কও কী?
হ। আমি বুজছিলাম কাইশ্যা আইজ রাইত্রে এই বাইত্তে থাকবো।
কেমতে বোজলা?
হেইডা আপনেরে কইতে পারুম না। যান কাইশ্যারে ডাইক্কা লইয়াহেন।
কয়েক পলক কুট্টির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল আলফু। তারপর উঠল। পশ্চিম দক্ষিণের ভিটার ঘরের কোণায় এসে ডাকল, কাইশ্যা, ঐ কাইশ্যা, এইমিহি আয়।
দুইবার তিনবার ডাকল আলফু। কিন্তু চালতাতলা থেকে কেউ সাড়া দিল না।
১.৪১-৪৫ গভীর রাতে মান্নান মাওলানার বাড়িতে
১.৪১
গভীর রাতে মান্নান মাওলানার বাড়িতে এসে উঠল কাশেম। সন্ধ্যাবেলা মিয়াবাড়ির চালতাতলায় বসে অন্ধকার শীত আর মশার কামড় ভুলে গরুগুলির কথা ভেবে আকুল হয়ে কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল বাড়ি থেকে তাকে বের করে দিয়েছেন মান্নান মাওলানা। বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখলে কঠিন মাইর আছে কপালে। নিজের অজান্তেই চালতাতলা থেকে তারপর উঠেছিল কাশেম। তখনও চোখ ভেসে যাচ্ছে কাশেমের, গাল ভেসে যাচ্ছে। এক ফাঁকে হাঁটু তরি মুখ নামিয়ে লুঙ্গি দিয়ে চোখ মুছেছে। তারপর বাড়ির পিছন দিক দিয়া গিয়া উঠছে মেন্দাবাড়িতে। সেই বাড়ির উপর দিয়া গিয়া নামছে উত্তরের চকে। চক তখন থই থই করতাছে অন্ধকারে। চারদিকের ছড়ান ছিটান গিরস্ত বাড়ির ঘর দুয়ারে জ্বলছে কুপিবাতি। রান্ধনঘর, উঠানের কাজ শেষ করে রাতের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন চলছে কোনও কোনও বাড়িতে। যে বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়ে তারা কুপি, হারিকেনের আলোয় পড়তে বসেছে। কোনও কোনও আয়েশি গিরস্ত ঘরের ছেমায় বসে তামাক খাচ্ছে। গল্পগুজব করতাছে কেউ কেউ। সড়কের দিকে মাটিয়ালদের চিল্লাচিল্লির আওয়াজ পাওয়া যায়। দিন কয়েক হল তোড়জোড় বেড়ে গেছে কাজের। প্রেসিডেন্ট এরশাদ নাকি বলেছেন, তিন চার মাসের মধ্যে মাওয়ার ঘাট পর্যন্ত রাস্তা হতেই হবে। শুনে কন্ট্রাক্টরদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। নাওয়া খাওয়া ভুলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। একদিকে মাটির কাজ হচ্ছে, আরেক দিকে হচ্ছে ইট বিছানোর কাজ, আরেক দিকে হচ্ছে পিচ, পাথরের কাজ। শ্রীনগর পর্যন্ত পাকা হয়ে গেছে রাস্তা। কোলাপাড়া পর্যন্ত ইট বিছানো শেষ। এসব দেখে আলী আমজাদের গেছে মাথা খারাপ হয়ে। হ্যাঁজাক জ্বালিয়ে সারারাত কাজ করাচ্ছে সে। দিনের পর দিন বাড়িতে যায় না। ছাপড়া ঘরে থাকে। নাওয়া খাওয়া এখানেই। যদিও ম্যানেজার হেকমত আছে তবু নিজেও দেখাশোনাটা সে করতাছে। মাঝে একটু ঢিলা দিয়েছিল কাজে, এখন আর সেই ঢিলামি নাই। জাহিদ খাঁর বাড়ি ছাড়িয়ে বেশ অনেকদূর আগিয়েছে সড়ক কিন্তু ঘর আগায় নাই। যেখানে ছিল সেখানেই আছে। এইসব ঘর। সাধারণত কন্ট্রাক্টরদের কাজের লগে লগে আগায়। বেডা, চাল দরজা জানালা এমন কি খুটাখুটিও আলগা থাকে। আট দশজন মানুষ হলে যখন তখন সরিয়ে নেওয়া যায় পুরা ঘর। দিনে দিনেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে উঠে যায়। ব্যাপারটি এত সহজ হওয়ার পরও আলী আমজাদ যে কেন সরায় নাই ঘরটা! নিজে কষ্ট করতাছে, বেশ খানিকদূর আগিয়ে যাওয়া সড়ক ধরে হেঁটে আর নয়তো মোটর সাইকেলে চড়ে ফিরে ফিরে আসছে এই ঘরে! কেন, কোন গোপন টানে, কে জানে!
