দবির উঠে দাঁড়াল। আমরা হুজুর গরিব গরবা মানুষ, অভাবী মানুষ, তয় নিঐত (নিয়ত) খারাপ না। কেরে ঠকাইয়া দুইডা পয়সা খাইতে চাই না। হারাম খাওনের আগে আল্লায় য্যান এই দুইন্নাই থিকা উডাইয়া নেয়।
রস ভর্তি বালতি একটা একটা করে রান্ধনঘরে নিয়ে রাখছে রহিমা। কোন ফাঁকে পানজাবির পকেট থেকে কাঁকুই বের করেছেন মান্নান মাওলানা। এখন আনমনা ভঙিতে দাঁড়ি আচড়াচ্ছেন।
এক পলক তার দিকে তাকিয়ে দবির হাসিমুখে বলল, এত রস দিয়া কী করবেন হুজুরঃ কুড়ুম আইবোনি?
হ মাইয়ারা আইবো, জামাইরা আইবো। নাতি নাতকুররা আইবো। আতাহারের মায় পোনরো সের চাউল ভিজাইছে। কাইল বিয়ালে কাহাইল ছিয়া দিয়া গুঁড়ি (চাউলের গুড়ো) কুইট্টা রাকছে। আইজ হারাদিন পিডা বানাইবো।
কী পিডা? সেঐ কুলঐ? (সেঐ কথাটির মানে সেমাই। চাউলের গুড়ো আটার মতো দলে পিঁড়ি কিংবা পাটায় রেখে হাতের ঘষায় ঘষায় তৈরি করতে হয়। কড়ে আঙুলের সমান লম্বা এবং সামান্য মোটা। পরে রসে ফেলে জ্বাল দিতে হয়। রসের পরিবর্তে গুড় চিনি দিয়েও তৈরি করা যায়। কুলঐ পিঠা হচ্ছে অর্ধচন্দ্রাকারের, ভেতরে নারকেল দিয়ে। মুখ বন্ধ করে রসে ছাড়তে হয়। কুল পিঠাও গুড় চিনি দিয়ে তৈরি করা যায়)
হ। সেঐ কুলঐ তো আছে, চিতও মনে অয় বানাইবো। চাইর পাঁচখান খাজ বাইর করতাছে দেকলাম। খাঁজের পিডাও বানাইবো। (মাটির তৈরি সাচ। চাউলের গুড়ো পানিতে গুলে যেভাবে চিতইপিঠা তৈরি করা হয় ঠিক সেভাবেই সাচে ফেলতে হয়। এ আসলে এক ধরনের চিতইপিঠা।)
ভাল। পিড়া তো মাইনষে শীতের দিনেঐ খায়।
পুবের ঘরের চালা ডিঙিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে উঠানে। কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। যেটুকু আছে সেটুকু উঠে গেছে গাছপালার মাথায়। খানিকপর। উধাও হবে। রোদের ছোঁয়ায় কুয়াশার মতো শীতটাও কাটছে।
মান্নান মাওলানা কয়েক পা হেঁটে রোদে এসে দাঁড়ালেন। দেখে দবির মনে মনে বলল, এত কিছু গায় দিয়াও শীত করে মাইনষের! আর আমি যে খালি গায়!
তারপরই কাশেমের কথা মনে পড়ল। ওইরকম শীতে খালি গায়ে ছিল কাশেম। আশ্চর্য ব্যাপার!
গোয়ালঘরে লুঙ্গি কাছা মেরে কাজ করতাছে একটা লোক। আনমনে সেদিক তাকাল দবির। লোকটাকে চিনতে পারল না। চালাকি করে বলল, কাইশ্যা কো? আথালে দিহি অন্যমানুষ!
হ। কাইশ্যারে খেদাইয়া দিছি। অন্য গোমস্তা রাকছি। চউরা।
নাম কী?
হাফিজদ্দি।
তারপরই হাত কচলাতে কচলাতে আসল কথাটা বলল দবির। দেন হুজুর।
কথাটা যেন বুঝতে পারলেন না মান্নান মাওলানা। বললেন, কী দিমু?
