তবে শরমটা আলফু একটু বেশিই পেয়েছিল। খাওয়া দাওয়া শেষ করে থাল গেলাস গামলা সে আর কুট্টির কাচ্ছে ফিরায়া দিয়া যায় নাই, রান্ধনঘরের ছেমায় (সামনে) রেখে মাকুন্দা কাশেমকে নিয়ে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল।
একটা কথা কিছুতেই কুট্টির মাথায় ঢুকছে না, মাকুন্দা কাশেম হঠাৎ করে আলফুর লগে এসে খেতে বসল কেন! মুখ চোখই বা অমন দেখাচ্ছিল কেন তার! কী হয়েছে! মান্নান মাওলানা কি মারধোর করেছে, বাড়ি থেকে খেদাইয়া দিছে!
ইচ্ছা করলে দুপুরবেলাই এই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেত কুট্টি, যদি আরেকটুক্ষণ চালতাতলায় দাঁড়াত, যদি আলফু আর নয়তো মাকুন্দা কাশেমের লগে কথা বলত। কিন্তু আলফুর শরম পাওয়া দেখে ওখানে আর দাঁড়াতে ইচ্ছা করে নাই। ঘরে ফিরে এসেছিল। তারপর থেকে সময় কেটেছে ঘোরের মধ্যে।
আসলে একই দিনে দুই দুইটা ঘটনা আজ ঘটে গেছে কুট্টির জীবনে। দুপুরের মুখে মুখে চাক তুলতে নামা আলফুকে দেখে দ্বিতীয়বারের মতো শরীরের খুব ভিতরে হয়েছে এক অনুভূতি আর চালতাতলায় বসে মাকুন্দা কাশেমকে নিয়ে ভাত খেতে দেখে হয়েছে। মনের মধ্যে এক অনুভূতি। একই দিনে শরীর আর মনের অনুভব একজন মানুষকে তো বদলে দিবেই! আর যে অনুভব মানুষটার জীবনে এই প্রথম। কিছুকাল হলেও স্বামীর ঘর সে করেছে, খানিকটা হলেও পুরুষদেহ বুঝেছে। মন বোঝেনি একটুও। না নিজের পুরুষটার। সংসারের অভাব অনটন, সতীন, সতীনের এন্দাগেন্দা পোলাপান কুট্টিকে জীবনের স্বাদ পেতে দেয়নি। স্বামীর দেহ মন কোনওটাই সে ঠিকঠাক আবিষ্কার করতে পারে নাই। আবিষ্কার করবার সুযোগই পায় নাই। আজ পারল। তবে যারটা পারল সে স্বামী না, সে এক পরপুরুষ। সেই মানুষ উদিসই পাইলো না কুট্টি তার মনের কতখানি দেখে ফেলছে, কতখানি বুঝে ফেলছে।
অন্যদিকে কুট্টি যেন আজ নিজেকেও আবিষ্কার করল। নিজের দেহ মন আবিষ্কার করল। প্রথমে মিলতে হবে নারী পুরুষের মন। একজনের মন হবে আরেকজনের। মনের টানে একাকার হবে মন, তারপর দেহ। এই না হলে মানুষের জীবন জীবন হয়ে ওঠে না। নারীজন্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকে যে পুরুষ আজ যেন সেই পুরুষটাকেই পেয়ে গেছে কুট্টি। বিহ্বল তো সে হবেই, সময় তো সে বুঝতেই পারবে না!
ঘরগুলির কোণাকানছিতে কালো ধুমার মতো জমতে শুরু করেছে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে গলা খুলছে রাতপোকারা। ফলে সন্ধ্যাবেলাই শুরু হয়ে গেছে রাতের শব্দ। গাছপালার মাথার ওপর যে স্বচ্ছ নীল আকাশখান, কখন সেই আকাশ চারদিকে ঢেলেছে সাদা মশারির মতো কুয়াশা! হিমশীতল উত্তরের হাওয়াখান বইছে। ঠিক এ সময় দোতালা ঘরের খাটাল থেকে বড়বুজান ডাকলেন, কুট্টি লো ও কুট্টি কই গেলি তুই!
