হন হন করে হেঁটে মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল কাশেম। বাড়ির ঘর দুয়ারে তখন কুপিবাতি জ্বলছে, এইঘর ওইঘর করতাছে লোকজন, এই অবস্থায় কিছুতেই বাড়িতে ওঠার সাহস হয় নাই কাশেমের। সে গিয়ে বসেছিল পথপাশের কাশবনে।
জায়গাটা বেপারীদের পুকুরপারে। পার জুড়ে ঘন কাশ জন্মেছে। পাশ দিয়ে চলে গেছে সরু একটা পথ। কয়দিন হল এমন সাদা হয়েছে কাশফুল, অন্ধকারেও ফকফক করে। জায়গাটায় শীত যেন আরও বেশি। জবুথুবু হয়ে বসেই হি হি করে কাঁপতে লাগল কাশেম। লুঙ্গি খুলে কান পর্যন্ত শরীর ঢুকিয়ে দিল লুঙ্গির ভিতর, দিয়ে তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে রইল মান্নান মাওলানার বাড়ির দিকে। কখন ঘরের দুয়ার বন্ধ হবে বাড়ির, কখন নিভবে কুপিবাতি, কখন কাশেম গিয়ে উঠবে বাড়িতে, কখন অন্ধকারে হাত রাখবে গরুগুলির গায়ে। তার স্পর্শে, গায়ের গন্ধে গরুরা টের পাবে তাদের প্রিয়তম জীবটি তাদের টানে ফিরে এসেছে।
সেই যে দুপুরবেলা খেয়েছিল তারপর পেটে আর কিছু পড়ে নাই কাশেমের, তবু ক্ষুধা বলতে কিছু টের পাচ্ছিল না সে। মন জুড়ে শুধু গরুদের কথা, কখন ছুঁয়ে দেখবে গরুদের, শরীর জুড়ে শুধু সেই উত্তেজনা। উত্তেজনায় উত্তেজনায় সময় কেটে গেছে। রাত হয়েছে গভীর। কাশবন থেকে বেরিয়েছে কাশেম। দ্রুত হেঁটে বাড়িতে উঠেছে। নাড়ার পালার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। তিনদিন হল বাড়ি ছাড়া সে, মনে হল তিনদিন না যেন বহু বহুদিন পর বাড়ি ফিরল সে, বহু বহুদিন পর নাড়ার পালাটা দেখতে পেল। বহুদিন পর দেখা হলে আপনজনকে যেমন করে ছোঁয় মানুষ ঠিক তেমন করে, গভীর মায়াবি হাতে নাড়ার পালাটা একটু ছুঁয়ে দিল কাশেম। তারপর আথালের সামনে এসে দাঁড়াল।
রাবের মতন অন্ধকারে ডুবে আছে চারদিক। তারার আলোয়ই যেটুকু যা চোখে পড়ে। আর মানুষের চোখের আছে এক আশ্চর্য ক্ষমতা। দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকলে, অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে আবছা মতন হলেও কিছু না কিছু সেই চোখ দেখতে পায়। কাশেমও পাচ্ছিল। আথালের সামনে দাঁড়িয়ে যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল গরুগুলির কোনওটা দাঁড়িয়ে কোনওটা বসে। কোনওটা জাবর কাটছে, কোনওটা ঝিমাচ্ছে, কোনওটা বা গভীর ঘুমে। লেজ পিটিয়ে মশা তাড়াচ্ছে কোনও কোনওটা। আহা রে, মশায় বুঝি খেয়ে শেষ করতাছে গরুগুলিকে! ওই তো ধূলিটাকে আবছা মতন দেখা যায় অবিরাম লেজ পিটাচ্ছে নিজের পেটে পিঠে। এই গরুটা একটু বেশি আরামপ্রিয়। মশার একটি কামড়ও সহ্য করতে পারে না। সারারাত দাঁড়িয়ে থাকে, সারারাত ছটফট করে।
ধলির দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই লুঙ্গি কাছা মারল কাশেম। যেন এখনই ধুপ জ্বালবে, আথালের চারদিকে ধুপদানী হাতে চক্কর দিবে। ধুপের ধুমায় বেদিশা হয়ে যে দিকে পারে চম্পট দিবে মশারদল।
কিন্তু এই রাত দুপুরে ধুপ কাশেম কোথায় পাবে! সন্ধ্যার পর থেকে বারবার সে কেন ভুলে যাচ্ছে সে এখন আর এই বাড়ির কেউ না। তার জায়গায় নিশ্চয় অন্য গোমস্তা এসেছে বাড়িতে। গরুগুলি এখন সেই গোমস্তার অধীনে। তার সঙ্গে মাঠে যায়, তার সঙ্গে ফিরে আসে। মাঠে যাওয়ার সময়, ফিরার সময় এমন কি বাড়িতে এসেও গুরুগুলি হয়তো কাশেমকে খোঁজে। মুখে ভাষা নাই বলে কথা বলতে পারে না। অবলা চোখে চারদিক তাকিয়ে খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে কাশেমের কথা একদিন ভুলে যাবে তারা। নুতন গোমস্তাকে ভালবাসতে শুরু করবে। দুনিয়ার নিয়মই তো এই, চোখের আড়াল থেকে মনের আড়াল। মানুষই মানুষকে মনে রাখে না আর এ তো গরু!
