আসলেই জনম দুখি এক মানুষ কাশেম। দুনিয়াতে আপন বলতে কেউ নাই। আছে কয়েকটা গরু, আছে এই গ্রাম। দুইদিন হল গরুদের ছেড়ে আছে সে। কোনদিন যেন গ্রাম ছেড়েও চলে যেতে হয়!
এসব ভেবে অন্ধকার চালতাতলায় বসে গভীর দুঃখ বেদনায় কাঁদতে লাগল কাশেম। চারপাশে মশা বিনবিন করে, উদাম শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে শুষে নেয় রক্ত, কাশেম টের পায় না।
.
১.৪০
আলফু বলল, এতক্ষুণ কী করলা?
বলল এমনভাবে যেন বিরাট এক অধিকার আছে তার কুট্টির ওপর। সেই অধিকারের জোরেই যেন বলল। অন্তত কুট্টি তাই বুঝল। বুঝে বুকের ভিতর দুপুরবেলার মতন অনুভূতিটা আবার হল তার। এক পলক আলফুর দিকে তাকিয়ে নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে বলল, মুশরি (মশারি) টানাইলাম।
হাজ অইতে না অইতেই মুশরি টাঙ্গান লাগে?
লাগে। বড়বুজান অচল মানুষ, তার মোশায় খুব কামড়ায়।
এই বাড়িতে মোশা ইট্টু বেশি।
হ জঙলা বাড়ি তো! চাইরমিহি পুকঐর। পুকঐ ভরা কচুরি। কচুরিবনে মোশা তো থাকবই।
একটু থেমে কুট্টি বলল, কী কইবেন কন?
কোন ফাঁকে কোচড় থেকে বিড়ি বের করে ধরিয়েছে আলফু। কুট্টির কথায় বিড়িতে টান দিল। কেমতে যে কমু হেইডাঐ চিন্তা করতাছি।
আমার কাছে কথা কইতে এত চিন্তা কী আপনের!
আমার লেইগা তোমার যদি কোনও অসুবিদা অয়?
কী অসুবিদা অইব?
এই বাড়ির মানুষরা তো ভাল না। ধরো কাম থিকা ছাড়াইয়া দিলো তোমারে!
কে ছাড়াইয়া দিবো! অহন তো মাজারো বুজানে নাই।
বড়বুজানে তো আছে! হারাদিন বিচনায় পইড়া থাকলে কী অইবো বেবাক মিহি খ্যাল রাখে।
আমি যদি কিছু করি হেয় খ্যাল রাইক্কা কী করবো। বোজবঐত্তো না কিছু।
বোজবো। দেকলা না কইলো আলফু জুয়ান মরদো বেডা, তার লগে এত কী কথা!
একথা শুনে কুট্টি খুব লজ্জা পেল। এক পলক আলফুর দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। ব্যাপারটা খেয়াল করল না আলফু। বলল, আমারে আইজ অন্যমানুষ মনে অইতাছে না তোমার?
কথাটা বুঝতে পারল না কুট্টি। বলল, ক্যা অন্যমানুষ মনে অইবো ক্যা?
এই যে এত কথা কইতাছি তোমার লগে!
হেতে কী অইছে?
এত কথা কওনের মানুষ তো আমি না! আমি কথা কই কম।
ক্যা কম কন ক্যা?
কথা কম কওনঐ ভাল।
আপনে যত কম কন অত কম কওন ভাল না। এই যে অহন যেমুন কথা কইতাছেন, ভাল লাগতাছে।
তাইলে অহন থিকা এমুন কথাঐ কমু তোমার লগে।
কইয়েন। বাইত্তে মানুষ অইলাম তিনজন। তার মইদ্যে একজন অচল, বুড়া। তার লগে কত প্যাচাইল পাড়ন যায়! আপনে ইট্টু কথাবার্তা কইলে ভাল্লাগে।
কথাটা বলেই আবার লজ্জা পেল কুট্টি।
আলফু তখন কেমন চোখ করে তাকিয়ে আছে কুট্টির দিকে। হাতে বিড়ি জ্বলছে সেদিকে যেন খেয়াল নাই তার। নিঃশব্দে খানিকটা সময় কাটল। তারপর বিড়িতে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল আলফু। বলল, একখান কাম করতে পারবা?
