তারপরই কাশেমের মার খাওয়া বীভৎস মুখটা দেখতে পেল। দেখে আঁতকে উঠল। কী রে, কী অইছে তর?
লুঙ্গির ভিতরে জবুথুব করে রাখা শরীর টানা দিয়ে দাঁড়াল কাশেম। নাভির কাছে লুঙ্গি বেঁধে বলল, হুজুরে মারছে।
ক্যা?
পরে কমুনে।
অহন কইতে অসুবিদা কী!
কাশেমের গায়ে যে কিছু নাই তারপরই তা দেখতে পেল দবির। দেখে এতই অবাক হল, কাশেমকে যে নির্মমভাবে মেরেছেন মান্নান মাওলানা, মুখচোখ ফাটিয়ে ফেলেছেন, ভুলে গেল। গভীর বিস্ময়ে বলল, খালি গায় ক্যা তুই? এমুন শীতে খালি গায় থাকতে পারেনি মাইনষে! মইরা যাবি তো বেডা!
কাশেম অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, কী করুম। কাপড় চোপড় বেবাকঐ হুজুরের বাইত্তে রইয়া গেছে। আনতে পারি নাই। হুজুরে আমারে মাইরা ধইরা খেদাইয়া দিছে।
অবাক হয়ে কাশেমের মুখের দিকে তাকিয়েছে দবির। জিজ্ঞাসা করেনি কিছু তবু ঘটনা তাকে খুলে বলেছে কাশেম। শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে দবির। দুঃখে মাথা নেড়েছে। আহা রে! কী কমু ক, আমরা গরিব গরবা মানুষ। তারা বড় গিরস্ত, পরহেজগার বান্দা, তারা যুদি এমুন করে, আমগো লাহান মানুষ যায় কই! তুই একখান কাম কর, আমার সুইয়াটারড়া নে। আমি তো বোজা কান্দে দৌড়াই, শীত লাগে না, লাগে গরম। এই দেক ঘাইম্মা গেছি।
ছেঁড়া সোয়েটারখান খুলে কাশেমের হাতে দিয়েছে দবির। এইডা গায় দে। দিয়া আমগো বাইত্তে যা। আমি রস বেইচ্চা আহি তারবাদে কথা কমুনে।
সোয়েটার হাতে কাশেম তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দবিরের দিকে। পানিতে চোখ ভরে গেছে তার। সেই চোখের দিকে চোখ পড়ল না দবিরের। বলল, কী অইলো খাড়ই রইলি ক্যা? সুইয়াটার গায়ে দে, যা।
তবু সোয়েটারটা পরল না কাশেম। চোখের পানি সামলে ধরা গলায় বলল, তোমরা আমারে এত মহব্বত করো ক্যান, ক্যান এত মহব্বত করো! তোমগো মহব্বতের টানে, গরুডির মহব্বতের টানে, এই গেরামের গাছগাছলা, ঘরদুয়ার, আসমানের পাখি পুকুরের মাছ, চকের ফসল, রইদ বাতাস, ক্যান বেবাকতে তোমরা আমারে এত মহব্বত করো? তোমগ মহব্বতের টানেঐত্তো গেরাম ছাইড়া যাইতে পারি না আমি। নাইলে কে আছে আমার এই গেরামে, কও! মা বাপ নাই, ভাই বেরাদর নাই, আততিয় স্বজন নাই। ক্যান এই গেরামে পইরা রইছি আমি।
শেষদিকে কান্না আর ধরে রাখতে পারল না কাশেম। অন্যদিকে তাকিয়ে শব্দ করে কাঁদতে লাগল।
গভীর মমতায় কাশেমের কাঁধে একটা হাত রাখল দবির। এই বলদা, কাঁচ ক্যা? যা আমার বাইত্তে যা। নূরজাহানের মারে কইচ মুড়ি দিবোনে। খা গিয়া। আমি মাওলানা সাবের বাইত্তে যাইতাছি। বেবাক রস বলে আইজ হের লাগবো। দিয়া আইতাছি।
দবিরের দিকে মুখ ফিরাল কাশেম। চোখ মুছতে ভুলে গেল। ভয়ার্ত গলায় বলল, আমার কথা কিছু কইয়ো না হুজুররে। আমার লগে যে তোমার দেহা অইছিলো, আমারে যে তুমি সুয়াটার দিছো, কিচ্ছু কইয়ো না।
দবির কী বুঝল কে জানে, কাশেমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আইচ্ছা কমু না।
.
