আলফুর চোখের দিকে তাকিয়ে কুট্টি বলল, রান্ধনঘরের সামনে বইয়া খাওনের কাম কী! এহেনেঐ বহেন।
আলফু অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, না থাউক।
ক্যা? রোজ তো এহেনেঐ বহেন।
আইজ বমুনা।
একথায় কুট্টি একটু ঠাট্টা করল। ক্যা আমার বোগলে (সামনে) বইয়া খাইতে শরম করে! আমার চেহারা খারাপ হেইডা আমি জানি। এই চেহারার সামনে বইয়াঐ তো আগে খাইতেন। আইজ আথকা কী অইলো! চেহারা কি বেশি খারাপ অইয়া গেছে আমার!
কুট্টির কথা শুনে পলকের জন্য তার দিকে তাকাল আলফু। বলল, এই হগল কথা কইয়ো না। যে তোমার চেহারা খারাপ কয় মাইনষের চেহারা হে বোজে না।
এ কথায় কুট্টির ভিতরটা কেমন করে উঠল! আলফুর দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। আশ্চর্য এক লজ্জায় গা কাঁটা দিয়ে উঠল। সেই যে সেদিন চালতাতলায় আলফুকে দেখে যেমন হয়েছিল, আজ ঘাটে দাঁড়িয়ে যেমন হয়েছিল ঠিক তেমন এক অনুভূতি শরীরের খুব ভিতরে এখনও হল। কিছুতেই আলফুর দিকে আর তাকাতে পারল না সে। দ্রুত হাতে ভাত সালুন বেড়ে, থাল দিয়ে গামলার মুখ ঢেকে আলফুর হাতে দিল। এলুমিনিয়ামের জগের একজগ পানি দিল, একটা মগ দিল। সেসব নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল আলফু।
আলফু চলে যাওয়ার পর নিজের জন্য ভাত বাড়বে কুট্টি, বাড়তে ইচ্ছা করল না। ক্ষুধা যেন নাই তার, ক্ষুধা যেন মরে গেছে। কেন যে আলফুর মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছা করতাছে, কেন যে ইচ্ছা করতাছে রান্ধনঘরের সামনে বসে কেমন করে ভাত খাচ্ছে আলফু একটু দেখে আসে। ভাত কম হল কিনা তার, তরকারি কম হয় কিনা দেখে আসে।
কিছু না ভেবে বাইরে এল কুট্টি। এসেই থতমত খেল! খান্দনঘরের সামনে আলফু নাই। ভাত পানি নিয়া কোথায় গেল! কোথায় বসে খাচ্ছে। এই বাড়ির অন্যকোনও ঘরও তো খোলা নাই যে সেই ঘরে বসে খাবে। ব্যাপার কী!
আলফুকে খুঁজতে আমরুজতলায় এল কুট্টি। না সেখানে কেউ নাই। ভর দুপুরের নির্জনতায় খা খা করতাছে আমরুজতলা। একটা শালিক টুকটুক করে লাফাচ্ছে সাদা মাটিতে। শালিকটা চোখে পড়ল না কুট্টির। তার মনে তখন একটাই চিন্তা। ভাত পানি নিয়া কোথায় উধাও হয়ে গেল একজন মানুষ!
পশ্চিম দক্ষিণের ঘর দুইটার মাঝখানকার চিকন রাস্তায় কুট্টি তারপর চালতাতলায় এল। এসেই থতমত খেল। চালতাতলায় সামনা সামনি বসে ভাত খাচ্ছে আলফু আর মাকুন্দা কাশেম। আলফু খাচ্ছে গামলায় করে, থাল দিয়েছে কাশেমকে। কোনওদিকে না তাকিয়ে গপাগপ গপাগপ খেয়ে যাচ্ছে কাশেম।
কিন্তু কাশেমের মুখটা এমন কেন? এমন হয়েছে কী করে!
কুট্টি যখন এসব ভাবছে তখন হঠাৎ করেই পিছন ফিরে তাকাল আলফু, তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল। খাওয়া ভুলে কুট্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
.
