তয় এমুন চুপ কইরা রইছস ক্যা?
কথা কইতে ইচ্ছা করে না।
ক্যা?
এমতেঐ।
না লো ছেমড়ি কিছু একখান অইছে তর। তুই এমুন নুলাম গলায় কথা কওনের মানুষ না। মনডা ভাল তর, তয় কথা কচ চডর চডর কইরা। আইজ পয়লা দেকতাছি অন্য সুর। কী অইছে?
কুট্টি এবার গলা চড়াল। কইলাম যে কিছু অয় নাই।
মা বাপের কথা মনে অইছে, জামাইর কথা মনে অইছে?
না।
এবার স্বভাবে ফিরল কুট্টি। আপনে অহন চুপ করেন তো। এত প্যাচাইল পাইরেন না। আমার কাম আছে।
বড়বুজান দমলেন না। কী কাম?
কুপি বাত্তি আঙ্গামু না? মুশরি (মশারি) টাঙ্গামু না?
কুপি বাত্তি আঙ্গা। মুশরি না টাঙ্গাইলেও অইবো।
ক্যা? মুশরি না টাঙ্গাইলে মোশায় খাইবো না আপনেরে?
খাইলেঐ কী! উদিস তো পাই না।
উদিস না পান দেইক্কা মোশার আতে আপনেরে আমি ছাইড়া দিমু!
কুট্টি আর কোনও কথা বলল না। ম্যাচ জ্বেলে একই লগে দুইটা পিতলের কুপি জ্বালল। একটা খাটালের গাছার ওপর রেখে অন্যটা হাতে নিয়ে দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে বসল। বারান্দার এককোণে রাখা আছে দুইটা হারিকেন। কেরাসিনের বোতল থেকে টিনের ছোট্ট চোঙা দিয়ে কেরাসিন ভরল হারিকেনে। তারপর চিমনি মুছতে লাগল।
এই বাড়িতে একখান হারিকেন সারারাত জ্বলে। সেটা থাকে খাটালের কোণায়। রাতে কখন কী অসুবিধা হয় বড়বুজানের! অন্ধকারে কে তখন ম্যাচ কুপি খুঁজবে। তারচেয় হারিকেন একখান জ্বালিয়ে রাখা ভাল।
এটা অবশ্য রাজা মিয়ার মায়েরই আদেশ। তাঁর আদেশ ছাড়া এই বাড়ির কোনও কাজ হয় না। সংসারের সব কিছুর নিখুঁত হিসাব আছে তাঁর কাছে। মাসে কতখানি কেরাসিন লাগে তিনি তা জানেন। একখান হারিকেন সারারাত নিভু নিভু করে জ্বললে তেল কতটা পুড়বে, সা সা করে জ্বললে পুড়বে কতটা, তার তা মুখস্ত। সুতরাং এই সংসারের কোনও কিছু এদিক ওদিক করা অসম্ভব।
তবে সন্ধ্যার মুখে মুখে হারিকেন জ্বালাতে হয় দুইটা। একটা খাটালে রেখে অন্যটা দিয়ে সংসারের টুকটাক কাজ চালাতে হয়। হারিকেন জ্বালাবার পর কুপি দুইটা রাখতে হয় নিভিয়ে। আজও সেই কাজগুলি করল কুট্টি। করুল আনমনা ভঙ্গিতে। কোনওদিকে খেয়াল নাই, যেন মৃতের মতো কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু মনের ভিতর কুট্টির তখন একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা। মানুষটার মুখ দেখবার জন্যে অপেক্ষা। কই গেছেগা হেয়? হাজ আইয়া গেছে অহনতরি বাইরে আহে না ক্যা?
হারিকেন হাতে নিয়া খাটালের দিকে যাবে কুট্টি, দোতালা ঘরের সিঁড়ির সামনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল আলফু।
চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল কুট্টি। বুকের অনেক ভিতর থেকে গভীর আবেগের গলায় বলল, আপনে আমারে কইলেন না ক্যা?