কুট্টি চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল। কী কাম?
উত্তর নাইলে পশ্চিম কোনও ভিটির ঘরের চাবি দিতে পারবা?
কুট্টি অবাক হল। চাবি দিয়া কী করবেন?
ঘর খুলুম। আইজ রাইতটা কাইশ্যা আমার লগে থাকবো।
থাউক। হের লেইগা ঘর খোলতে অইবো ক্যা?
কুট্টির গলা বোধহয় সামান্য উঁচু হয়ে গিয়েছিল। আলফু সাবধানী গলায় বলল, আস্তে কথা কও। বড়বুজানে হোনবো।
কুট্টি হেসে বলল, হোনবো না। ঘুমাইয়া গেছে।
হাজ অইয়া সারলো না, ঘুমাইয়া গেল?
মুশরি টাঙ্গানের পর বুজানে অনেকক্ষুণ ঘুমায়।
একথা শুনে আলফু একটু নড়েচেড়ে বসল। স্বস্তির হাঁপ ছাড়ল। তাইলে ঠিক আছে। বুজানের বিচনার নিচে হাত দিয়া চাবিডা লইয়াহো।
কুট্টি আবার সেই প্রশ্নটা করল। কাইশ্যা থাকবো দেইক্কা ঘর খোলতে অইবো ক্যা?
শীতের দিন না অইলে খোলন লাগতো না। দুইজনে মিল্লা রান্দনঘরে হুইয়া থাকতাম।
অহন আপনে যেহেনে হোন কাইশ্যারেও ওহেনে হোয়ান। আমি তো হুই তুমি যেই বারিন্দায় খাড়ইয়া রইছো এই বারিন্দায়। এহেনে দুইজন হোয়ন যায় না? যায়।
তয়?
দুইজন মানুষ একলগে হুইলে কত সুখ দুঃখের কথা কয়, বড়বুজানে আমগো কথার আওজ পাইলে ঝামেলা অইবো।
হোনবো কেমতে! বারিন্দা আর খাটালের মইদ্যের দুয়ার বন্ধ থাকবো না! দরকার অইলে আস্তে কথা কইবেন আপনেরা।
ধুর অত ইসাব কইরা কথা কওন যায়নি!
কুট্টি খানিক কী ভাবল তারপর বলল, চাবি আপনেরে আমি আইন্না দিতে পারি, বড়বুজানে উদিস পাইবো না, তয় আপনে অন্যঘরে থাকলে ডরে হারা রাইত ঘুমাইতে পারুম না আমি।
আলফু খুবই অবাক হল। ক্যা?
দেশ গেরামে আইজকাইল ডাকাতি অয়। ডাকাইতরা করে কী, বড় গিরস্ত বাড়িতে ঢুইক্কা ঢেকিঘর থিকা ঢেকি উড়াইয়া আইন্না ঢেকি দিয়া পাড়াইয়া দুয়ার ভাইঙ্গা ঘরে ঢোকে।
হেইডা আমি এই ঘরে থাকলেও ঢোকতে পারে?
তাও পুরুষপোলা ঘরে থাকলে সাহস থাকে।
আমি থাকি বারিন্দায়। মইদ্যের দুয়ার বন্দ। খাটালের পালঙ্কে থাকে বড়বুজানে, নিচে থাকো তুমি। এমতে থাকন আর অন্যঘরে থাকন একঐ কথা!
কুট্টি মাথা নিচু করে বলল, না এক কথা না।
তাইলে তুমি অহন কী করতে কও?
কাইশ্যারে লইয়া এই ঘরের বারিন্দায়ঐ থাকেন।
আইচ্ছা।
কাইশ্যা অহন কো?
চাউলতাতলায় বইয়া রইছে।
ডাইক্কা লইয়াহেন। বুজানে ঘুমাইছে এই ফাঁকে খাওন দাওন সাইরা হালান।
রাইত্রে আমি আইজ খামু না। খালি কাইশ্যারে খাওয়াও।
ক্যা?
এমতেঐ।
এমতেঐ না। আমি বুজছি। আপনে মনে করতাছেন একজন বাড়তি মানুষ খাইলে ভাতে টান পড়বো। পড়বো না। কাইশ্যার ভাত আমি রানছি।
