূরজাহান জিজ্ঞাসা করেছে, কী অইছে আপনের চেহারা এমুন ক্যা?
মান্নান মাওলানার হাতে মার খাওয়ার পর থেকে ঘটনাটা অনেককেই বলতে হয়েছে কাশেমের। প্রতিবার বলার সময়ই কেঁদে ফেলেছে সে। নূরজাহানকে বলার সময়ও কাঁদল। সেই কান্না দেখে ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রেগে গেল নূরজাহান, গম্ভীর হয়ে গেল। মুড়ি খাওয়া ভুলে কাশেমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নূরজাহানের মতো হামিদাও তাকিয়ে রইল তারপর হাতে ধরা থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই উঠানে নামিয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে গিয়ে ঢুকল। টিনের খাবদা (বেশি খাবার ধরে। বড় অর্থে) একখান থালার গলা তরি ভর্তি মুড়ি আর নূরজাহানকে যতটা দিয়েছে ততটা গুড় এনে কাশেমের হাত দিল। বহেন, বইয়া খান। আমি ঘাটপার থিকা আহি। তারবাদে হুনুমনে সব।
হামিদা চলে যাওয়ার পরই কথাটা বলল নূরজাহান। শুনে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল কাশেম। কথা বলল না। অতিকষ্টে হাঁ করে একমুঠ মুড়ি মুখে দিল, এক কামড় গুড় নিল। তারপর আনমনা ভঙ্গিতে চাবাতে লাগল।
মুড়ি চাবাতে যে খুব কষ্ট হচ্ছে কাশেমের, কেটে ঝুলে পড়া ঠোঁটে যে ব্যথা হচ্ছে মুখ দেখে যে কেউ তা বুঝতে পারবে। নূরজাহানও পারছিল। ফলে ভিতরের রাগ আরও বেড়ে যাচ্ছিল তার। গুড়মুড়ি খাওয়ার কথা ভুলে বলল, শইল্লে জোরবল নাই আপনের মারলো আর মাইর খাইলেন?
নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে কাশেম বলল, কী করুম মা?
আপনেরে মারলো আপনেও তারে মারতেন!
কও কী, তাইলে তো সব্বনাশ অইয়া যাইতো। হুজুরের পোলা আছে না, আতাহার, ডাকাইত। আমি হুজুরের লগে বেদ্দপি করছি হোনলে জব কইরা হালাইতো আমারে। জব কইরা কচুরি বইন্না (বন অর্থে) পুকুরে ডুবাইয়া রাকতো। দুইন্নাইর কেঐ উদিস পাইতো না। আমার তো কেঐ নাই, কে সমবাত লইতো! তাও অনেকদিন আমারে না দেইকা কেঐ যদি জিগাইতো, কাইশ্যা কো, কইতো কই জানি পলাইয়া গেছে গা, সমবাত নাই।
কাশেমের কথা শুনে নিজেরও একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল নূরজাহানের। একমুঠ মুড়ি মুখে দিল সে। দুইটা কাক আর বাড়ির তিন চারটা কুকরা চড়ছিল উঠানে। দুইটি মানুষকে উঠানে বসে মুড়ি খেতে দেখে ঘুরঘুর করছিল তারা। ডালা থেকে একমুঠ মুড়ি নিয়ে দূরে ছুঁড়ে দিল নূরজাহান। কাক দুইটা লগে লগে উড়ে গেল সেখানে, কুকরাগুলি ছুটে গেল। একবার সেদিকে তাকিয়ে নূরজাহান বলল, না মারতে পারছিলেন মাইর ঠেকাইতেন। খাড়াইয়া খাড়াইয়া মাইর খাইলেন ক্যা?
কাশেম বলল, মাইর ঠেকানোরও উপায় আছিলো না মা। খাড়াইয়া খাড়াইয়া মাইর খাইয়া উপায় আছিলো না। মাইর ঠেকাইলেও বেপি অইতো, দৌড় দিলেও বেদ্দপি অইতো।
কীয়ের বেদ্দপি?
হুজুরে যা করবো হেইডা বাদা দিলেঐ বেদ্দপি।
