এই জালে আজ চাক বের দিবে বলে জালের বারো চৌদ্দ হাত লম্বা রশিন গুটিয়ে গরুর মুখের ঠুলির মতো গোল করেছে আলফু। এমন করে গিটঠু দিয়েছে যাতে রশিটা খুলতে না পারে। চাক বেড় দেওয়ার সময় রশি খুলে যদি পানির তলায় ছড়িয়ে যায়, পানির তলায় লুকিয়ে থাকা কোনও বঁটাখাঁটির লগে যদি প্যাঁচায়া যায় তাহলে লাগবো আরেক ভেজাল। অতিকষ্টে কচুরির তলা দিয়ে টেনে নিয়ে চারদিক থেকে কচুরির দশ বারোহাতি চাক বেড় দিয়ে যখন কচুরি তুলে ফেলতে ফেলতে গুটিয়ে আনা হবে জাল, হয়তো তখনই পানির তলায় জড়িয়ে যাওয়া রশির টানে কচুরির তলা থেকে সরে যাবে জাল। পালাবার তক্কে থাকা মাছগুলি পালিয়ে যাবে। সামান্য ভুলের জন্য পরিশ্রমটাই মাটি। এজন্য আগেভাগেই কাজটা সেরে রাখছে আলফু।
নিঃশব্দে কচুরির জঙ্গল ফাঁক করে আলফু যখন পানির গভীরে আগাচ্ছে তখনই ঘাটলায় মাছ ধুতে এসে তাকে দেখতে পেল কুট্টি। দেখে আনমনা হল। সেই যে একদিন চালতাতলায় আলফুর ঘাড়ের কাছে একটুখানি রোদ পড়ে থাকতে দেখে শরীরের খুব ভিতরে অন্যরকমের একটা অনুভূতি হয়েছিল, এতদূর থেকে আলফুকে দেখে আজও ঠিক তেমন অনুভূতিই হল। সব ভুলে আলফুর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। পুকুরপারে যে তারেকজন মানুষ আছে কুট্টি তাকে দেখতেই পেল না।
.
১.৩৫
হাঁটাচলা করতে পারে না এমন পোলাপানকে যেমন করে ঘরে আনেন মা, নাওয়াইয়া ধোয়াইয়া (গোসল টোসল) পাথালি কুলে (পাঁজাকোল) নেন, ঠিক তেমন করে বড়বুজানকে ঘরে নিয়ে এল কুট্টি। পেশাবে দুর্গন্ধ হওয়া কথা কাপড় আগেই রোদে দিয়েছিল। খাটালের পালঙ্কে এখন অন্য তোষক বিছানো। তোষকের উপর অন্য কাঁথা, সাদা গিলাপ লাগান অন্য বালিশ, শীতকালের জন্য তুলে রাখা লেপও বের করা হয়েছে। কটকটা লাল রঙের লেপখান ঢোকান হয়েছে ঠিক সাদা না সাদার কাছাকাছি রঙের ওসারে (ওয়ার)। এসবই ভোলা ছিল ছোটখাট ঘরের সমান টিনের আলমারিতে। দীর্ঘদিন আলমারি বন্দি থাকার ফলে লেপ তোষকে ঘুম ঘুম গন্ধ হয়। বড়বুজানের পালঙ্কে এখন সেই গন্ধ। খুব সহজ প্যাঁচে বড়বুজানকে যখন সাদা কাপড় পরিয়ে পালঙ্কের ওপর বসিয়েছে কুট্টি, মানুষটার মুখে তখন গভীর প্রশান্তির হাসি। খুনখুনা গলায় বললেন, বহুত আরাম লাগতাছে রে বইন।
শুনে কপট রাগের গলায় কুট্টি বলল, আরাম তো লাগবোঐ! আরামের কাম কইরা দিলাম যে! আপনের আরামের লেইগা আমার যে কী খাটনিডা গেল হেইডা তো একবারও চিন্তা করলেন না!
কে কইছে চিন্তা করি নাই? করছি। তয় চিন্তা কইরা কী করুম ক? আমি আতুর লুলা মানুষ, আমার কিছু করনের আছে!