দবির হাসল। রসের দাম দিবেন না?
হ দিমু না? কত দাম অইছে?
দুই টেকা সের। এক মোণ চাইষের। আষ্টাশি টেকা অইছে।
কচ কী! দুই টেকা সের রস আছেনি? একটেকা দেটটেকার বেশি রসের সের অইতে পারে না!
না। আড়াই তিনটেকা সেরও বেচি। আপনের লগে দামাদামি করি না। দুইটেকা সেরঐ দেওন লাগবো।
পাগল অইছস! কয় সের অইছে না অইছে আমি বুজি না, দুইটেকা না দেটটেকা হেইডাও বুজি না, বেবাক মিল্লা পনচাস টেকা পাবি। চাইর পাঁচদিন বাদে আইয়া টেকা লইয়া যাইচ।
শুনে দাবির হাঁ করে থাকে। কথা বলতে পারে না। তারপর হা হা করে ওঠে। কন কী হুজুর! না না, এইডা অইবো না। আষ্টাশির জাগায় আপনে নাইলে আষ্টটেকা কম দেন। এত কম দিলে মইরা যামু আমি।
পনচাস টেকা কম টেকা না। যা বাইত্তে যা, পরে আইয়া লইয়া যাইচ।
না হুজুর পনচাস টেকা আমি নিমু না। এত ঠকান আমারে আপনে ঠকায়েন না।
একথায় মান্নান মাওলানা রেগে গেলেন। ঘেটি ত্যাড়া করে দবির গাছির দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, কী, আমি তরে ঠকাইছি! মান্নান মাওলানা মানুষ ঠকায়! আমার মুখের সামনে খাড়ইয়া এতবড় কথা কইলি! ঐ শুয়োরের বাচ্চা, তর রস তুই লইয়া যা। এই রস আমি রাখুম না। এইরসে আমি মুতি।
দবির কল্পনাও করেনি এইভাবে কথা বলবেন মান্নান মাওলানা। সে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। কাঁচুমাচু গলায় বলল, আমি আপনেরে এইকথা কই নাই হুজুর। আপনে উল্টা বোজছেন।
চুপ কর শালার পো শালা আমি উল্টা বুজছি! উল্টা ভাবদি (সোজা) আমারে বুজাও। তুমি চুতমারানীর পো বহুত খারাপ মানুষ। নিজে যেমুন মাইয়াডাও অমুন বানাইছস। ডাঙ্গর মাইয়া, দিন নাই রাইত নাই যেহেনে ইচ্ছা ওহেনে যায়, যার লগে ইচ্ছা তার লগে রঙ্গরস করে। আমারে কয় রাজাকার। হেইদিনের ছেমড়ি ও রাজাকারের বোজে কী! হ আমি রাজাকার আছিলাম, কী অইছে? আমি অহনও রাজাকার, কী অইছে? আমার একখান পশমও তো কেঐ ছিঁড়তে পারে নাই। কোনওদিন পারবোও না। রাজাকারগো জোরের তরা দেকছস কী! জোর আছে দেইখাই পেসিডেন (প্রেসিডেন্ট) জিয়া রাজাকারগ কিছু করতে পারে নাই, এরশাদ কিছু করতে পারে নাই। উল্টা রাজাকারগো মন্ত্রি মিনিষ্টার বানাইছে।
মান্নান মাওলানার চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম চোখে উঠানে এসেছে আতাহার, বাড়ির বউঝিরা যে যার দুয়ারে দাঁড়িয়েছে, পোলাপান কেউ কেউ এসে জড়ো হয়েছে উঠানে। মান্নান মাওলানা কোনওদিকে তাকালেন না, কোনও কিছু তোয়াক্কা করলেন না। আগের মতোই চিৎকার করে বললেন, পনচাস টেকা দিতে চাইছিলাম অহন এক পয়সাও দিমু না। পারলে তুই আমার কাছ থিকা টেকা আদায় করিচ। যা বাইর অ, বাইর অ আমার বাইত থন।
