কো?
বারিন্দায়। হারিকল আঙ্গাই।
অয় নাই অহনতরি?
অইছে।
তয়?
একথার জবাব দিল না কুট্টি।
বড়বুজান বললো, কার জানি হাকিহুকি (ফিসফাস) হুনি! কেডা আইছে? কার লগে কথা কচ?
কুড়ি বিরক্ত হল। নতুন মানুষ কে আইবো? কার লগে কথা কমু? আপনে জানেন আপনে আর আমি ছাড়া এই বাইত্তে আর কে থাকে!
হ জানি! আলফু।
তয়?
আলফুর লগে কথা কচ?
হ।
কী কথা?
কুট্টি রাগি গলায় বলল, হেইডা আপনেরে কওন লাগবোনি!
বড়বুজান কাঁচুমাচু গলায় বললেন, চেতচ ক্যা! চেতিচ না বইন। আলফু জুয়ান মরদো বেডা। তুই যুবতী মাইয়া। তগো মইদ্যে এত কথা কওন ভাল না।
একথা শুনে ভারি একটা লজ্জা পেল কুট্টি। আলফুর দিকে আর তাকাতে পারল না। লাজুক মুখে খাটালের দিকে পা বাড়াল।
আলফু বলল, বুজানের লগে কথা কইয়া আবার আহো। কথার কাম আছে।
.
১.৩৯
অন্ধকার চালতাতলায় বসে আছে কাশেম। বিকাল হতে না হতেই গভীর অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল জায়গাটা। যখন চকেমাঠে, গিরস্ত বাড়ির উঠান আর গাছপালার মাথায় দিনের শেষ আলো ফুরাতে বসেছে তার অনেক আগেই মাথার ওপরকার ডালপালা ছড়ান প্রাচীন চালতাগাছের চওড়া গাঢ় সবুজ পাতার আড়াল থেকে তলায় বসা কাশেমের চারপাশে নিঃশব্দে নামতে শুরু করেছিল অন্ধকার। প্রথমে অন্ধকারের রং ছিল সবুজ। চালতাপাতা থেকে ঠিকরে নামছিল বলে এমন রং। তারপর সময় যত গেল রং বদলাতে শুরু করল। এখন অন্ধকারের রং পাকা পুঁইগোটার মতো। একহাত দূরে চোখ চলে না, এমন।
সন্ধ্যা হতে না হতেই ঠাকুর বাড়ির পুব উত্তর কোণের জঙ্গল পুকুর অতিক্রম করে মিয়াবাড়িতে এসে উঠেছে একটি কোক্কা। এই পাখিটা দেখতে চিলের মতো, গাঢ় খয়েরি রঙের। ক ক করে ডাকে। দিনেরবেলা দেখা যায় না। কোথায় কোন জঙ্গলের আন্ধারে পলাইয়া থাকে কে জানে। বের হয় সন্ধ্যার মুখে মুখে। তারপর সারারাত চড়ে গিরস্ত বাড়ির ছাইছে (ঘরের পিছনে)। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই আবার গিয়ে ঢেকে জঙ্গলে। আন্ধারের জীব কোক্কা। এই পাখির মাংস খেলে লোকে নাকি পাগল হয়ে যায়। কাশেম শুনেছে। দেশগ্রামে কত গল্প গাথা থাকে, কত কুসংস্কার, কত প্রচলিত বিশ্বাস। কোক্কার মাংস খেয়ে পাগল হওয়াটা হয়তো তেমন কোনও বিশ্বাস। কেউ খেয়ে দেখেছে কি না কে জানে! তবে এত কাছ থেকে এই পাখিটা আজকের আগে কখনও দেখে নাই কাশেম। নির্ভয়ে তার চারপাশে চড়ে বেডালো। এদিক গেল ওদিক গেল। মাটি থেকে খুঁটে খেল আধার। বার কয়েক ক ক করে ডাকল। একবার তো কাশেমের একেবারে গা ঘেঁষেই হেঁটে গেল। এমন নির্ভয়ে গেল, মানুষ দেখে পোষা পাখি ছাড়া কোনও পাখির এমন করার কথা না।
কাশেম বুঝেছিল পাখিটা তাকে মানুষ মনে করে নাই। মনে করেছে ঝোপঝাড় গাছপালা। লোকালয়ে থাকা পাখিরা মানুষের স্বভাব জানে। শীতকালের সন্ধ্যায় গিরস্ত বাড়ির ছাইছে অন্ধকার চালতাতলায় কোনও মানুষের বসে থাকবার কথা না।
পাখিটা তারপর ছোট্ট এক উড়ালে চলে গিয়েছিল সমেদ খার বাড়ির দিকে। তখন বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল কাশেমের। পাখিটা তাকে মানুষ মনে করে নাই। আসলেই তো, সে কি মানুষ! মানুষ হলে মানুষের হাতে এমন মার খায়! মানুষ হলে মানুষের বাড়ির ছাইছে এমন করে বসে থাকে! একজনের ভাত ভাগ করে খায় দুইজনে! তাও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে! কখন ধরা পড়ে, কখন দেখে ফেলে বাড়ির লোক! কখন খাওয়ার খোটা দেয়, কখন করে অপমান!