বড়বুজান কাত হয়ে শুয়ে পড়তে চাইলেন। দুইহাতে তাকে ধরল কুট্টি। ইট্টু পরে হোন।
ক্যা?
শইল্লে ইট্টু তেল দিয়া দেই।
শরীরে তেল ডলে দেওয়ার কথা শুনে খুশি হলেন তিনি। ফোকলা মুখ হাসিতে ভরে গেল। এটা যে কান্না না, এটা যে আনন্দের হাসি বুজানের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল কুট্টি। তার মুখেও হাসি ফুটল। ইস তেল দেওনের কথা হুইন্না দিহি আল্লাদে আর বাচে না! হাসে কী!
আমার হাসন তুই বোজছ! তুই দিহি কচ আমি হাসি না কান্দি বুজা যায় না। অহনকার বোজলাম।
খাটালের ছোট্ট আলমারির মাথার উপর রাখা সউষ্যার তেলের শিশি নিয়ে এল কুট্টি। এক হাতের তালুতে একটু তেল ঢেলে দুইহাতে সেই তেল ঘষে প্রথমে বুজানের মাথায়, তারপর হাতে পিঠে বুকে ডলতে লাগল। ডলায় ডলায় শিশুর মতো দোল খেতে লাগলেন বড়বুজান। শীতের দিনে সউষ্যার তেল শইল্লে দিলে শইল গরম থাকে। শীত লাগে কম।
কুট্টি বলল, তয় একখান কামও বাড়ে।
কী কাম?
শইল্লের বেবাক তেল লাইগ্যা যায় বিচনায়। বিচনা নষ্ট হয়।
বুজান একটু চমকালেন। ঘোলা চোখে কুট্টির মুখের দিকে তাকালেন। হ এইডা তো ঠিক কথা কইছস! আইজঐ নতুন লেপ তোষক বাইর করলি আইজই হেইডি নষ্ট অইবো! তাইলে আমারে তেল দেওলের কাম আছিলো কী!
তেল ডলতে ডলতে কুট্টি বলল, এত কষ্ট কইরা এত কাম আপনের লেইগা আইজ করলাম, এডু আর বাকি রাখুম ক্যা! বিচনা নষ্ট অইলে আমার কাম বাড়বো! আপনের কী?
তুই খুব ভালরে বইন, খুব ভাল।
কেডা কইছে আমি ভাল! আমি দিহি খালি আপনের লগে রাগ দেহাই, কাইজ্জা করি! ভাল অইলাম কেমতে!
কো কাইজ্জা করচ!
করি না?
যা করচ ওইডা কাইজ্জা না।
তয় কী?
ঐডা তর সবাব। যে কোনও কামে পয়লা ইট্টু চিল্লাচিল্লি করচ, তারবাদে হেই কামডাঐ খুব ভাল কইরা করচ। এই হগল মাইনষের ভিতর খুব ভাল অয়।
কুট্টি একটু উদাস হল। ভিতর ভাল অইলে কী অইবো? ভিতর তো মাইনষে দেহে না!
যারা মাইনষের ভিতর দেহে না তারা মানুষ না। তারা আমানুষ।
দুইন্নাইতে আমানুষঐ বেশি। জন্মের পর থিকা মা বাপরে দেকলাম, তাগো পেড়ে জন্মাইলাম, তাগো কুলে বড় অইলাম, তারা কেঐ আমার ভিতরডা দেকলো না। হাত পাও বাইন্দা হতিনের ঘরে ঘর করতে পাডাইলো। হতিন তো হতিনঐ, হেয় আমারে কী বুজবো! যার লগে বিয়া অইলো হেই মানুষটাঐ কিছু বোজলো না! পেডের কষ্ট তো আছে, মনের কষ্টও আছে। যে কোনও একখান কষ্ট মাইনষে সইজ্জ করতে পারে দুইখান করে কেমতে! খাইতেও দিবো না মনও বুজবো না হেই মাইনষের ঘর কেমতে করে মাইনষে!
তেল ডলা শেষ করে বড়বুজানকে শোয়াইয়া দিল কুট্টি। গলা তরি লেপ টেনে দিল। বড়বুজান তখন ঘোলা চোখ দুইখান মায়াবি করে তাকিয়ে আছেন কুট্টির দিকে।
