.
১.৪২
সাদা থানের মতো কুয়াশার ভিতর থেকে বের হয়ে আসে একজন মানুষ। কাঁধে একেক পাশে দুইটা করে মাঝারি মাপের ঠিলা বসান ভার। ঠিলাগুলি যে রসে ভরা মানুষটার বেঁকে যাওয়া শরীর দেখে তা বোঝা যায়। গায়ে খয়েরি রঙের হাফহাতা সোয়েটার। বহুকালের পুরানা সোয়েটার। দুইতিন জায়গায় বড় বড় ফুটা। সেই ফুটা দিয়া দেখা যায় সোয়েটারের তলায় আর কিছু পরে নাই সে।
শীতে কাঁপতে কাঁপতে খানিক আগে মান্নান মাওলানার আথাল থেকে বের হয়েছে কাশেম। রাত কেটেছে গরুদের সঙ্গে, সেই বাছুরটাকে কোলে জড়িয়ে। চারদিকে গৰুদের গায়ের উষ্ণতা, কোলের কাছে বাছুরটার উষ্ণতা, রাতেরবেলা শীত একদমই উদিস পায়নি কাশেম। ঘুমিয়েছে কী ঘুমায়নি তাও উদিস পায়নি। রাত কেটে গেছে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে। ভোররাতে, মোরগে বাগ দেওয়ার লগে লগে নড়েচড়ে উঠেছে কাশেম। রাত শেষ হয়ে এল। এখনই ঘরের দুয়ার খুলবেন মান্নান মাওলানা, উঠানে নামবেন। তারপর আথালের দিকে আসবেন। গরুগুলি ঠিকঠাক আছে কিনা দেখবেন। সেই ফাঁকে কাজের ঝি রহিমা রান্নাঘরে ঢুকে পানি গরম করবে। বালতি ভরে গরম পানি এনে রাখবে বারবাড়ির একপাশে অনেকদিন ধরে ফেলে রাখা চাইর কোনাইচ্চা (চৌকো) পাথরটার সামনে। পিতলের একখান বদনাও রাখবে। পাথরের ওপর বসে বদনা ভরে বালতি থেকে গরম পানি তুলে অজু করবেন মান্নান মাওলানা। শীতকালে গরম পানি ছাড়া অজু করেন না তিনি।
অজু শেষ করে সেই পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই পশ্চিমমুখি হবেন। সারাটা শীতকাল গায়ে থাকে তার ফ্লানেল কাপড়ের মোটা পানজাবি। পানজাবির ওপর হাতে বোনা নীল হাফহাতা সোয়েটার। সোয়েটারের ওপর ঘিয়া রঙের আলোয়ান। সেই আলোয়ানে টুপির মতো করে মাথা ঢেকে আজান দিবেন। পায়ে থাকবে মোটা মোজা, কালো রাবারের পাম্পসু। এতসব ভেদ করে শীতের বাবার সাধ্য নাই মাওলানাকে কাবু করে।
এই মানুষটার ভয়েই, মানুষটা দুয়ার খুলবার আগেই আথাল থেকে বের হয়েছিল কাশেম। বের হবার আগে কোলে আদুরে মানব সন্তানের মতো লেপটে থাকা বাছুরটাকে ঠেলে তুলেছে। হাকিহুকি করে বলেছে, ওডো বাজান, ওডো। এলা (এখন) মার কাছে যাও। আমার তো যাওনের সময় অইলো।
ঘুমে চোখ জড়ান শিশুর মতো টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বাছুরটা। কাশেম তাকে ঠেলে দিয়েছে মা গরুটার পেটের কাছে। মার কাছে যাও বাজান।
যেন রাতভর পিতার গলা জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটাকে ভোরবেলা মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিচ্ছে পিতা, ভঙ্গিটা তেমন ছিল কাশেমের। কাশেম তারপর আথালের প্রতিটা গরুর দিকে তাকিয়েছে, প্রতিটা গরুর গায়ে হাত দিয়েছে। আমি তাইলে যাই অহন। বিয়ান অইয়া গেছে। আবার রাইতে আমুনে। দিনে তোমগো লগে আর থাকতে পারুম না আমি। তয় রাইতে আইয়া থাকুম। বেবাকতে ঘুমাইয়া গেলে, চুপ্পে চুপ্পে আমু। তোমগো কাছ থিকা কেঐ সরাইয়া রাকতে পারবো না আমারে।