অন্ধকারে ডুবা উত্তরের চক থেকে হাজামবাড়ির দিকে একবার তাকিয়েছিল কাশেম। তাকিয়ে গাছপালা, ঘর দুয়ারের ফাঁক ফোকর দিয়ে সড়কের ওদিকটা দেখতে পেয়েছিল। হ্যাঁজাকের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে। মাটি ভর্তি ছোঁড়া মাথায় ভাঙন থেকে সার ধরে সড়কে উঠছে মাটিয়ালরা, মোড়া খালি করে সার ধরে নেমে যাচ্ছে। ঠিক তখনই হু হু করে আসছিল উত্তরের হাওয়া। সেই হাওয়ায় তীব্র শীতে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল কাশেমের উদাম গা। মনে পড়েছিল সবকথা। আলফুকে বলা আসা হল না। কী ভাববে সে! যে মানুষটা চুরি করে নিজের ভাগ থেকে এমন করে ভাত খাওয়াল, দুইদিনের অনাহারী পেট ভরল যার ভাতে, কুট্টির কাছে ধরা পড়েও যে একদমই ঘাবড়াতে দিল না কাশেমকে, বলল কথা শুনতে হলে সে শুনবে, কাশেমের কী, সে কেন পেট ভরে খাচ্ছে না, সে কেন ভয় পায়! সেই মানুষকে না বলে এমন করে কেন পালিয়ে এল কাশেম! যে মানুষ গেল তার জন্য রাতের ভাত জোগাড় করতে, আরামছে ঘুমাবার ব্যবস্থা করতে সেই মানুষকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে কাশেম কি না পলালো!
চকের চষা অচষা জমি থেকে, বড়কলুই ছোটকলুই (মটুরশুঁটি। দুই ধরনের হয়। বড় এবং ছোট। বড়গুলোকে বলে বড়কলুই ছোটগুলোকে ছোটকলুই। শুকিয়ে যাঁতায় ভাঙিয়ে ডাল করা হয়। বিক্রমপুর অঞ্চলে বলে কলুইয়ের ডাইল। কলুই শাক বেশ আগ্রহ করে খায় লোকে। গরু ছাগলের খাদ্য হিসেবেও কাজে লাগে) আর সউষ্যার সদ্য গজান চারায় তখন অন্ধকারে ঝরছিল শিশির। উত্তরের হাওয়ার লগে পাল্লা দিয়া শস্যচারা আর ঘাসের আড়াল সরিয়ে মাটি থেকে উঠছিল আশ্চর্য এক শীতলতা। গ্রাম প্রান্তরের উপর পড়েছে কুয়াশা। আকাশ জুড়ে আছে ঝিকিমিকি তারার মেলা। তারার ক্ষীণ আলোয় অন্ধকারেও আবছা মতন চোখে পড়ে কুয়াশা। এরকম পরিবেশে আলফুর কথা ভেবে পা থেমে গিয়েছিল কাশেমের। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সে। মনে মনে আলফুর উদ্দেশ্যে বলেছিল, দুনিয়াদারির চক্কর আমি বুজি না ভাই। আমি বলদা (বলদ, বোকা অর্থে) মানুষ। মানুষ থুইয়া গরুর লেইগা বেশি টান। তুমি আমারে মাপ কইরা দিও।