এইসব ভেবে কাশেমের বুক ঠেলে উঠেছিল কষ্টের পর কান্না। কান্নাটা তখন কাঁদতে পারে নাই। অন্ধকার গাঢ় হওয়ার পর চারপাশ থেকে ঝাক দিয়ে বেরিয়েছে অন্ধকার রঙের মশা। বিনবিন শব্দে হেঁকে ধরেছে কাশেমকে। হাত পা নেড়ে, চড় চাপড় মেরে মশা তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেছে সে। তবে এই কাজটাও কাশেমকে করতে হয়েছে শব্দ বাঁচিয়ে। মশা মারার শব্দে বাড়ির লোক যেন টের না পায়, এখনও চালতাতলায় বসে আছে মাকুন্দা কাশেম, এখনও এ বাড়ি ছেড়ে যায় নাই। যদিও দুপুরবেলা কুট্টি তাকে দেখে ফেলেছে। আলফু অভয় দিয়েছে, ভয়ের কিছু নাই, কুট্টিকে যা বুঝাবার বুঝাবে সে। তবু ভয়টা কাশেমের রয়ে গেছে।
কিন্তু মশা মারতে মারতে অন্য একটা কথা ভেবে আনমনা হয়ে গিয়েছিল কাশেম। সন্ধ্যার এই সময়টায় গরু নিয়ে বাড়ি ফিরে সে। গরু আথালে বাইন্ধা জাবনা দেয়। গরুরা খাদ্য নিয়া ব্যস্ত হয় আর সে ব্যস্ত হয় ধুপ নিয়া। ধুপের ধুমায় পালিয়ে বাঁচে মশা। দুইদিন হল বাড়িতে নাই কাশেম, ধুপটা কি ঠিক মতন দিচ্ছে কেউ! মশায় খেয়ে শেষ করতাছে না তো গরুগুলিকে! ধুপ না দিলে সারারাত জেগে থাকতে হবে গরুগুলির। লেজ। নেড়ে, গায়ের চামড়া কাঁপিয়ে মশা তাড়াতে হবে। আহা অবলা জীব! মুখ ফুটে বলতে পারবে না কিচ্ছু, মনে মনে শুধু কাশেমকে খুঁজবে।
তারপর থেকে শুধুই গরুগুলির কথা ভেবেছে কাশেম। সকালবেলা কে তাদের মাঠে নেয়, দিনের শেষে কে ফিরিয়ে আনে ঘরে! কে দুধ দোয়ায় (দোয়), কে দেয় জাবনা! গরম ফ্যানে মুখ পুড়ে গেলে কে দেয় আদরের গাল! সকালবেলা মাঠে যাওয়ার সময় কি গরুগুলি কাশেমকে খোঁজে না! ফিরে এসে বাড়ির চারদিক তাকিয়ে খোঁজে না! কান খাড়া করে রাখে না কাশেমের সেই গানটি শোনার জন্য।
গুরু উপায় বলো না
জনম দুখি কপাল পোড়া গুরু
আমি একজনা।
