কুট্টি বলল, চাইয়া রইলেন ক্যা?
তরে দেকতাছি।
আমারে আবার দেহনের কী অইলো! এমুন পচামুখ মাইনষে দেহে
আমি তর মুখ দেহি না, আমি তর ভিতরডা দেহি। তর লাহান একখান মাইয়া যুদি আমার থাকতো, এই দুইন্নাইতে আমার তাইলে কোনও দুঃকু থাকতো না।
আর আমার মা বাপে আমারে বাইত্তে যাইতে দেয় না। আমার মুখ দেহে না।
তর মা বাপে মানুষ না। আমানুষ।
তয় তাগোও আমি দোষ দেই না। দোষ দেই আমার কপালের। বিয়ার বস (বয়স) অওনের পর থিকা জামাই লইয়া, জামাইবাড়ি লইয়া কতপদের চিন্তা করছি। কত খোয়াব দেকছি। চিন্তা করছি এক, খোয়াব দেকছি এক, অইছে আরেক।
কুট্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বড়বুজান বললেন, আমার যুদি একখান পোলা থাকতো, হেই পোলার যদি তর লাহান একখান বউ থাকতো, আহা রে, কত খুশি অইতাম আমি।
দখিনা দুয়ার দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে কুট্টি বলল, বিয়ার আগে চিন্তা করছি জামাই বাইত্তে গিয়া আমার হরির (শাশুড়ি) বেবাক কাম কইরা দিমু আমি। হৌরের বেবাক কাম কইরা দিমু। গিয়া দেহি হৌরও নাই হরিও নাই। আছে একখান হতিন, তার এলাগেন্দা পোলাপান।
বিয়ার আগে তুই হোনচ নাই হতিনের ঘর?
না।
কচ কী!
হ। আমারে কেঐ কয় নাই। বুজান, আপনের কাম কাইজ যহন কইরা দেই, আপনেরে নাওয়াই থোয়াই, খাওয়াই ঘুম লওয়াই তহন আপনেরে আর দেহি না আমি। দেহি বিয়ার আগে খোয়াবে দেহা আমার হরিরে। দেহি আমার জামাই বাড়িডা। যেন আমি আমার হরির কাম কাইজ করতাছি। যেন আমি আমার জামাই বাইত্তেঐ আছি। আমি তহন আর আউজকার আমি থাকি না। আমি অইয়া যাই কহেক বচ্ছর আগের আমি।
কুট্টির কথা শুনে বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ল বড়বুজানের। গভীর দুঃখের গলায় বললেন, বহুত ছোডকালে বিয়া অইছিলো আমার। ছয় সাতমাস জামাইর ঘর করছিলাম। তারবাদে জামাই মরলো। আগের দিনে ভাল বংশের মাইয়ারা রাড়ি (বিধবা) অইলে হারা জনম রাড়ি থাকতো। তাগো আর বিয়া অইতো না। আমারও আর বিয়া অয় নাই। বাপের অবস্তা ভাল আছিলো দেইক্কা বাপে আমারে আর জামাই বাইত্তে রাখে নাই। বাপের বাইত্তে লইয়া আইছিল। একভাই দুইবইন আছিলাম আমরা। ভাইডা বেবাকতের ছোড়। ঘোড অইলে কী অইবো হেয়ঐ গেল বেবাকতের আগে। অহন আছি খালি রাজা মিয়ার মায় আর আমি। দুই বইনে খুব খাতির আছিলো আমগো, অহনও আছে,এর লেইগা জনম ভর বইনে আমারে টানলো। বইনের সংসারে জীবনডা কাইট্টা গেল আমার। স্বামী সংসার বোজনের আগে বিয়া অইছিলো, বোজনের আগে রাড়ি অইলাম। জীবনের সাদ আল্লাদ কিছুই বোজলাম না। স্বামী সংসার, পোলা মাইয়া, পোলার বউ, মাইয়ার জামাই, নাতি নাতকুর সব মিলাইয়া মাইয়াছেইলাগো যেইডা জীবন হেই জীবন আমি কোনওদিন চোক্কে দেকলাম না। একটা জীবন জীবন না অইয়া কাইট্টা গেল। কুট্টিরে, তর জীবনডাও দেকতাছি আমার লাহান। দিনে দিনে দিন চইলা যাইবো, একদিন দেকবি আমার লাহান বিচনায় পড়ছস, আর উইট্টা খাড়ঐত পারবি না। তহন খালি মনে অইবো জন্মাইছিলাম ক্যা! মাইনষের আসল যেই জীবন হেই জীবনঐ যদি না পাইলাম তয় জন্মাইছিলাম ক্যা!