১.৪৩
মান্নান মাওলানার বাড়ির উঠানে বসে রস মাপছে দবির। ভার নামিয়ে হাতের কাছে রেখেছে রসের ঠিলা। সামনে বড় সাইজের তিনটা বালতি আর একটা এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি।
দবির এই বাড়িতে এসে ওঠার পর বালতি হাঁড়ি এনে তার সামনে রেখেছে রহিমা। হাঁটু ভেঙে বসে বাপায়ের কাছে রসভর্তি ঠিলা রেখে, বাঁহাতে কায়দা করে ঠিলার কানা ধরে পা এবং হাতের ভরে ঠিলাখান কাত করে ডানহাতের একসেরি মাপের টিনের মগে রস ঢালছে। মগ ভর্তি হওয়ার লগে লগে রস ঢেলে দিচ্ছে বালতিতে। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মান্নান মাওলানা। তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে আছেন দবিরের হাতের দিকে। মাপে কম দিচ্ছে কিনা গাছি, খেয়াল করতাছেন। মুখে বিড়বিড়ান একটা ভাব তার। অর্থাৎ কয়সের হল রস গনছেন তিনি।
ঠিক একই ভঙ্গিতে দবিরও গনছিল। ফলে অন্য কোনওদিকেই খেয়াল ছিল না। তার। চারটা ঠিলা খালি করে হাসিমুখে মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল সে। এক মোণ চাইস্বের (চারসের) অইছে হুজুর।
শুনে মান্নান মাওলানা যেন চমকালেন। কচ কী? এক মোণ চাইস্বের?
হ।
একটু থেমে অবাক গলায় দবির বলল, ক্যা আপনে গনেন নাই?
না।
কন কী! আপনে সামনে খাড়ইয়া রইছেন, আমি তো মনে করছি গনতাছেন!
না গনি নাই।
মুখটা চুন হয়ে গেল দবিরের। হতাশ গলায় বলল, তাইলে?
মান্নান মাওলানা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, তাইলে আর কী!
আবার মাইপ্পা দিমু?
আবার মাপনের তো ঝামেলা অনেক।
আপনে কইলে মাপি। আমার ইট্টু কষ্ট অইবো, অউক।
মান্নান মাওলানা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, কাম নাই আর মাপনের। তয় আমার মনে অইতাছে মাপে গরবর অইছে তর। ছয় পাড়ির (বিক্রমপুর অঞ্চলে পাঁচ সেরকে ‘একপাড়ি’ বলা হয়। তবে কথাটা খুব বেশি প্রচলিত নয়) বেশি রস এহেনে অওনের কথা না।
শুনে দবির আকাশ থেকে পড়ল। কন কী হুজুর! তিনডা বালতি পুরা ভরছে। পাতিলাডাও ভরা ভরা। বালতিডি তো বারোসেরির কম না!
আরে না বেডা, আষ্টসেরি বালতি। পাতিলডাও ওই মাপের।
তাইলে হুজুর আমি আরেকবার মাপি। আপনে গনেন।
না থাউক।
থাকবো ক্যা?
আমি তর কথা বিশ্বাস করলাম।
মনের মইদ্যে সন্দ রাইক্কা আমারে আপনের বিশ্বাস করনের কাম নাই।
না সন্দ আর কী! মাপে কম দিলে আল্লার কাছে ঠেকা থাকবি।
এইডা খাডি কথা কইছেন হুজুর। হ, এক মোণ চাইস্বের থিকা একফোডা রস যুদি আপনেরে কম দিয়া থাকি তয় আল্লার কাছে ঠেকা থাকুম। হাসরের দিন এই রসের বিচার অইবো।
