এই এখন যেমন হচ্ছে আলফুর।
মাকুন্দা কাশেমকে নিয়ে একটু আগে পুকুরের পুব দক্ষিণ কোণে আসছে সে। পুকুরপারে কাশঝোপের কাছে কাশেমকে বসিয়ে লুঙ্গি কাছা মেরে ঝাঁকিজাল নিয়ে নিজে নেমে গেছে কচুরি ভর্তি পুকুরে। পুকুরের একদিকটায় এখনও হাত পড়েনি। এমনিতেই ঘন কচুরি এখানটায় তার ওপর পারে আছে কাশ, কাশের শিকড় বাকড় তো আছেই, কোনও কোনও নুয়ে পড়া কাশও এসে লেপটে পড়েছে পানিতে, কচুরির ওপর, ফলে জংলা মতন জায়গটাকে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে পুকুরের বাছা বাছা মাছগুলি নিশ্চয় এখানে এসে থান গাড়ছে। আলফু আজ সেই মাছ ধরবে। একটানা বেশ কয়েকদিন বাড়িতে থেকে আজ তিনদিন হল বাড়ির কর্তী চলে গেছেন ঢাকায়। যে কয়দিন বাড়ি ছিলেন তিনি আলাম (আস্ত) একটা মাছও পড়েনি আলফুর পাতে। এত মাছ ধরে জিইয়ে রাখে ঘোপায়, হলে হবে কী কোনও কোনও ওক্তে মাছের চেহারাই দেখে নাই। কর্ত্রী বেজায় কৃপণ মানুষ। নিজে খেয়ে শেষ করে গেছেন ঘোপার সব মাছ।
আলফু ভেবেছিল কর্ত্রী চলে যাওয়ার পরদিনই পুকুরে নামবে। বাছা বাছা কিছু মাছ ধরে কুট্টিকে বলবে বেশি করে তেল মশলা দিয়ে রান্না করতে। তারপর দুইটা তিনটা করে আলাম মাছ দিয়া ভাত খাবে একেকবেলা। যে কদিন মাছ খেতে পারে নাই সেই কয়দিনেরটা উসিল করবে। কিন্তু দুইটা দিন কেটে গেছে পুকুরে আলফু নামতে পারেনি। একটা দিন গেল ছনুবুড়ির মৃত্যু নিয়ে আরেক দিন সকাল থেকেই আলস্য লাগল। এই সব কারণে আজ আর কোনও কিছু ভাবে নাই আলফু, কোনওদিকে তাকায় নাই, পুকুরে এসে নামছে।
আলফু যখন পুকুরে নামছে মাকুন্দা কাশেম কাতর গলায় বলল, আমিও তোমার লগে নামুম মিয়াবাই?
আলফু বলল, না। তুই বইয়া থাক। খালি একখান চাক উডামু। ঘণ্টাহানির কাম। একলা পারুম। তারবাদে বাইত যামু। কুট্টি ততক্ষুণে রান্দন বাড়ন সাইরা হালাইবো। তরে আমার লগে বহাইয়া খাওয়ামুনে। দুইডা দিন কষ্ট করছস, আর ইট্টু কষ্ট কর।
হেইডা পারুম। তয় আজাইরা থাকলে খিদা বেশি লাগে মিয়াবাই। আমি তোমার লগে নামি?
আলফু হেসে বলল, লুঙ্গি তো ভিজ্জা যাইবো!
যাউক।
ভিজা লুঙ্গি ফিন্দা দিন কাডাবি?
ক্যা আমার আরেকখান লুঙ্গি আছে না।
কো?