বড়বুজানের কথা শুনে কখন যে কাঁদতে শুরু করেছে কুট্টি, কখন যে চোখের পানিতে গাল ভাসতে শুরু করেছে, কুট্টি তা টের পায়নি।
পালঙ্কের তলায় বিলাইয়ের বাচ্চাগুলি তখন কুঁইকুই করতাছে। বোধহয় ক্ষুধা লেগেছে তাদের, বোধহয় মায়ের সঙ্গে আল্লাদ করতাছে।
১.৩৬-৪০ ভোলে কইরা ভাত দেও
১.৩৬
আলফু বলল, ভোলে কইরা ভাত দেও।
কুট্টির চোখ দুইটা ফুলা ফুলা, সেই চোখে আনমনা চাউনি। মুখ থমথম, দুঃখি। তবু আলফুর কথা শুনে অবাক হল। ক্যা?
কুট্টির মুখের দিকে তাকাল না আলফু। বলল, এমতেঐ। ভাত সালুন যা দেওনের একবারে ভোলের মইদ্যে দিয়া দেও আমি রান্দনঘরের ওহেনে বইয়া খামু।
আলফু ভাত খায় দোতলা ঘরের সামনের বারান্দায় বসে। রান্না হয়ে যাওয়ার পর ভাত তরকারি সব দোতালা ঘরের বারান্দায় নিয়ে আসে কুট্টি। এই ঘরের ভিতর দিককার বারান্দাটা খোলা না। খাটালের মতোই আরেকটা অংশ। বাইরের দিককার দরজা বন্ধ করে দিলে বারান্দা ঢুকে যায় ঘরের ভিতর। বারান্দার পশ্চিম কোণে ভাত সালুনের হাঁড়ি কড়াই, থাল বাসন এসব রাখার ব্যবস্থা। সেই জায়গায় বসে মাত্র ভাত বাড়বে কুট্টি তখনই এই কথা বলল আলফু। কথা প্রায় বলেই না সে। ভাত বাড়া হলে কুট্টি ডাকে। নিঃশব্দে বারান্দায় এসে বসে। যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে, কোনওদিকে না তাকিয়ে চলে যায়। সেই আলফু আজ কুট্টি না ডাকতেই ঘরে এসে ঢুকেছে। তারপর ওই কথা। অন্যসময় হলে যতটা অবাক হত কুট্টি, বড়বুজানের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে আছে বলে অত অবাক সে হয়নি। টিনের মাঝারি গামলায় ভাত বাড়তে বাড়তে আনমনা গলায় বলল, সালুন আইজ ভাল না। শোলটাকি কুটছিলাম, দুই টুকরা খাইয়া হালাইছে বিলাইতে। রানও মনে অয় ভাল অয় নাই। বড়বুজানরে লইয়া কাম পইড়া গেছিল।
কুট্টি যখন এই ধরনের কথা বলে আলফু চুপ করে থাকে। আজ চুপ করে রইল না। কথা বলল। ঘোপায় মাছ আছিল না। রানবা কই থিকা! তয় ম্যালা মাছ ধরছি আইজ। ষোল্লডা এত বড় বড় কই। রয়না খইলসা ফলি, শোল টাকি, গজার টাকি। তিন ঘোপা ভইরা হালাইছি। রাইত্রে ভাল কইরা রাইন্দো।
আলফুর কথা শুনে খারাপ হয়ে থাকা মন কেন যেন একটু হালকা হয়ে উঠল কুট্টির। যেন আরও কথা বললে আরও হালকা হবে মন। এক সময় পুরাপুরি ভাল হয়ে যাবে।