কুট্টি দাঁড়িয়েছিল দক্ষিণের দরজায় ঢেলান দিয়ে। বড়বুজানের ডাকে নড়ে উঠল। ধীর পায়ে খাটালে, বড়বুজানের পালঙ্কের সামনে এসে দাঁড়াল। কী অইছে?
চাইরমিহি এমুন আন্দার আন্দার লাগে ক্যা?
হাজ হইয়া গেছে।
কুপি বাত্তি আঙ্গাচ নাই?
না।
ক্যা?
অহন আঙ্গামু।
তারপর অন্যরকম একটা প্রশ্ন করলেন বড়বুজান। আমার মুখের সামনে এমুন পিরপির করে কী লো?
কুট্টি আনমনা গলায় বলল, মোশা।
মোশা খালি মুখের সামনেই পিরপিরায়নি? শইল দেহে না!
কেমতে দেকব! শইল তো আপনের লেপের ভিতরে।
একথায় বড়বুজান একটু শরম পেলেন। হ। লেপের ভিতরে মোশা হানবো (ঢাকা) কেমতে!
একথার কোনও জবাব দিল না কুট্টি।
বড়বুজান অবাক গলায় বললেন, ও কুট্টি মোশা তো খালি পিরপিরায়ঐ না, কামড়ও তো দেয়, আমি তাইলে উদিস পাইনা ক্যা?
কুট্টি নির্বিকার গলায় বলল, আপনের চামড়ায় জান নাই।
বড়বুজান চমকালেন। কী?
হ। শইল্লের য়োদবোধ (বোধ অর্থে) গেছে গা আপনের।
কচ কী তুই! তাইলে তো এই শীতটা আমি টিকুম না।
কুট্টি কোনও কথা বলল না।
বড়বুজান কথা বললে তার প্রায় প্রতিটি কথার পিঠেই কথা বলে কুট্টি। কারণ এই বাড়িতে আর কথা বলবার মানুষ নাই। কথা না বলে, সারাদিন বোবা হয়ে কি মানুষ থাকতে পারে। ফলে কথা যেটুকু হয় কুট্টির সেটা এই বড়বুজানের লগেই।
কিন্তু এখন কুট্টি তেমন কথা বলছে না কেন? কী হয়েছে?
লেপের ভিতর থেকে কাউট্টার মতন বেরিয়ে থাকা মাথাটা কাত করে কুট্টির দিকে তাকালেন বড়বুজান। চোখে কিছুই প্রায় দেখেন না তবু কুট্টির মুখটা দেখবার চেষ্টা করলেন। মায়াবি গলায় বললেন, কী অইছে লো তর?
এই কথায় কুট্টির বুকটা মোচড় দিয়া উঠল। মনে হল বহুকালের জমে থাকা গভীর গোপন একটা কান্না যেন এখনই বুক ঠেলে বের হবে। বুক ফেটে যাবে তার, চোখ ফেটে যাবে।
এরকম কান্নার অনুভূতি আজকের আগে কখনও হয় নাই তার। জীবনে কত দুঃখ কষ্ট পেয়েছে, কথায় কথায় কত মেরেছে স্বামী, কত অপমান করেছে, স্বামী সংসার ছেড়ে আসার পর বাড়িতে আশ্রয় দেয় নাই মা বা, কুত্তা বিলাইয়ের মতন দূর দূর করে খেদাইয়া দিছে তবু আজকের মত এমন কান্না কখনও পায় নাই কুট্টির। এ যেন সম্পূর্ণ অচেনা এক কষ্টের কান্না। এ যেন জীবনের কোনও কিছুকে না পাওয়ার কান্না, এ যেন জীবনের সবকিছু পেয়ে যাওয়ার কান্না।
কান্নাটা কুট্টি কাঁদতে পারল না। সেই উথাল দিয়ে ওঠা গভীর কান্না বুকে চেপে জড়ান গলায় বলল, কী অইব আমার! কিচ্ছু অয় নাই।