পলকের জন্য আলফুও তাকাল কুট্টির দিকে। মাথা নিচু করে বলল, কইলে তুমি আবার কী মনে করো এইডা মনে কইরা কই নাই।
আমি কী মনে করুম! আমি কি সংসারের মালিক?
মালিক অইলে কইতাম।
আলফুর কথাটা বুঝতে পারল না কুট্টি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী কইলেন বোজলাম না।
আলফু মৃদু হাসল। এই সংসারে তোমার আর আমার দুইজনের দশা একরকম। বাড়ির চাকরবাকর আমরা। একজন আরেকজনরে কেমতে কই আমার একজন মেজবান আছে! দোফরে তারে খাওয়ান লাগবো!
কুট্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আপনে চিন্তা করতাছেন এক আমি করছি আরেক।
কেমুন?
সংসারের মালিক না অইতে পারি, আপনের ভাত থিকা যেমতে আপনে কাশেমরে ভাত দিলেন হেই ভাতের লগে আমার ভাগ থিকাও ইট্টু দিতে পারতাম।
তাইলে তোমার খাওনে টান পড়তো!
অহন যে আপনেরডায় টান পড়লো! টান যহন পড়ছিল দুইজনেরডায় পড়তো।
কুট্টির কথা শুনে ভিতরে ভিতরে কেমন একটা অনুভূতি হল আলফুর। কথা বলতে যেন ভুলে গেল সে। কুট্টির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কুট্টি বলল, কাশেমের অইছে কী? মুখটা জানি কেমুন দেকলাম!
কেমতে দেকলা! তুমি তো ওহেনে খাড়ওঐ নাই!
যেডু খাড়ইছি হেতে দেকছি।
হুজুরে বেদম মাইর মারছে কাইশ্যারে। মাইরা বাইত থিকা বাইর কইরা দিছে।
ক্যা, ক্যা মারছে?
ঘটনাটা বলল আলফু। শুনে কুট্টি আকাশ থেকে পড়ল। মরা মাইনষের জানাজা পড়তে আইছে, মাডি দিতে গেছে, হের লেইগা মাইনষে মাইনষেরে মারবো! তাও মাওলানা সাবের লাহান মাইনষে!
হ। ছনুবুড়িরে দুই চোক্কে দেখতে পারতো না হুজুরে। কইছিলো চুন্নিবুড়ির জানাজা অইবো না, গোড় অইবো না। এর লেইগাঐত্তো খাইগো বাড়ির হুজুরে আইয়া বেবাক কিছু করলো।
হারিকেন হাতে কুট্টি তখন চিন্তিত হয়ে আছে।
ঘরের ভিতর অনেক দূর পর্যন্ত হারিকেনের আলো, বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে আলফু বলল, বড়বুজানে কিছু উদিস পাইছে?
আনমনা হয়েছিল বলে কথাটা বুঝতে পারলনা কুট্টি। বলল, কী উদিস পাইবো?
কাইশ্যা যে এই বাইত্তে দুইফরে ভাত খাইছে!
কেমতে উদিস পাইবো! হেয় কি বিচনা ছাইড়া উঠতে পারেনি! চোক্কে দেহেনি!
আমি কইতে চাইলাম তুমি বড়বুজানরে কিছু কও নাই তো!
আলফুর চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল কুট্টি। যা দেইক্কা আমি নিজে শরম পাইয়া চাউলতাতলা থিকা আইয়া পড়লাম, খাড়ইলাম না, হেই কথা আমি বড়বুজানরে কমু!
একথার বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল আলফুর। আনন্দের একটা শব্দ করল সে। সিঁড়িতে বসল।
খাটাল থেকে ভেসে এল বড়বুজানের গলা, ও লো কুট্টি, কই গেলি?
আলফুর অদূরে দাঁড়ান কুট্টি মুখ ঘুরিয়ে খাটালের দিকে তাকাল, এইত্তো আমি।