কাশেমের মনে পড়ল লুঙ্গিটা মান্নান মাওলানার বাড়িতে রয়ে গেছে। লুঙ্গি কেন তার নিজের ব্যবহারের কোনও জিনিসই সে ওই বাড়ি থেকে আনতে পারিনি।
মার খাওয়া মুখটা আবার বিষণ্ণ হয়ে গেল কাশেমের। চোখ দুইটা ছলছল করে উঠল। লুঙ্গিহান বাইত্তে রইয়া গেছে মিয়াবাই। আমারে যে বাইত থিকা বাইর কইরা দিছে, আমি যে ঐ বাইত্তে আর যাইতে পারুম না এই কথাডা আমার মনে থাকে না। ভুইল্লা যাই।
চোখের পানি সামলাতে অন্যদিকে তাকাল কাশেম।
আলফু বলল, এই হগল চিন্তা কইরা অহন আর মন খারাপ করি না। তুই পুরুষপোলা না, কী রে বেডা, পুরুষপোলাগো এমুন মুলাম (মোলায়েম) মন অইলে কাম অয়নি? বাইত থিকা বাইর কইরা দিছে দেইক্কা কী অইছে! শইল্লে জোরবল নাই তর? অন্য বাইত্তে গিয়া কাম লবি। আর যেই বাড়ির মাইনষে তরে বিনা দোষে এমুন মাইর মারছে হেই বাইত্তে তো তর এমতেঐ যাওন উচিত না। হেই বাইত্তে ফিরা যাওনের আশা ছাইড়া দে। অন্য বাড়ি দেক। অন্য বাইত্তে কাম ল।
হাত দিয়ে ডলে ডলে চোখ মুছল কাশেম। হুজুরের বাড়ির গোমস্তারে এই গেরামের কোনও বাইত্তে কামে রাখবো না।
আলফু অবাক হল। ক্যা?
হুজুরের ডরে। গেরামের বেবাক মাইনষেঐ হুজুররে ডরায়। হের পোলা আতাহাররে ডরায়। আমারে কামে রাইক্কা হেগো শতরু অইবো কেডা?
তাইলে কনটেকদার সাবের কাছে যা, মাইট্টাল অ। দিন গেলে নগদ টেকা পাবি।
ওহেনেও ভেজাল আছে। আতাহারে অইলো কনটেকদার সাবের দোস্ত।
আলফু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তুই তো তাইলে এই গেরামেই থাকতে পারবি না। অন্য গেরামে গিয়া কাম কাইজ কইরা খাইতে অইবো তর।
হেইডা আমি পারুম না মিয়াবাই।
ক্যা?
আমি কোনওদিন এই গেরাম ছাইড়া কোনওহানে যাই নাই, কোনওহানে গিয়া থাকি নাই। একদিন এই গেরামে আমগো বাড়িঘর আছিলো, বাপ দাদারা আছিলো, চাচারা আছিল, অহন আর কেঐ নাই। কে গেছে মইরা, কেঐ গেছে দেশ গেরাম ছাইড়া। রক্তের আততিয় স্বজন কে কোনহানে আছে কইতে পারি না। এই গেরামডারেঐ মনে। অয় আমার আততিয়। আমার বাপ দাদা, ভাই বেরাদর, চাচা ফুবু, বেবাক মনে হয় এই গেরামডারে। এই গেরাম ছাইড়া আমি কোনওহানে যামু না। মইরা গেলেও যামু না।
কাশেমের কথা শুনে অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল আলফু। তারপর পানিতে নামছে। ঝকিজালটা হাতেই ছিল। শক্ত, মোটা সুতার জাল। ঘন করে কাঠি দেওয়া। একটু লম্বা ধরনের লোহার কাঠি। গাবের কষে প্রায়ই ভিজিয়ে রাখা হয় বলে কড়কড়া শুকনা বেগুনির কাছাকাছি রঙের শক্ত জাল। পাঁচ সাত কেজি ওজনের রুই বোয়ালেরও সাধ্য নাই এই জাল ছিঁড়ে বের হয়। ঘন করে কাঠি দেওয়া বলে জালের ওজনও বেশ। পানির তলায় গিয়ে এমন করে ছড়ায় জাল, ওজনদার বলে কাঠিগুলি গেঁথে যায় কাদায়। কাদার ভিতর লুকিয়ে থাকা শাল গজার তরি কাদা ভেঙে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। জালে আটকা পড়তেই হয়। তবে আলফুর মতো দশাসই জুয়ান ছাড়া এই জাল বাওয়া কঠিন। ছুঁড়ে জায়গা মতো ফেলা তো দূরের কথা, এক হাতে রশি ধরে অন্যহাতে বারোহাতি জাল কায়দা করতেই জান বের হয়ে যাবে।