এসব ভেবে চোখ ভরে পানি এল কাশেমের। ধীর পায়ে হেঁটে আথালে ঢুকল সে। লগে লগে বসে থাকা গরুগুলি উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে থাকাগুলি কান লটরপটর করে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল। দুইটা ছাড়া বাছুরের একটা গিয়ে মায়ের পেট ঘেঁষে দাঁড়াল। মা গাইটা লেজ সামান্য উঁচু করে চন চন শব্দে চনাতে লাগল (পেশাব করা)। কাশেম বুঝল অন্ধকারে গরুগুলি তাকে চিনতে পারেনি। গরুচোর ভেবে সচেতন হয়েছে।
দুইহাত দুইটা গরুর পিঠে রাখল কাশেম। গভীর মায়াবি গলায় ফিসফিস করে বলল, আমারে তোমরা চিনতে পার নাই? আমি কাশেম। মাকুন্দা কাশেম।
কাশেমের এই হাকিকি যেন পরিষ্কার বুঝতে পারল গরুগুলি। কী রকম একটা আনন্দের সাড়া পড়ে গেল তাদের মধ্যে। কান লতপত করে, লেজ নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। মায়ের পেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ান বাছুরটা হঠাৎই তিড়িং করে একটা লাফ দিল, তারপর কাশেমের কাছে ছুটে এল। কাশেমের পেট বরাবর মাথা ঘষতে লাগল। যেন বা মায়ের মতোই আপন আরেকজনকে পেয়েছে সে। বাছুরটার আচরণে জীবনে এই প্রথম কাশেমের মনে হল বাছুরটা গরুর না, এ আসলে এক মানব সন্তান। যেন বা কাশেমের ঔরসেই জন্মেছে। বহুকাল দেখেনি পিতাকে। আজ কাছে পেয়ে আল্লাদে আটখানা হয়েছে।
দুইহাতে বাছুরটার গলা জড়িয়ে ধরে আথালের ভিতর বসে পড়ল কাশেম। আথালের মাটি মাখামাখি হয়ে আছে চনায়, গোবরে। চারদিকে বিন বিন করতাছে মশা। মানুষের উদাম শরীর পেয়ে গরুদের ছেড়ে মানুষটার ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা। যে যেদিক দিয়ে পারে রক্ত চুষছে। কিন্তু কাশেমের কোনওদিকে খেয়াল নাই। আপন সন্তানের মতো বাছুরটিকে বুকে জড়িয়ে বসেছে সে। চারদিকে দাঁড়ান গরুরা সরে গিয়ে তার বসার জায়গা করে দিয়েছে। কাশেমের পেটে বুকে যেমন আল্লাদে মুখমাথা ঘষছে বাছুরটা ঠিক তেমন করেই বাছুরটার মাথায় মুখ ঘষতে লাগল কাশেম। ফিসফিস করে বলতে লাগল, ওরে আমার সোনারে, ওরে আমার মানিকরে, এত রাইত অইছে ঘুম আহে না তোমার! ক্যান ঘুম আহে না বাজান! ঘুমাও, আমার কুলে হুইয়া তুমি ঘুমাও। আমি তোমার মাথা দোয়াইয়া (হাত বুলিয়ে দেয়া) দিমুনে, পিঠ দোয়াইয়া দিমুনে। একটা মোশায়ও তোমারে কামড় দিতে পারব না। বেবাক মশা আমি খেদাইয়া দিমু নে।