আথাল থেকে বেরিয়েই বেদম শীত টের পেয়েছিল কাশেম। তার উদাম শরীরের চামড়া যেন ফাটিয়ে দিচ্ছিল শীত। কাশেমের ইচ্ছা করছিল আবার ছুটে যায় আথালে। গরুদের ওমে শীত কাটায়। কিন্তু উপায় নাই। এখনই তার ঘরের দুয়ার খুলবেন মান্নান মাওলানা।
উঠানের মাটি ছিল পুকুরের তলার পানির মতন ঠাণ্ডা। রাতভর ওস (শিশির) শুষে ঠাণ্ডা হয়েছে। কিন্তু এই ঠান্ডা গায়ে লাগল না কাশেমের। লুঙ্গি খুলে কোনও রকমে কান পর্যন্ত ঢাকল সে। দ্রুত হেঁটে বাড়ি থেকে নামল।
বাড়ির লগের রাস্তা সবুজ দূর্বাঘাসে ভরা। ওস পড়ে বৃষ্টিতে ভিজার মতো ভিজেছে ঘাসড়গা। সেই ঘাসে পা ফেলার লগে লগে পায়ের তলার শীতটাও টের পেল কাশেম। হি হি করে কাঁপতে লাগল, দাঁতে দাঁত লেগে খটখট করে শব্দ হতে লাগল তার।
এই শীত থেকে কেমন করে এখন নিজেকে বাঁচাবে কাশেম! লুঙ্গি কাছা মেরে চক পাথালে দৌড় শুরু করবে নাকি। দৌড়ালে শীত বলে কিছু থাকবে না।
নাকি যেভাবে আছে সেভাবে থেকেই যত জোরে সম্ভব হাঁটতে শুরু করবে। জোরে হাঁটলেও শীত কমে।
কাশেম তারপর হাঁটতে শুরু করেছিল।
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় মনে হয়েছে গরুগুলি কে নিয়া যায় চকে, একটু দেখা দরকার। নুতন গোমস্তা রেখেছেন নাকি মান্নান মাওলানা! নাকি নিজেরাই নিয়া যাচ্ছেন! নিজেরা নিয়া গেলে কে নিয়া যায়! মাওলানা সাহেব নিজে নাকি আতাহার! কিন্তু আতাহারের যা স্বভাব চরিত্র, শীতের দিনে বেলা অনেকখানি না উঠলে ঘুমই ভাঙে না তার। আর গরু নিয়ে চকে মরে গেলেও সে যাবে না!
তাহলে কি মাওলানা সাহেব নিজেই নিয়া যাচ্ছেন? গোমস্তা রাখলে কাকে রেখেছেন। মেদিনীমণ্ডলের কাউকে নাকি অন্য গ্রামের অচেনা কোনও লোককে
এসব ভেবে মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনে থেকে ফকির বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যাচ্ছিল কাশেম আর ফিরে আসছিল। এই ফাঁকে শীতটাও এক সময় কজা হয়েছে, সময়টাও কেটেছে। খান বাড়ির মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এসেছে, মান্নান মাওলানার বাড়িতে জেগে উঠেছে মানুষজন। মান্নান মাওলানা যখন আজান দিচ্ছেন তখন বেপারি বাড়ির সামনে ছিল কাশেম। দ্রুত হেঁটে কাশবনের দিকে যাচ্ছিল তখনই কুয়াশা ভেঙে বের হয়ে এল ভার কাঁধে মানুষটা। পলকেই তাকে চিনতে পারল কাশেম। দবির গাছি।
দবিরও ততক্ষণে চিনে ফেলেছে কাশেমকে বেশ খানিকদূর হাঁটার পর এমনিতেই কোথাও না কোথাও ভার নামাতে হয় তাকে, জিরাতে হয়। কাশেমকে দেখে এই সুযোগটা নিল সে। অতিযত্নে রাস্তার মাঝখানে নামাল কাঁধের ভার। এই শীতেও ঘেমে গেছে সে। উপুড় হয়ে লুঙ্গির খুঁটে মুখ মুছে কাশেমের দিকে তাকিয়ে হাসল, কী রে কাশেম, কই যাচ এত বিয়ানে?