***
১.৩৮
শীতের বিকাল দ্রুত পড়ে যায়। বিকালেই হয়ে যায় সন্ধ্যা। আজকের সন্ধ্যা যেন আরও তাড়াতাড়ি হয়েছে। কখন বিকাল হল কখন ফুরাল কুট্টি তা টেরই পেল না। দুপুরবেলা চালতাতলায় বসে ওইভাবে দুইজন মানুষকে ভাত খেতে দেখার পর মনটা কেমন হয়ে আছে। নিজের ভাগের ভাত আরেকজন মানুষের লগে ভাগ করে খেতে হবে দেখে কুট্টির লগে খুব ছোট্ট একখান চালাকি করল আলফু। কেন করল! কুট্টিকে তো বললেই পারত, ভাত সালুন ইট্টু বেশি কইরা দিও। আমার লগে আরেকজন মানুষ খাইবো।
যে মানুষটার জন্য চালাকি আলফু করল, মাকুন্দা কাশেম, তাকে কুট্টি জন্মের পর থেকেই চিনে। একই গ্রামের মানুষ। তার কথা শুনলে কি ভাত একটু বেশি করে দিত না কুট্টি, সালন দিত না! না হয় নিজে একটু কম খেত। একবেলা একটু কম খেলে কী হয়। প্রথমে বাপের ঘরে, পরে স্বামীর ঘরে কতদিন আধাপেট খেয়ে থেকেছে! কতদিন না খেয়ে থেকেছে। দুইদিন তিনদিন কেটে গেছে অনাহারে, একমুঠ ভাত জোটে নাই। কথাটা আলফু কেন বলল না কুট্টিকে! দিনভর যে রকম পরিশ্রম করে, ওইরকম পরিশ্রমের পর আধাপেট খেয়ে দিনটা তার কাটছে কী করে! তার ওপর একলা একটা চাক তুলেছে পুকুর থেকে। চাক তোলা যে কী পরিশ্রমের কাজ, যে না তুলেছে সে তা কখনও বুঝবে না। মাকুন্দা কাশেমের কথা যদি কুট্টিকে আলফু বলত তাহলে নিজের ভাগ থেকেও কিছুটা ভাত তাকে দিতে পারত কুট্টি। একজনের ভাগেরটা দুইজনে না খেয়ে দুইজনের ভাগেরটা খেতে পারত তিনজনে। তাতে পেট প্রায় ভরে যেত। কষ্টটা আলফুকে একা করতে হত না।
তবে মনের দিক দিয়ে আলফু যে খুব ভাল, মানুষের জন্য যে গভীর মায়া মমতা আছে তার আজ ওই দৃশ্যটা দেখার পরই কুট্টি তা টের পেয়েছে। মাকুন্দা কাশেম মেদিনীমণ্ডলের লোক আর আলফু পদ্মার মাঝখানে জেগে ওঠা কোথাকার কোন মাতবরের চরের লোক। দুইজন দুইবাড়ির গোমস্তা কিন্তু একজনের জন্যে কী টান আরেকজনের। মানুষের জন্যে মানুষের এই টানের নাম কী! এই টান থাকলে কি একজন আরেকজনের লগে ভাতের মতো ভাগ করে নিতে পারে জীবনের সবকিছু! সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না!
এইসব ভেবে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা তরি সময়টা যেন চোখের পলকে কেটে গেছে কুট্টির। চালতাতলা থেকে ফিরে এসে নিজে ভাত নিয়ে বসেছে ঠিকই খেতে ইচ্ছা করে নাই। বারবার মনে হয়েছে আরও কিছুটা ভাত সালুন দিয়ে আসে দুইজনকে। কিন্তু দিতে সে যায়নি। ভাত খেতে খেতে আলফু যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছিল, চোখে যে ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধী দৃষ্টি ছিল সেই দৃষ্টির সামনে আর যেতে ইচ্ছা করে নাই। শরম পাওয়া মানুষকে যে আবার শরম দেয় সে কোনও মানুষ না।
